মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগে থেকে পাকিস্তানীদের বুকফাটা যে আর্তনাদ ছিল
তা এখন মাতম আর বিলাপে পরিণত হয়েছে। হত্যা-গণহত্যা-ধর্ষণ এবং বুদ্ধিজীবী
হত্যার নীল নকশা প্রণয়নের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে তাদের প্রিয় ‘নেতা’র
ফাঁসি কোনোভাবেই মানতে না পেরে পাকিস্তানীরা বলছে, তারা সবাই নিজামী।
পাকিস্তানীদের এরকম প্রতিক্রিয়ায় একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেছেন, জামায়াতি রাজনীতির হেডকোয়ার্টার হচ্ছে পাকিস্তান। এ কারণেই সেখানে এতো প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। আর তাদের ওই প্রতিক্রিয়াই আসলে নিজামীসহ অন্য যুদ্ধাপরাধীদের মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ।
পাকিস্তান সরকার এর আগে একাধিকবার বিচার ইস্যুতে ‘নাক গলিয়ে’ বাংলাদেশের ধমক খেলেও পাকিস্তানী বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের ‘দুঃখ-কষ্ট-ক্ষোভের’ কথা অব্যাহত রেখেছে। কিছু পাকিস্তানী গণমাধ্যমেও সেই ‘রাগ-ক্ষোভ’ স্পষ্ট।
তাৎক্ষণিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তানের মূলধারার গণমাধ্যম রয়টার্স, এএফপি, এপিসহ বিভিন্ন বার্তা সংস্থার বরাত দিয়ে যেমন ‘হা-হুতাশ’ করে নিজামীর ফাঁসি কার্যকর হওয়ার সংবাদ ছেপেছে তেমনি পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় তথাকথিত যে প্রতিবাদ হয়েছে সেগুলোর খবর ওইসব গণমাধ্যমের বরাতে প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বার্তা সংস্থা।
পাকিস্তানের ডন পত্রিকার অনলাইনে এএফপি’র বরাতে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘শীর্ষ জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি কার্যকর করল বাংলাদেশ’। খবরে বলা হয়, ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতা মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি কার্যকর করা হলো। তবে সঙ্গে এটিও বলা হয়, এর মাধ্যমে মুসলিম প্রধান দেশটিতে (বাংলাদেশে) অস্থিরতা এবং উত্তেজনা বাড়বে।
ডেইলি পাকিস্তানে ‘বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামির নেতা মতিউর রহমানের ফাঁসি’ শিরোনামে খবর প্রকাশ হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় ধর্ষণ ও গণহত্যার জন্য ইসলামপন্থী নেতার ফাঁসি কার্যকর। রয়টার্সের বরাতে একই শিরোনামে খবর ছেড়েছে পাকিস্তানের দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন।
নিজামীর ফাঁসির খবর প্রকাশে পাকিস্তানের বেশ কিছু গণমাধ্যমে এক ধরনের নিষ্পৃহ ভাব থাকলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে টুইটারে এ ঘটনা নিয়ে পাকিস্তানিদের মধ্যে চলছে ব্যাপক উত্তেজনা। ফাঁসির পর উত্তেজনাটি অনেক জায়গায় ‘প্রতিবাদ ও নিন্দা’র রূপ নেয়।
চার বছর আগে ২০১২ সালের মে মাসে মাইক্রোব্লগিং সাইট টুইটারে ফ্রি নিজামী ক্যামপেইন (Free Nizami Campaign) নামে যে পেজটি খোলা হয়েছিল সেটি ফাঁসি কার্যকর হওয়ার কয়েকদিন আগে থেকে পাকিস্তানীদের প্রিয় পেজে পরিণত হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর বিচারের প্রতিবাদে তখন থেকে বিভিন্ন ভিডিও, ছবি ও লেখা সেখানে #FreeNizami হ্যাশট্যাগে পোস্ট হয়ে আসলেও রিভিউ পিটিশন খারিজ হওয়ার পর থেকে তা পাকিস্তানীদের আলোচনার মূল কেন্দ্র হয়ে যায়।
গত ৫ মে রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন খারিজ করে ফাঁসির দণ্ড বহাল রাখার পর থেকে এই হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে নিজামীর পক্ষে পোস্টের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকে। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত পাকিস্তানে টুইটারের ‘ট্রেন্ডিং’ তালিকার শীর্ষে ছিল এই #FreeNizami হ্যাশট্যাগ।
তবে গত রাত ১২টার দিকে নিজামীর ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর থেকে সে জায়গা দখল করে নিয়েছে আরেকটি হ্যাশট্যাগ – #WeAreNizami। নিজামীর ফাঁসির নিন্দা জানিয়ে, তাকে শহীদ তকমা দিয়ে এবং তার আত্মার শান্তি কামনা করে দেয়া পোস্টগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে এই নতুন হ্যাশট্যাগটি।
পাকিস্তান জামায়াত ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো ছাড়াও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ এই ধারার বেশ কয়েকটি সংগঠন পাকিস্তানি ওই টুইটার পেজে তাদের মতামত তুলে ধরেছে। পাকিস্তানীদের মতো পাকিস্তানী ভাবধারার বাংলাদেশী এসব সংগঠনও নিজামীকে নিরপরাধ দাবি করে তার ফাঁসিকে ‘রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে দাবি করে।
সেখানে বাংলাদেশীদের যেসব পোস্ট আছে তার একটিতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, কাদের মোল্লা, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, গোলাম আজম ও নিজামীর ছবি কোলাজ করে বলা হয়েছে, এদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ৫ জন অসাধারণ রাজনীতিককে হারিয়েছে।
মতিউর রহমান নিজামীকে নিয়ে পাকিস্তানে টুইটারে প্রথমে #FreeNizami এবং বর্তমানে #WeAreNizami হ্যাশট্যাগের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হলেও এর সঙ্গে রয়েছে আরও কিছু হ্যাশট্যাগ, যা ট্রেন্ডস তালিকায় জায়গা না পেলেও একেবারে কম না। এর মধ্যে রয়েছে #JudicialKilling, #StopJudicialKilling, #PoliticalKilling ইত্যাদি। ফেসবুকেও এর সবগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে টুইটারের তুলনায় কম।
এছাড়াও নিজামীসহ অন্য যুদ্ধাপরাধীদেরকে তাদের ভাষায় ‘অমানবিক’ ও ‘অনৈতিক’ বিচারের সম্মুখীন করার কারণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়েও পাকিস্তানীরা টুইটারে কিছু হ্যাশট্যাগ চালু করেছে।
সাংবাদিক-লেখক শাহরিয়ার কবির চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, এসবের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানীদের অমানবিকতার পাশাপাশি অপরাধ করে দায় অস্বীকারের নির্লজ্জতাও ফুটে উঠছে।








