এইচ আর অফিসার অর্থাৎ হিউম্যান রিসোর্স অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলাম। সেটা বছর দশেক আগের কথা। কর্মক্ষেত্র ছিল টেক্সটাইল ডিভিশন। এক দুপুরে লাঞ্চ করে নিজের রুমে বসে আছি এমন সময় সুইং সেকশনের একজন লাইনম্যান এসে জানালেন, তার লাইনের এক মেশিন অপারেটর মেয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। লাঞ্চ পিরিয়ড বলে ডাক্তার এবং নার্স দুজনেই বাড়িতে গেছেন লাঞ্চ করতে। লাইনম্যান কাউকে খুঁজে না পেয়ে এসেছেন আমার কাছে।
আমি শুনেই দৌড়ে গেলাম সুইং সেকশনে। যেয়ে দেখি ১৯/২০ বছরের একটি মেয়ে ফ্লোরে পড়ে পানি থেকে তোলা মাছের মতো কাতরাচ্ছে আর খোলা মুখে বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। ফ্লোরে বসে আমি মেয়েটির মাথা নিজের কোলে নিয়ে বললাম, ‘মা, তুমি অনুমতি দিলে তোমার ব্রেসিয়ারের ফিতেটা খুলে দেই? নিশ্বাস নিতে আরাম হবে।’ মেয়েটি সম্মতি দিতেই আমি সে যায়গায় উপস্থিত অন্যদের সরে যেতে বলে মেয়েটির অন্তর্বাসের হুক খুলে দিলাম। অল্প অল্প করে পানি খাওয়ালাম এবং অন্যদের সাহায্য নিয়ে মেয়েটিকে খোলা জানালার ধারের একটি জায়গায় নিয়ে শোয়ালাম। ততক্ষণে মেয়েটির নিঃশ্বাস কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে।
একটু পরেই আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডাক্তার এসে পড়ায় মেয়েটি ওষুধ এবং পর্যাপ্ত নার্সিং পেয়ে সুস্থ হয়ে ওঠে।
পরে ডাক্তারের কাছে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, মেয়েটি অ্যাজমায় আক্রান্ত। ডাক্তার জানালেন, ওই সময়ে মেয়েটির অন্তর্বাস খুলে দেয়াসহ যা কিছু আমি করেছি তা মেয়েটার সুস্থতার জন্য অনেকখানি কাজে দিয়েছে।
দিন পনের পর আবার সেই ঘটনা। এবার অবশ্য ডাক্তার অফিসেই ছিলেন। আমিও খবর পেয়ে যেয়ে দেখি আগের মতই মেয়েটি মুখ বড় করে নিশ্বাস নিচ্ছে। আমি আগের অভিজ্ঞতা মনে করে আবারো মেয়েটির অন্তর্বাস খুলে দিলাম এবং বললাম, ‘এই পোশাক পরা তোমার জন্য খুব কি জরুরী? না হলে বাদ দাও না মা। শুধু শুধু ব্যাথা পাচ্ছ।
মেয়েটি ওই অসুস্থতার ভেতরেও লাজুক গলায় আমাকে বলল, “না পরলে কেমন জানি দেহা যায় ম্যাডাম।
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে বললাম, ‘সুস্থতার থেকে কি ভাল দেখা যাওয়া জরুরী?”
এরপরেও বেশ কয়েকবার একই ঘটনা ঘটেছে, মেয়েটি অন্তর্বাস পরা ছাড়তে পারেনি। সে চিন্তিত তাকে দেখতে ভাল লাগবে না এই নিয়ে।
আজ `নো ব্রা ডে’। `নো ব্রা ডে’ বিষয়টা কী বা কেন বলার আগে অনলাইন থেকে পাওয়া কিছু তথ্য দিচ্ছি।
পরিসংখ্যানে জানা যায়, প্রতিবছর ক্যান্সারে আক্রান্ত মহিলাদের মধ্যে শতকরা ১.৭ ভাগই স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত।
যেসব মহিলা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান না কিংবা ত্রিশ বছর পর প্রথম সন্তান জন্ম দিয়েছেন কিংবা নিঃসন্তান, যেসব মহিলার বয়স ৩৫ বছরের বেশি কিংবা যেসব মহিলার স্তন ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস রয়েছে অথবা যেসব মহিলা অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার খান তাদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
সম্প্রতি আমেরিকার বিজ্ঞানীরা চার হাজার ৫০০ মহিলার ওপর জরিপ চালিয়ে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আরো একটি কারণ খুঁজে পেয়েছেন। জরিপে দেখা গেছে, ব্রা পরার কারণে মহিলাদের স্তন ক্যান্সার হতে পারে।
প্রতিদিন নিয়মিত ১২ ঘণ্টা ব্রা পরে থাকলে মহিলাদের স্তন ক্যান্সারের আশঙ্কা ১১ শতাংশ বেড়ে যায়। ব্রা পরার ফলে স্তনের লসিকানালী সঙ্কুচিত বা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে তার ভেতর দিয়ে শরীর বিষাক্ত পদার্থগুলোকে দূর করতে পারে না। ফলে স্তনের কোষে তা জমা হয়ে কোষে অনিয়ন্ত্রিত বিভাজন ঘটায় এবং সৃষ্টি করে ক্যান্সারের। পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রতি বছর স্তন ক্যান্সারের কারণে মারা যান কয়েক হাজার মহিলা। কিন্তু আফ্রিকার দেশগুলোতে স্তন ক্যান্সারে মারা যাওয়ার ঘটনা বিরল।
গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিমা দেশগুলোর মহিলাদের মধ্যে ব্রা পরার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু আফ্রিকান মহিলারা তেমন একটা ব্রা পরেন না। তাই স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে ব্রা পরার অভ্যাস কমাতে হবে।
‘নো ব্রা ডে’ মূলতঃ নারীদের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমিয়ে আনতে ব্রা পরায় নারীকে নিরুৎসাহিত করার জন্য পালন করা হয়।
‘আমাকে কেমন লাগছে দেখতে’ এই লাইনটি যতদিন পর্যন্ত নারীর কাছে শরীরকেন্দ্রিক হয়ে রয়ে যাবে, ততদিন এই অবস্থার কতখানি পরিবর্তন হবে জানি না। তবে মানসিক পরিবর্তন যদি কোনদিন নারীর সৌন্দর্যচিন্তাকে শরীর থেকে বের করে মননে মেধায় কর্মে আনতে পারে তবে এই অবস্থার পরিবর্তন অনেকখানি সম্ভব বলে মনে করি।
সেই দিন আসুক। অতি দ্রুতই আসুক।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








