জার্মানির বিদায় ছাড়া বিশ্বকাপের শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে এখন পর্যন্ত সেই অর্থে বড় কোন অঘটন ঘটেনি। বলা যায়, ফুটবল সামর্থ্যের বিচারে যা হবার তাই হচ্ছে। সর্বশেষ স্পেনের কাছে অস্ট্রিয়ার ৩-০ গোলে পরাজয়, পর্তুগালের কাছে ক্রোয়েশিয়ার ২-১ গোলে পরাজয়, সুইজারল্যান্ডের কাছে আলজেরিয়ার ২-০ গোলে পরাজয় এসবই অনেকটা অনিবার্যই ছিল। শেষ ষোলোর লড়াই দেখার জন্য এখন সবাই প্রস্ততি নিচ্ছেন।
শেষ ৩২ দলের লড়াইয়ের আর মাত্র কয়েকটা ম্যাচ বাকি আছে। বাংলাদেশ সময় আজ রাতে এবং আগামীকাল সকালের মধ্যে অনুষ্ঠিত মোট ৩টি ম্যাচের মধ্যে দিয়ে শেষ হবে ৩২ দলের নকআউট পর্ব। আজ রাত ১২টায় প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হবে অস্ট্রেলিয়া এবং মিশর। সন্দেহ নেই এ ম্যাচটি হবে খুবই আকর্ষণীয়। দুদলই সমানতালে লড়বে। দুদলেরই শেষ ষোলোতে যাওয়ার ফিফটি ফিফটি চান্স থাকবে। পরের ম্যাচে ভোর ৫টায় মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা এবং এই বিশ্বকাপের অন্যতম অপরাজিত দল কেপ ভার্দে। শেষ ম্যাচ জমে উঠবে ঘানা এবং কলম্বিয়ার লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে।
তবে সবার চোখ এখন আর্জেন্টিনা ও কেপ ভার্দের ম্যাচের দিকে। প্রথমত: এই ম্যাচে কোন অঘটনা ঘটে কিনা। দ্বিতীয়ত: এই ম্যাচে ফুটবলের মহাতারকা মেসি আর কী কী ঘটনার জন্ম দেন। শক্তির সবকিছু বিচার ও ফুটবল পরিসংখ্যানে কেপ ভার্দে আর্জেন্টিনার তুলনায় অনেক অনেক পিছিয়ে। কিন্তু এই টিম নিয়ে ভীষণ সতর্ক আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি। তিনি বলেছেন, ‘এটি এমন একটি দল, যারা এখন পর্যন্ত কোন ম্যাচ হারেনি। তারা ভাগ্যক্রমে এখানে আসেনি। আমরা তাদের যথাযথ সম্মান দেব, এবং সেটাই আমরা করব।’
এদিকে কেপ ভার্দের প্রধান কোচ বুবিস্তা বলেছেন, ‘আজ শেষ ৩২-এর ম্যাচে আর্জেন্টিনা ও লিওনেল মেসির বিপক্ষে লড়াই হবে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ম্যাচ।’ তবে তিনি এও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের তারা ভয় পাচ্ছেন না। মাত্র পাঁচ লাখের কিছু বেশি জনসংখ্যার আফ্রিকার দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে তাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে উঠেছে।
তাদের কোচ আরও বলেছেন, ‘আমরা শান্ত আছি, কারণ নিজেদের যোগ্যতায় এখানে এসেছি। তাই ভয় পাওয়ার বা অতিরিক্ত দুঃশ্চিন্তার কোন কারণ নেই।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘আমরা জানি আজকের ম্যাচটির গুরুত্ব কতটা। এটি আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ম্যাচ, কিন্তু আমরা এটি উপভোগ করব এবং নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব।’
এই ম্যাচ নিয়ে বলছিলেন আশির দশকের তারকা ফুটবলার এবং জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক স্বপন কুমার দাস। তার মতে, সব সমীকরণ আর বিশ্লেষণে আর্জেন্টিনা অনেক অনেক এগিয়ে। তবে কেপ ভার্দের গোলকিপার এক্সিলেন্ট। নতুন টিম হিসেবে ওরা সবার নজর কেড়েছে। স্বপন কুমার দাস বললেন, ‘জার্মানি দ্রুতই চলে গেল ৩২ দলের লড়াই থেকে। সামনে ১৬ দলের লড়াই। আমার ধারণা সব নাটকীয়তা ওখানে অপেক্ষা করছে। সেই নাটকীয়তা ফুটবল অনুরাগীদের আরও আনন্দ ও বিষাদে সিক্ত করবে।’
স্বপন কুমার দাস সত্তরের শেষ ও আশির দশকের মধ্যভাগজুড়ে ঢাকার মাঠে খেলেছেন। মোহামেডান স্পোর্টি ক্লাবে খেলেছেন ক্যারিয়ারের বড় সময়। জাতীয় দলের হয়ে ডিফেন্স লাইনের নির্ভরযোগ্য ভ্যানগার্ড হিসেবে প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামলিয়েছেন। খেলা থেকে অবসরের পর তিনি কোচিং পেশায় যুক্ত ছিলেন দীর্ঘদিন। সারাজীবনই তিনি জার্মানি সমর্থক। আর বেকেনবাওয়ার তার আদর্শিক ফুটবলার। জার্মানির বিদায়ে তাই তিনি বেশ কষ্ট পেয়েছেন। ভাবতে পারেননি জার্মানি এত দ্রুত বিদায় নেবে। বিশ্বকাপে মেসি, এমবাপে, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর খেলা বেশ এনজয় করছেন স্বপ্ন দাস। মেসির পেনাল্টি মিসকে তিনি মনে করেন শ্রেফ দুর্ঘটনা। ফ্রান্সের এমবাপে তার চোখে মহা আগ্রাসী। মরক্কোর খেলাও তাকে আপ্লুত করছে।
৩২ দলের লড়াই এবং পরবর্তী ১৬ দলের নকআউট পর্ব নিয়ে তিনি বললেন, ‘এই বিশ্বকাপ আস্তে আস্তে নাটকীয়তার দিকে যাচ্ছে। আমার ধারণা সেই নাটক উপভোগ করা যাবে রাউন্ড ষেলোতে। এই নকআউট পর্বে সমান সমান দলের লড়াই শুরু হবে। সে লড়াই হবে গাণিতিক, শারীরিক, টেকনিক্যাল, ট্যাকটিক্যাল। সবকিছু বিচার বিশ্লেষণ করে খেলতে হবে। কোন ধরনের ভুল করা চলবে না। পুরো চার দাগের মধ্যে সবধরনের ইনটেলেকচুয়ালিটি দেখাতে হবে। একটু থেকে একটু ভুল হলেই খেসারত দিতে হবে।’
সবশেষে স্বপন দাস বললেন, ‘চার বছর পরপর বিশ্বকাপ আসে। আমরা ভীষণ মাতোয়ারা হয়ে উঠি। এবারের বিশ্বকাপেও সারা দেশজুড়ে যে উৎসব, যে আনন্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তা অনেকটাই বিরল। কিন্তু এর মাঝে আমাদের ফুটবলের উন্নয়নের দিকটাও দেখতে হবে। আমাদের ফুটবলকেও আরো জাগ্রত করতে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।’ তিনি বললেন, ‘সবার আগে দেশ। এটি ভুলে গেলে চলবে না। তাইতো দেশের ফুটবলের উন্নয়নটাও জরুরি। সে লক্ষ্যে সবাইকে কাজ করতে হবে।’








