১৯৭১ সালে পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি বাঙালি নিধনযজ্ঞে নামা
নরপিশাচদের আরেক নাম আল-বদর বাহিনী। বুদ্ধিজীবী হত্যা,
গণহত্যা-খুন-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগকারী বদর বাহিনীর কমান্ডার মতিউর রহমান
নিজামীর ফাঁসির মাধ্যমে ন্যায় বিচার নিশ্চিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন এই বিচারের প্রতীক্ষায় থাকা একাত্তরে স্বজন হারানো বহু মানুষ।
হিংস্র হায়েনা নিজামীর অপরাধের মাত্রা এতোটাই ছিলো যে সর্বোচ্চ আদালতের
পুনর্বিবেচনাতেও তার শাস্তি এতটুকুও কমানো হয়নি। বরং মৃত্যুদণ্ডের রায়
পুনর্বিবেচনার ২২ পৃষ্ঠার রায়ে আদালত স্পষ্ট করে বলে দেন, ‘নৃশংস ও বর্বর হত্যাকাণ্ডের জন্য আসামির একমাত্র সাজা মৃত্যুদণ্ড’।
‘এটি স্পর্শকাতর একটি মামলা, যার নিষ্পত্তির দিকে তাকিয়ে আছে সারা দেশ।’ নিজামীর রিভিউ শুনানির সময় গত ৩ এপ্রিল এই মন্তব্য করেছিলেন প্রধান বিচারপতি এস. কে সিনহা। আর ৫ মে দেশের সেই প্রত্যাশাই পূরণ হয় রিভিউ আবেদন খারিজ করে নিজামীর ফাঁসি বহাল রাখার মাধ্যমে। এরপর কলঙ্ক মুক্তির প্রস্তুতি নিতে শুরু করে জাতি।
যে তিন অভিযোগে ফাঁসি:
১. স্থানীয় শান্তি কমিটির সদস্য ও রাজাকারদের উপস্থিতিতে একাত্তরের ১০ মে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বাউশগাড়ি গ্রামের রূপসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় শিগগিরই পাকিস্তানি সেনারা শান্তি রক্ষার জন্য আসবে বলে জানান নিজামী। সভার পরিকল্পনানুযায়ী ১৪ মে ভোড় ৬টা দিকে বাউশগাড়ি, ডেমরা ও রূপসী গ্রামের সাড়ে চারশো মানুষকে পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করে এবং প্রায় ৩০-৪০ জন নারীকে ধর্ষণ করে সেনা ও রাজাকাররা।
২. পাবনার ধুলাউড়ি গ্রামে নিজামীর নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজতে গিয়ে ১৯৭১ সালের ২৭ নভেম্বর ডা. আব্দুল আউয়াল ও অন্যান্য বাড়িতে হামলা চালিয়ে নারী-পুরুষ-শিশুসহ ৫২ জনকে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনা ও রাজকার বাহিনী।
৩. বাংলাদেশের বিজয়ের প্রাক্কালে অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে পাকিস্তানের দোসর আলবদর বাহিনী। ইসলামী ছাত্রসংঘ ও আলবদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে যার দায় নিজামীর।
চূড়ান্ত রায়ের পর আইন অনুযায়ী রিভিউ আবেদন বা রায় পুনর্বিচেনা আবেদনের শেষ সময় ছিলো গত ৩০ মার্চ। এই সময় শেষ হওয়ার একদিন আগে করা ৭০ পৃষ্ঠার আবেদনে ৪৬টি কারণ দেখিয়ে নিজামীর পক্ষে রায় পুনর্বিবেচনা চাওয়া হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাবনায় হত্যা, ধর্ষণ এবং বুদ্ধিজীবী গণহত্যার দায়ে ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর নিজামীকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে তা আংশিক মঞ্জুর করে এ বছরের ৬ জানুয়ারি ফাঁসির দণ্ড বহাল রাখেন সর্বোচ্চ আদালত। আড়াই মাস পর সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ১৫৩ পাতার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়, যেখানে গণহত্যা, ধর্ষণ এবং অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের তিন অভিযোগে নিজামীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার কারণ ব্যাখ্যা করেন আপিল বিভাগ।
ট্রাইব্যুনালের রায়:
২০১০ সালের ২৯ জুন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের একটি মামলায় জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীকে গ্রেপ্তার করার পর একই বছরের ২ অগাস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এরপর ২০১৩ সালের ২৮ মে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে জামায়াত আমিরের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক খানসহ প্রসিকিউশনের পক্ষে মোট ২৬ জন এ মামলায় সাক্ষ্য দেন। নিজামীর পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন তার ছেলে মো. নাজিবুর রহমানসহ মোট চারজন।
বিচার শেষে ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল যে রায় দেন তাতে প্রসিকিউশনের আনা ১৬ অভিযোগের মধ্যে আটটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। এই আট অভিযোগের মধ্যে ২, ৪, ৬ ও ১৬ নম্বর ঘটনায় ট্রাইব্যুনালে নিজামীর ফাঁসির রায় হয়।
এসব ঘটনার মধ্যে সাঁথিয়ার বাউশগাড়ি, ডেমরা ও রূপসী গ্রামের প্রায় সাড়ে ৪০০ মানুষকে হত্যা, ৩০-৪০ জন নারীকে ধর্ষণ; করমজা গ্রামে নয়জনকে হত্যা, একজনকে ধর্ষণ, বাড়িঘরে লুটপাট-অগ্নিসংযোগ; ধুলাউড়ি গ্রামে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ৫২ জনকে হত্যা এবং মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয়ের ঊষালগ্নে অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ রয়েছে।আর অপরাধে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হওয়ায় ১, ৩, ৭ ও ৮ নম্বর অভিযোগে জামায়াত আমিরকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
এসব ঘটনার মধ্যে পাবনা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাওলানা কছিমুদ্দিনকে অপহরণ করে হত্যা; মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর ক্যাম্প খুলে মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র ও সহযোগিতা; পাবনার বৃশালিখা গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ সেলিমের বাবা সোহরাব আলীকে স্ত্রী-সন্তানদের সামনে হত্যা; ঢাকার নাখালপাড়ার পুরোনো এমপি হোস্টেলে আটক মুক্তিযোদ্ধা জহির উদ্দিন বিচ্ছু জালাল, বদি, রুমি (শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ছেলে), জুয়েল ও আজাদকে হত্যার পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়, “দশকের পর দশক ধরে শহীদ বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের স্বজন ও জাতির অব্যক্ত ব্যথার ক্ষেত্রে আইনের ভাষা নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে না। ন্যায় বিচার হচ্ছে সেটাই, যা অপরাধীকে তার কৃতকর্মের ফল শোধ করে দেয়”।







