পাখিরা যে সব কাজ করে থাকে, সেই কাজ মানুষ করলে
পাখিরা বুঝতে পারে।
পাখিরা মাটির পর হেঁটে যায়, অতএব মানুষ হাঁটলে
পাখিরা বোঝে যে মানুষ হাঁটে।
এই সকল কথামালা আমার ভাবনার জায়গায় আঘাত করে। আমি ভাবতে শুরু করি পাখির কোন কোন কাজের সাথে মানুষের কাজের মিল রয়েছে। ‘সাইকেলের ডানা’র সুবাদে মানু কিংবা মানু’র ভাবনার সঙ্গে আমার পরিচয়। আর যিনি পরিচয় ঘটিয়েছেন, তিনি নূরুল আলম আতিক। ৩১ শে আগস্ট তাঁর জন্মদিন ছিল।
প্রথম যখন ‘সাইকেলের ডানা’ দেখি, তখন শৈশব আমার। মানু’কে মোটেও বুঝতে পারিনি। অথচ মানু নিজেই তার শৈশবে আটকে ছিল। মানু’কে এই দেখি অলুক্ষণে দৃষ্টি নিয়ে হারু ভাইয়ের সাইকেলের গ্যারেজে বসে থাকতে, আবার এই দেখি বন্ধু বরুণ আর শরফুলকে সঙ্গে নিয়ে সাইকেল নয় যেন ঘোড়ায় চেপে শৈশবের জমিতে চাষাবাদ করছে। এই যে গল্প বলার ধরন, আমার কাছে নতুন।
তারপর ২০০০ সালের ১০ বা ১১’র প্রথম দিকে, ততোদিনে অনিয়মিত সিনেমার বই পড়া, সিনেমা দেখা আর সিনেমার লোকজনের সাথে আড্ডা দেয়া শুরু হয়ে গেছে। পুনরায় ‘সাইকেলের ডানা’ দেখলাম।
মানুষেরা দাঁত মাজে, পাখিরা দাঁত মাজে না।
সেহেতু মানুষের দাঁত মাজা দেখে,
পাখি হয়তো বোঝে না এই মানুষ কী করে?
মানু দাঁত মাজে, আমি বুঝতে পারি কিন্তু মানু’র অসংলগ্ন কথাবার্তা আমার বুঝতে সময় লাগে। হারু ভাই সাইকেলের চাকায় হাওয়া ভরে কিন্তু মানু গভীর ভালোবাসায় দেখে হারু ভাই ফুটবলে হাওয়া ভরছে। আমি কিংবা হারু ভাই কেউই মানুকে বুঝতে পারি না। তাই সাইকেলের টিউব ফেটে গেলে হারু ভাই মানুকে অলুক্ষণে ভেবে ধমক দেয় অন্যদিকে ফুটবল ফেটে যাওয়ায় মানুর মন খারাপ হয়।
সাইকেলের ডানা’র শুরুতেই ছোটবোন রানু, মানু’র খুব ছোটবেলার ডায়েরির পাতা উল্টাতে থাকে। যেই ডায়েরিটি সে মানু’র পুরাতন ট্রাঙ্ক থেকে খুঁজে পায়। আর এর মধ্য দিয়েই মানু’র শৈশবের সাথে আমাদের চেনা জানা শুরু হয়, পরিচয় ঘটে মানু’র ঘনিষ্ঠ দুই বন্ধু বরুণ আর শরফুলের সাথে।
মানু! হুট করে চিৎকার শুনতে পাই। জানতে পারি বন্ধু বরুণকে সাপে কেটেছে। সেই ছোট্টবেলায় বন্ধু হারানোর শোক মানু’কে ভীষণভাবে আহত করে। নিঃসঙ্গ আবহ সংগীতে বরুণের ভেলায় ভেসে যাওয়া আর তার মায়ের কান্নার স্বর মানু আর শরফুলের মত আমার ভেতরটাও ভারী করে তোলে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
‘বরুণকে সাপে কেটেছে। আজ বরুণ চলে গেল বুকের মাঝে কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। সাপে কাট লাশ নাকি আবার বেঁচে ওঠে। শরফুল বলে ভগবান শিবকে এতো পূজা দিলো আর ওকেই সাপে কাটলো!’
বরুণকে হারানোর পর মানু’র পুরো সময় কাটে শরফুলের সাথে। দুজনে দারুণ ফুটবল খেলে, একঘুয়ে শরফুল তাদের ক্লাবেরই কয়েকজনের সাথে খেলা নিয়ে দ্বন্দে জড়িয়ে পড়ে। ঘটনাক্রমে খুন হয় শরফুল।
নির্বিকার বরুণের বাবা-মা হয়তো শরফুল অথবা তার সন্তানের মঙ্গল কামনায় ভগবান কৃষ্ণের নামকীর্তন গাইতে থাকে আর সেই সাথে আমি নিজে অনুভব করি, এই নাম কীর্তনের মধ্য দিয়ে আমাদের সকলের মাঝে শুদ্ধতা ছড়িয়ে পড়ুক।
সেদিন মানুও হামলার শিকার হয়েছিলেন, হামলার কারনেই হোক কিংবা বন্ধু হারানোর শোকে, মানু সেখানেই আটকে যায়। শরীর বড় হলেও মানু আর বড় হয় না। সবসময় সে তার হারানো বন্ধুদের সাথেই সময় পার করতে শুরু করে।
মানু’র মামা থিয়েটার করে। চরিত্রটি আমার কাছে বেশ অপ্রাসঙ্গিক এবং আরোপিত মনে হয়েছে। যদিও মানু’র সাথে মামার কথোপকথনের মধ্য দিয়ে মানু’র ভাবনার কিছুটা পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন সাইকেলের চাকায় হাওয়া দেয়ার বদলে মানু’র চোখে আমি দেখতে পাই হারু ভাই ফুটবলে হাওয়া দিচ্ছে। মামা আমাদেরকে আরো একটি তথ্য দেয়, আশপাশের মানুষ সবাই মানু’র দৃষ্টিকে অলুক্ষণে দৃষ্টি বলে। অবশ্য এটা মামার কাছ থেকে জানার প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয় না, কেননা আগে থেকেই বিষয়টা স্পষ্ট ছিল।
এখন প্রশ্ন হলো মানু’র দৃষ্টি কি আসলেই অলুক্ষণে? নাকি মানু’র বাবার ভাষ্যমত পুরো বিষয়টাই কাকতালীয়?
প্রথমবার সাইকেলের চাকার টিউব ফেটে যাওয়ার সময় মনে হয়েছিল বিষয়টা কাকতালীয়, পরে যখন রাস্তায় পড়ে থাকা একটি আলপিনে পথচারীর সাইকেলের টিউব ফুটো হয়ে যায় তখন মনে হয় বিষয়টা স্বাভাবিক। আবার তার কিছু পড়েই যখন অন্য একটি দৃশ্যে দেখি মানু’র মা তরকারী কাটে, মানু’র আতঙ্কিত চোখ তাকিয়ে থাকে কাটা লাউয়ের দিকে যা রক্তে ভিজে উঠে, পরক্ষণেই মায়ের আঙ্গুল কেটে যায়। তখন পুরো বিষয়টা অলৌকিক মনে হয়। মনে হয়, ভবিতব্য খুচরো কিছু ঘটনা ঘটবার আগেই মানু’র কাছে তা ধরা দেয়।
একবার মানু’র মত আমারো জ্বর হয়েছিল, তখন আমি মানু’র চেয়েও ছোট। দেখলাম আমার জন্মের আগে বিদায় নেয়া নানা আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। আমি এই কথা মাকেই বলতেই মা হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দেয়। মানু’র জ্বর এবং তার মায়ের কান্নার কন্ঠস্বর আমাকে সেই দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই দৃশ্যে মানু’র মাকে আমার নিজের মা মনে হয়। এটাই ছবির শক্তি।
মানু জ্বরের ঘোরে স্বপ্ন দেখে, এটা কি স্বপ্ন ছিল! হয়তো ওর শৈশবেরই কোন ঘটনা। আর স্বপ্নটাইবা কী ছিল? সিনেমা হল, মানু, বরুণ আর শরফুল। ওরা কি সিনেমা দেখতে যায়? নাকি শৈশবে সিনেমার মতই কোন রোমাঞ্চকর ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিল? ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। সাইকেলের ডানা’র এই দৃশ্য ছাড়াও আরো কিছু দৃশ্য বা খুচরো শট আমার বুঝতে সমস্যা হয়েছে। নির্মাতা ইচ্ছে করেই হয়তো কিছু জায়গায় কিছুটা অস্পষ্টতা রেখেছেন, দর্শকদের ভাবনার খোড়াক।
অবশ্য এর জন্য ছবি দেখার সময় আমার বিশেষ কোন অসুবিধে হয়নি। বিনয় কিংবা জীবনানন্দের কোন কোন কবিতার কোন কোন কথামালা আমার কাছে ভীষণ দূর্বোধ্য মনে হয়, তখন তা অনুভব করি শুধু।
মানু সমাজের কোন গানিতিক হিসেব মেনে চলা মানুষ নয় কিংবা তাকে কোন গানিতিক হিসেবে ফেলে যাচাই করা কঠিন। সে স্বাধীন। তাই সে স্বাধীন এক মুক্তিযোদ্ধার ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের স্বাধীনতাকে জানান দেয়। জানান দেয় ট্রেনের সিগন্যালের সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠে। ওকে আমার কখনই নিঃসঙ্গ মনে হয় না, তবুও আচমকা শরফুলকে খোঁজ করা আমার ভেতরে হাহাকার তৈরী করে। ঠিক সেই সময় রানু যখন লুকিয়ে এসে শরফুলের কথা বলে তখন মানু’কে আমার সবেমাত্র হাঁটতে শেখা শিশুর মত মনে হয়, যাকে কোলে তুলে আদর করা যায়।
ছবি খুব ভালো। রানু ছাড়াও শরফুলের বোন ছবি’র সাথে মানু’র সুন্দর সম্পর্ক। সেই ছোট্টবেলা থেকেই ছবি’কে তার ভালো লাগে। মানু’র প্রতি ছবি’র ভালো লাগাও আমরা টের পাই। যা শেষ দিকে রানু’র সংলাপে আরো স্পষ্ট হয়।
-ছবি তুই একটা বোকা।
মানুকে তার বাবা ঢাকায় নিয়ে যায়। আমরা অপেক্ষায় থাকি মানু আমাদের মতো পরাধীন হয়ে ফিরবে। শেষটায় সে ফিরেও আসে, তবে তার মতিগতি তখনও বোঝা মুশকিল। ঢাকা নেয়ার আগেই মানুর বাবা জানায় পরীক্ষায় বৃত্তি পেয়েছিল তাই খুশি হয়ে সে মানুকে সাইকেল উপহার দেয়। তারপর দীর্ঘশ্বাস! এই সাইকেলই মানু’র কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ আমরা দেখি সাইকেলের ডানায় ভর করে মানু’র উদ্যম শৈশব কেটেছে কিংবা এখনও সে এই ডানায় চেপেই মেঘে মেঘে ভেসে বেড়ায়।
আমার নাম মানু , আমি একটা ছড়া বলবো।
মুরগী এঁকে দেয়ালে,
আপন মনে চাটতে থাকে খেয়ালে
তারপর যেন কী? এই রানু আমাদের চা খাওয়াবি? চুলাটা নিভে যাবে, ভালোমত ফু দিয়ে নিস।
এই যে মানু’র অসংলগ্ন কথাবার্তা অথবা ছবির পরপর আপাত অসংলগ্ন দৃশ্য মালার ভাঁজ, এই ভাঁজ খুলবার প্রথম আনন্দ পাই ‘সাইকেলের ডানা’ দেখে। সেই সুবাধে নুরুল আলম আতিক আমার আপনজন হয়ে উঠেন। যদিও ব্যক্তি নূরুল আলম আতিক সম্পর্কে বিস্তারিত কিছুই জানবার সুযোগ তখনও হয়নি। তাঁকে জানবার চেয়ে বরং তাঁর আরো ছবি দেখার তাগিদ অনুভব করি ভেতরে। সামনে চলে আসে ‘চতুর্থমাত্রা’।
নূরুল আলম আতিকের ‘সাইকেলের ডানা’র লিঙ্ক:
Cycle Er Dana (সাইকেলের ডানা) from nurul alam atique on Vimeo.








