পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির মামলায় পাকিস্তানের হাইকোর্টের রায়ের মাধ্যমে মরিয়ম নওয়াজ শরিফের রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে, যা তাকে একজন ঝানু রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে বেশ এগিয়ে দিচ্ছে।
রাজনীতির প্রতি ভেতরে থাকা প্রচণ্ড টানকে ইতোমধ্যে নানাভাবে প্রকাশ করেছেন মরিয়ম। বাবা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পাশে থেকে তলে তলে অনেকটাই অপ্রকাশ্যে রাজনীতির চর্চা করেছেন মরিয়ম। তাঁর বাবা এখন রাজনৈতিক জীবনের সব থেকে জটিল সময় পার করছেন। সফলভাবে দুর্নীতির মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়ে তিনি নতুন এক রাজনৈতিক পর্যায়ে পৌঁছেছেনে। বলা হচ্ছে বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এখনে থেকে তিনিই মূল কলকাঠি নাড়বেন।
অতীতের বিভিন্ন ঘটনায় পরিবারের সদস্য হিসেবে মরিয়মকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। বাবার নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে ওপেন হার্ট সার্জারি সময় দীর্ঘদিন লন্ডনে অবস্থান করে দেখশোনা করা, এমনকি পাকিস্তানি মুসলিম লীগের ইসলামাবাদের মিডিয়া অফিসে অথবা বর্তমানের এই পানামা কেলেঙ্কারির মতো দুঃসময়েও বাবার পাশে অটল ছিলেন মরিয়ম।
মরিয়ম চোখের সামনে কয়েকটি আন্দোলন দেখেছেন এবং সেখানে সে তার সাহসের যথেষ্ট প্রমাণ দিয়েছেন। ২০১৪ সালে অর্থপাচারের পানামা পেপারস কেলেঙ্কারি থেকে মুক্তি পেয়ে মরিয়ম আবারও তার বাবাকে রাজনৈতিকভাবে সহায়তার কাজ করে যাচ্ছেন। এতে করে রাষ্ট্রের হালচাল নিয়ে তার অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত বছরে প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় মরিয়মের নেতৃত্বের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে। পাকিস্তানের মানুষকে সেবা করতে এবং দেশটির নারীদের শিক্ষার মান উন্নয়নে মরিয়মের কাজের আগ্রহ দেখে তখনকার ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামাও অভিভূত হয়েছেন।
মরিয়ম এখন দলের সভায় ও কূটনীতিকদের সভায় সভাপতির চেয়ারে বসছেন এবং দলের পক্ষে হয়ে বিরোধীদের প্রচণ্ড সমালোচনারও জবাব দিচ্ছেন। ইদানিং বিভিন্ন বিষয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরতে এবং বিরোধীদের নানা সমালোচনার জবাব দিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে গুরুত্ব দিয়ে খুব সফলভাবে ব্যবহার করেছেন তিনি। সম্প্রতি এক র্যাংকিংয়ে দেখা গেছে, বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী কন্যার মধ্যে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছেন তিনি।
ভারতীয় ধনকুবের ব্যবসায়ী সাজান জিনদালের সাথে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের গোপন বৈঠক নিয়ে সম্প্রতি দেশটিতে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে নতুন করে বিতর্কের মুখে পড়েছেন নওয়াজ। পাকিস্তানের অনেক রাজনীতিবিদ এবং বিশ্লেষক ধারণা করছেন, নওয়াজের সঙ্গে অদূর ভবিষ্যতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের ক্ষেত্র প্রস্তুতের লক্ষ্যে পর্দার আড়ালের কূটনীতির অংশ হিসেবে এ সফর করেন জিনদাল। এ নিয়ে দেশটির কোনো কোনো বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। দেশটির কয়েটি গণমাধ্যম কথিত এই গোপন বৈঠকের খবর প্রচার করে। এ বৈঠককে কেন্দ্র করে পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদে নিন্দা প্রস্তাব এনেছে দেশটির সাবেক ক্রিকেট তারকা ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন বিরোধী রাজনৈতিক দল পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ বা পিটিআই।
অবশ্য এ বিষয় নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোন জবাব দেয়া হয়নি। তবে এ সংক্রান্ত এক টুইট বার্তায় মরিয়ম নওয়াজ লিখেছেন, ‘নওয়াজের পুরানো বন্ধু মি. জিনদাল। বৈঠক নিয়ে ‘গোপন’ করার কিছু নেই এবং এ নিয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে কিছু বলাও ঠিক নয়।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির বিষয়টি এখনও চলমান রয়েছে এবং যৌথ অনুন্ধান কমিটির (জয়েন্ট ইনভেসটিগেশন টিম) রিপোর্ট আদালতে পেশ করার মাধ্যমে এর থেকে চূড়ান্ত রায় আসবে। যদিও শরিফের বিদেশি কোম্পানীর মালিকানায় মরিয়মকে ট্রাস্টি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, এ থেকে মরিয়মকে অব্যাহতি দিয়েছে আদালত। তাই বিষয়টি নিয়ে যৌথ অনুসন্ধান কমিটির কোন মাথা ব্যথা থাকবার কথা না।
কিন্তু তারপরেও লন্ডনে নওয়াজ শরিফের ফ্ল্যাট কেনা ও সম্পদ ক্রয় করতে অর্থ চালান এবং সম্পদের মালিকানায় জটিলতা- ইত্যাদি বিষয় নিয়ে জনমনে ইতোমধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নওয়াজ শরিফ ও তার দুই ছেলের তদন্ত করতে যৌথ অনুসন্ধান কমিটি করে তদন্ত প্রতিবেদন আগামী দুই মাসের মধ্যে পেশ করতে হুকুম দিয়েছেন আদালত। বিষয়টি এখন পুরোপুরি আদালতের উপর নির্ভর করছে। আদালত যা বলতে তাই হবে। এর মধ্যে দেশটির রাজনৈতিক মাঠও গরম হয়ে উঠেছে, তারা স্বচ্ছ অনুসন্ধান নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি করেছেন।
একমাত্র মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ব্যতীত দেশের সব বিভাগই প্রধানমন্ত্রীর আওতাধীন এবং তার কাছে দায়বদ্ধ। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী যে যৌথ অনুসন্ধান কমিটি গঠিত হবে সেটিও এই নিয়মের ব্যতিক্রম হবে না। তাহলে তারা তাদের প্রধানের বিরুদ্ধে প্রশ্ন করবেন কিভাবে? যদি তারা এমনটি করেনও, তাহলে মন্ত্রী পরিষদ ও সংসদের প্রধানের মতো সংবেদনশীল পদে থেকে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে?
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের নাজুক পরিস্থিতিতে যে ব্যক্তিটি প্রধানমন্ত্রীর পাশে থেকে বিরোধীদের সকল সমালোচনার জবাব দিয়ে তার যন্ত্রণা লাঘবে সব থেকে ভাল করতে পারবেন তিনি হচ্ছেন মরিয়ম নেওয়াজ।
এসব বিষয় থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে পাকিস্তানের রাজনীতির মাঠে মরিয়ম নওয়াজ শরিফ নতুন খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছেন। পানামা পেপারস কেলেঙ্কারি এবং জিনদালের সাথে প্রধানমন্ত্রীর গোপন বৈঠকের মতো বিষয়গুলো মরিয়মকে পাকিস্তানের একজন ঝানু রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে বেশ এগিয়ে দেবে।
২০১৬ সালের ৩ এপ্রিল ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব জার্নালিস্টস (আইসিজে) পানামা পেপার্স ফাঁস করে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনীতিক, ধনকুবের ও সুপার স্টারদের কর ফাঁকির প্রমাণ বের হয়ে আসে। পানামা পেপার্সে নওয়াজ পরিবারেরও কর ফাঁকির বিষয়টি ওঠে আসে। এ ঘটনার বিচার দাবি করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ, জামায়াতে ইসলামী, ওয়াতান পার্টি এবং অল পাকিস্তান মুসলিম লীগ।








