ক্ষমতার দাপটে রাষ্ট্র কাঠামোর কেন্দ্রে থাকা বঙ্গভবন আর গণভবনকেও এক সময় ছাড়িয়ে গিয়েছিল রাজধানীর একটি ভবন। বনানীর ১৩ নম্বর সড়কের ডি ব্লকে অবস্থিত ৫৩ নম্বর সেই বাড়ির নাম ছিল হাওয়া ভবন।
মূলত ওই ভবনটি ছিল বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অঘোষিত রাজনৈতিক কার্যালয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় যার পরিচিতি ছিল সাধারণের মুখে মুখে। রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে পেশাজীবী, সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের হর্তাকর্তা এমন কেউ ছিলেন না; যাকে ওই সময় সেখানে হাজিরা দিতে হয়নি।
একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়েও এই বাড়িটির কথা উঠে এসেছে। সেখানে বসে হামলা ষড়যন্ত্র এবং পরিকল্পনা করা হয়। এক সময়ের তুমুল ক্ষমতার উৎস সেই বাড়িটি এখন কি অবস্থায় আছে? চ্যানেল আই অনলাইনের প্রতিবেদক আরেফিন তানজীব পাঠকদের জন্য তুলে এনেছেন তার বিস্তারিত।
নাম শুনলেই চমকে তাকানো সেই বাড়িটির নাম এখন বদলে গেছে। হাওয়া ভবনের পরিবর্তে এখন তার নাম হয়েছে ‘অ্যজোরে’। সময় বদলের ধারায় সেই ক্ষমতা আর নেই ভবনটির। তবে এখনো তার দিকে চেয়ে থাকে অসংখ্য মানুষ। ওই সড়ক দিয়ে যাওয়া যে কোনো পথিকের অবাক চোখ খুঁজে ফেরে সেই হাওয়া ভবনকে।
বৃহস্পতিবার বিকালে সরেজমিনে বাড়ির সামনে গিয়ে দেখা যায়, কোলাহল মুক্ত আর নিরিবিলি পরিবেশে সাড়ে পাঁচ কাঠা জমির দাঁড়িয়ে থাকা দ্বিতল সেই হাওয়া ভবন ভেঙে এখন তৈরি করা হয়েছে নয়তলা ভবন। দেশি-বিদেশি টাইলসে দৃষ্টিনন্দিত ভবনটিতে আগের সেই নারিকেল গাছটি এখনো রয়েছে। আছে বেইজমেন্টে গাড়ি পার্কের ব্যবস্থাও রয়েছে।
ওই বাড়ির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা মো. নুরুল হক চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আমি শুনেছি এই বাড়ির নাম আগে হাওয়া ভবন ছিল, কিন্তু এখন আর হাওয়া ভবন নেই। নতুন ভবন হয়েছে, নামও হয়েছে নতুন। দেশি-বিদেশি ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের কাছে অ্যাপার্টমেন্ট হিসেবে বিক্রি করেছেন ভবন মালিক।
গত প্রায় ১০ মাস ধরে সেখানে কাজ করা নুরুল বলেন, ক’দিন ধরেই বাড়িতে পত্রিকার সাংবাদিকরা খোঁজ খবর নিচ্ছে, আমি যা জানি তা বলে দেই। আগে তো মাঝে মাঝে সাদা পোশাকে পুলিশ আসত। খোঁজ খবর রাখত।
১৯৯৯ সালে তৎকালীন বিএনপি নেতা আলী আসগর লবী সেই হাওয়া ভবন ভাড়া নিয়েছিলেন। পরে সেখানে নিয়মিত বসা শুরু করেন তারেক রহমান। ২০০১ সালে দলীয় মনোনয়নসহ পরবর্তীতে বিএনপির রাজনৈতিক সব কর্মকাণ্ড এখান থেকেই পরিচালিত হয়।
অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমান ‘হাওয়া ভবন’ থেকেই দল পরিচালনা করেন।
এরপর থেকেই মূলত নানা কারণে আলোচনা-সমালোচনায় পড়ে ওই ‘হাওয়া ভবন’। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ওই হাওয়া ভবনে অভিযান চালিয়ে কম্পিউটারসহ নানা সামগ্রী জব্দ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপর থেকেই মূলত ওই ভবনটি ছেড়ে দেওয়া হয়।
ভবনের আশ পাশের বাসিন্দারা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, এ এলাকায় যারা নতুন তারা অনেকেই জানেন না এটা এক সময়ে হাওয়া ভবন। আসলে এখন হাওয়া ভবনও নেই তারেক রহমানও নেই।
বাড়িটির সড়ক ধরে সামনে এগুলেই হাতের ডানে খেলার মাঠ চোখে পড়ে।এই সড়কে অফিস করা কয়েকজন তরুণের সঙ্গে কথা হয় চ্যানেল আই অনলাইনের প্রতিবেদকের।
তারা জানায়, রাজনৈতিক যে প্রভাব এখান থেকে খাটানো হতো সেই হাওয়া ভবনের কোনো অস্তিত্ব এখন আর নেই। অনেকের কাছে তো হাওয়া ভবন একটা আতঙ্কের নাম ছিল।
সিহাব আহমেদ নামের এক তরুণ জানান, ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা হাওয়া ভবনে হয়েছিল বলে পত্রপত্রিকায় পড়েছি।
গতকাল বুধবার সেই গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হয়। সেখানে তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ১১ জনের বিভিন্ন মেয়োদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছিল, আসামি মাওলানা আব্দুস সালাম, মাওলানা তাজউদ্দিন, মুফতি হান্নান, মাওলানা আব্দুর রউফ ও আব্দুল মাজেদ ভাট প্রথমে মোহাম্মদপুরের সাতমসজিদে বসে সিদ্ধান্তে আসেন, তাদের জঙ্গি তৎপরতার পথে ‘প্রধান বাধা’ আওয়ামী লীগ, বিশেষ করে এর প্রধান শেখ হাসিনা।
তারা মুরাদনগরের এমপি মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের সহযোগিতায় ২০০৪ সালের প্রথম দিকে হাওয়া ভবনে গিয়ে মামলার অন্যতম আসামি তারেক রহমান ও হারিছ চৌধুরীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। তারা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যাসহ বিভিন্ন অপারেশন চালানোর জন্য সহযোগিতা চান। তারেক রহমান উপস্থিত সবার সামনে তাঁদের কাজকর্মে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
জানা যায়, হাওয়া ভবন ভেঙে ২০১১ সালের জানুয়ারিতে নতুন করে ভবনটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। শেষ হতে সময় লাগে প্রায় ২ বছর। রাজউক অনুমোদিত এক স্মারকে উল্লেখ রয়েছে, অ-অ ২/বি, আর তসি ১১৪৫/২৯৬/১১৩৭২২ ভবনটির মালিক মিসেস হুয়ারুন আহমেদ ও আশেক আহমেদ।
সেই হাওয়া ভবন নেই, কিন্তু এখনো আছে তার নাম।








