বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন থেকে চার বছরের জন্য মুছে যেতে বসেছে রাশিয়ার নাম। অলিম্পিক থেকে ফুটবল বিশ্বকাপ-সব জয়গাতেই আপাতা গুটিয়ে রাখতে হচ্ছে তিন রঙের পতাকা। ডোপিংয়ের অভিযোগে রুশ অ্যাথলেটদের সবধরনের প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করেছে বিশ্ব ডোপিং বিরোধী সংস্থা-ওয়াডা। এই নিষেধাজ্ঞায় অবশ্য রাজনৈতিক গন্ধ পাচ্ছেন রাশিয়ানরা। সেই সঙ্গে দেশটির প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে ক্রীড়ামহলের সবাই রীতিমতো রাগে ফুঁসছে।
ওয়াডার দেয়া চার বছরের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিভিন্ন রুশ সংস্থা নানা রকম মন্তব্য করেছে। রাশিয়ান ডোপিং বিরোধী সংস্থা-রুসাডার বক্তব্য, ‘এই শাস্তি খুবই দুঃখজনক, কিন্তু প্রত্যাশিত।’ রুশ বক্সিং ফেডারেশন বলেছে, ‘স্টুপিড ডিসিশন।’ আর রুশ সাঁতার সংস্থার মন্তব্য, ‘দেশের ক্রীড়ামহলে অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি।’
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্যারিসে এক বক্তব্যে এই সিদ্ধান্তকে ‘রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত’ ও রায়কে অলেম্পিক সনদের বিরোধী কাজ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
রুশ প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভ ওয়াডার চরম সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটা হচ্ছে রাশিয়া-বিরোধী হিস্টিরিয়ার ফল। অনেক সিদ্ধান্তই নতুন করে নেয়া হয়েছে। দোষী অ্যাথলেটদের শাস্তি দেয়া হয়েছে। তারপরও এই জিনিস চলছে। আসলে রাশিয়া-বিরোধিতাটা একটা রোগে পরিণত হয়েছে।’
ব্যতিক্রম অবশ্য রুশ অ্যাথলেটরা। সেদেশের ইতিহাসের অন্যতম অ্যাথলেট ইলিনা ইসিনবায়েভা টুইটারে এক তীর্যক মন্তব্য করেছেন এই শাস্তি নিয়ে। তার বক্তব্য, ‘ওয়াডার এই শাস্তির জন্য আমিও অন্য রুশ অ্যাথলেটদের সঙ্গে এক আসনে চলে এলাম।’
আসলে, ইসিনবায়েভার মতো কিংবদন্তির বিরুদ্ধে কখনোই ডোপিংয়ের অভিযোগ ওঠেনি। আর সেই কারণেই তার এমন আক্ষেপ।
আরেক নামকরা অ্যাথলেট হার্ডলার টিমোফি চালির বক্তব্য, ‘রুশ ক্রীড়া কর্মকর্তারাই আমাদের ডোবালেন।’
তার এমন কথা বলার কারণ, অবস্থা বুঝে সপ্তাহ দু’য়েক আগে রাশিয়ান ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি শালিয়াখতিন পদত্যাগ করেন। ডোপিংয়ে ধরা পড়া অ্যাথলেটদের ভুয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট বানানোর সঙ্গে তার বিরুদ্ধে যোগসাজসের অভিযোগ উঠেছিল।
রাশিয়ার ডোপ বিরোধী সংস্থার প্রধান ইউরি গানাস সোমবারে এক প্রেসমিটে বলেন, ওয়াডা যা বলেছে, তাতে তাদের সংস্থার উপর কোনো বিধিনিষেধ চাপানো হয়নি। ফলে তাদের সংস্থা এখনো আগের মতোই কাজ করবে এবং এই অচলাবস্থা থেকে বেরোনোর পথ খুঁজবে।
তার আরও সংযোজন, ‘তারা রুসাডার উপর কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করছে না। ওয়াডা মনে করেছে আমরা ভালো কাজ করেছি। যে কারণেই বর্তমানের এই অচলাবস্থা কাটাতে চেষ্টা করছি আমরা। আমাদের খেলাধুলোর জন্যই আমরা এই অচলাবস্থা কাটাতে চেষ্টা করব। আমাদের অ্যাথলিটরা যাতে ওয়াডার বিধিনিষেধ মানে, তার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। আমরা আরও ভালো ভাবে ভবিষ্যতে কাজ করব।’
রুশ প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে অন্যরা যাই বলুন না কেন, ওয়াডার নির্বাহী কমিটির সদস্য ও নরওয়ের এক আইনজীবী লিন্ডা হেলেল্যান্ড বলেন, ‘যে সিদ্ধান্ত আমরা নিলাম, তার জন্য আমরা একেবারেই খুশি হতে পারছি না। কিন্তু এটা আমাদের করতেই হত। খেলাধুলোর জগতে এটা সবচেয়ে বড় দুর্নীতি। যে অ্যাথলেটরা কখনোই ডোপ করেনি, তাদের কাছে অন্তত রুশ সংস্থা এবার ক্ষমা চাক। কারণ এর জন্য তাদেরও ক্ষতি হয়েছে।’
রুশ হুইসলব্লোয়ার, যিনি প্রথম রুশ অ্যাথলেটদের ডোপিং লুকোনোর কথা সামনে আনেন, সেই ডক্টর গ্রিগোরি রোডচেঙ্কভও বিভিন্ন রুশ ক্রীড়াসংস্থাকে কাঠগড়ায় তুলছেন। তিনি বলছেন, ‘আমি এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছি। রাশিয়ান অ্যাথলেটদের ডোপিং লুকিয়ে রাখা দেখে যেসব দেশ এই পথ অবলম্বন করেছে, তারাও এর থেকে শিক্ষা পাবে এবং সাবধান হবে। ডোপ করা যখন অপরাধ, তখন যেসব অ্যাথলেট ডোপ করেছে, তাদের স্থান হওয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রের জেলে। এর পাশে পরিচ্ছন্ন অ্যাথলেটদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।’
রুসাডার কাছে ২১ দিন সময় আছে। এর মধ্যে হয় তাদের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে, না হলে তাদের কোর্ট অফ আর্বিট্রেশন ফর স্পোর্টস (সিএএস)-এর কাছে আবেদন করতে হবে। রুশ পার্লামেন্টের ডেপুটি চেয়ারপার্সন স্বেতলানা ঝুরোভা বলেছেন, ‘আমি ১০০ শতাংশ নিশ্চিত, রাশিয়া কোর্টে যাবে। কারণ আমাদের অ্যথলেটদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদেরই।’
নিরপেক্ষ পতাকার নীচেও রুশ অ্যাথলেটদের নামতে দেয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছেন না যুক্তরাষ্ট্রের ডোপ বিরোধী সংস্থার প্রধান ট্রাভিস টাইগার্ট। তিনি বলেছেন, ‘পরিচ্ছন্ন অ্যাথলেটদের কাছে এটা মারাত্মক ধাক্কা। যারা পরিচ্ছন্নভাবে খেলে, তাদের সামনে একজোট হয়ে প্রতিবাদ করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকছে না। সেটা হলে যদি পরিস্থিতি বদলায়। রুশ সংস্থার দুর্নীতির জন্যই পরিচ্ছন্ন অ্যাথলেটদের ভুগতে হচ্ছে।’







