বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের ল্যান্স নায়েক, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৪৩ সালের ৮ মে ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী থানার সালামতপুর গ্রামে তার জন্ম। পিতা মুন্সী মেহেদী হাসান ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম। মাতা মকিদুন্নেসা।
আব্দুর রউফ গ্রামের স্কুলে পড়াশুনা করেন। বাবার কাছেই তার লেখাপড়ার হাতেখড়ি। মাও ছিলেন সাক্ষর। বাবা তাকে ডাকতেন রব বলে। অসম্ভব সাহসী ও মেধাবী রউফের লেখাপড়ার প্রতি ঝোঁক ছিলো না মোটেই। অথচ বাবা মায়ের অক্লান্ত চেষ্টা ছিলো তাকে পড়াশুনায় মনযোগী করে তুলতে। কিন্তু বইয়ের পাঠ তার ভালো লাগত না। ছোট চাচা মুন্সি মোতালেব হোসেনের সঙ্গই বরং তার অধিক প্রিয় ছিলো।
চাচা মুন্সি মোতালেব হোসেন ছিলেন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের হাবিলদার। চাচা যখনই বাড়ি ফিরতেন তখনি তিনি তাকে শোনাতেন সৈনিকদের সুশৃঙ্খল ও রোমাঞ্চিত জীবনের গল্প। সৈনিকদের লেফট রাইট শব্দ তার কানে মধুর ঝংকার তুলত। সৈনিক হওয়ার অদম্য বাসনা তাকে ঘিরে ধরে বাল্যকালেই।
শৈশবেই তিনি পিতৃহারা হন। সংসারের অভাব দেখে আবদুর রউফ ১৯৬৩ সালের ৮ মে পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসে যোগ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে নিয়োগ পান পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে মুন্সি আব্দুর রউফ চট্টগ্রামে ১১ উইং-এ চাকরিরত ছিলেন। তিনি ছিলেন মাঝারি মেশিনগান ডিপার্টমেন্টের ১ নং মেশিনগান চালক। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে যুক্ত হন। তখন সবে যুদ্ধের প্রস্তুতিপর্ব। মাঝে মাঝে গড়ে তোলা হচ্ছে ছোটখাটো প্রতিরোধ।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আব্দুর রউফ ইপিআর-এর ১১নং উইং চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা সারা দেশে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। চট্টগ্রাম ইপিআর-এর বাঙালি সদস্যদের পূর্ব সচেতনতা এবং সময়োচিত পদক্ষেপের কারণে তারা রুখে দাঁড়ায় শত্রুর বিরুদ্ধে। রাতেই তারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। যোগ দেয় ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাথে।
ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ইপিআর-এর ১৫০ জন সৈনিককে দায়িত্ব দেয়া হয় রাঙ্গামাটি-মহালছড়ি নৌপথে নিরাপত্তাব্যুহ তৈরির। এই দলের এক নম্বর এলএমজি চালক মুন্সী আব্দুর রউফ ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের নানিয়ারচর উপজেলাধীন বাকছড়ির একটি বাঙ্কারে।
সেদিন ৮ এপ্রিল, ১৯৭১। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২নং কমান্ডো ব্যাটেলিয়ানের দুই কোম্পানি সৈনিক ৭টি স্পিডবোট ও ২টি লঞ্চ সহযোগে রাঙ্গামাটি-মহালছড়ি নৌপথের আশেপাশে অবস্থানরত মুক্তিবাহিনীর উপর আক্রমণ চালায়। গনগনে মধ্য দুপুরের এক বিশেষ মুহূর্ত। সূর্য মাথার উপর থেকে পশ্চিম দিকে হেলে পড়ার জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নিচ্ছে। নীরব-নির্জন হ্রদের বুক চিরে শান্ত পানিতে অস্থির ঢেউ তুলে এগিয়ে আসতে লাগলো সাতটি স্পিডবোট এবং দুটো লঞ্চ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দুই কোম্পানি সৈন্য। তাদের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় এবং ভারী অস্ত্রশস্ত্র। এটি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটেলিয়নের কোম্পানি। লক্ষ্য বুড়িঘাটের মুক্তিবাহিনীর নতুন প্রতিরক্ষা ঘাঁটি।
লক্ষ্যের দিকে তীব্রগতিতে ছুটে আসছে দুটি স্পিডবোট এবং দু’টি লঞ্চ। এগুলোতে রয়েছে ছয়টি তিন ইঞ্চি মর্টার আর অনেক মেশিনগান ও অনেক রাইফেল। অন্যদিকে এই জলপথ পাহারা দিচ্ছে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের যে কোম্পানিটি, সেই কোম্পানিটি মাত্র কয়েকদিন আগে পাকিস্তান বাহিনী ত্যাগ করে আসা।
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ঘাঁটির কাছাকাছি পৌঁছেই পাকিস্তান বাহিনী শুরু করলো আক্রমণ। স্পিডবোট থেকে ক্রমাগত চালাতে লাগলো মেশিনগানের গুলি আর লঞ্চ দু’টো থেকে ছুটে আসছে অবিরাম তিন ইঞ্চি মর্টারের শেল। মুক্তিযোদ্ধাদের দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে আসতে লাগলো গুলির পর গুলি। গোলাগুলির প্রচণ্ড শব্দে আকাশ বাতাস কেঁপে উঠলো। পানির ভেতর অদ্ভুত আলোড়ন উঠলো। শব্দগুলো পাহাড়ের গায়ে গায়ে বাড়ি খেয়ে এক মহাধ্বনিযজ্ঞের সূচনা করলো। শীতল সবুজে হঠাৎ যেনো লেগে গেল শব্দের আগুন।
পাকিস্তানি বাহিনীর একটাই উদ্দেশ্য, রাঙামাটি-মহালছড়ির জলপথ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের পিছু হটিয়ে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা। আক্রমণের আশংকা মুক্তিযোদ্ধাদের মনে আগেই ছিলো। তাদের লোকবল, অস্ত্রশস্ত্র নেই বললেই চলে। কিন্তু মনের ভেতর দেশের জন্য জমানো আছে অসীম সাহস, তেজ ও দৃপ্ত অঙ্গীকার। দৃঢ় প্রত্যয় বুকে নিয়ে তারা ঝাপিয়ে পড়েছিলো দেশকে বর্বরদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য।
মুক্তিযোদ্ধারা খুব দ্রুতই পজিশন নিয়ে নিল পরিখায়। কিন্তু শত্রুপক্ষের গোলাগুলির তীব্রতা এত বেশি ছিলো যে, ভেঙে যেতে লাগলো প্রতিরোধ ব্যবস্থা। শত্রুদের মর্টার চিহ্নিত করে ফেললো মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক অবস্থান। আর তাই তীব্র গুলিবর্ষণে ভেঙে পড়লো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান পেছনে হটার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু নিরাপদে অবস্থান ত্যাগের জন্য প্রয়োজন নিরবিচ্ছিন্ন কাভারিং ফায়ার। মুন্সী আবদুর রউফের এলএমজির কাভারিং ফায়ারে ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান তার সৈন্যদের নিয়ে পেছনে হটতে থাকেন। মুন্সি আব্দুর রউফ দেখলেন, শত্রু এগিয়ে এসেছে খুব কাছে আর এভাবে সকলে একযোগে পিছু হটতে চাইলে একযোগে সকলেই মারা পড়বে। কাভার দেয়ার জন্য কাউকে না কাউকে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।
কিন্তু কে নেবে এই দুরূহ দায়িত্ব? মৃত্যুর সম্ভাবনা শতভাগ।এগিয়ে এলেন মেশিনগানম্যান মুন্সী আব্দুর রউফ। জীবনের শেষবারের মতো চাপ দিলেন মেশিনগানের ট্রিগারে ৷ অনবরত গুলি করতে লাগলেন পাকিস্তানি স্পিড বোটগুলোকে লক্ষ্য করে।
ল্যান্স নায়েক আব্দুর রউফ এক একটা স্পিডবোটকে লক্ষ্য স্থির করে মেশিনগান দিয়ে অবিরাম গুলিবর্ষণ করতে থাকেন। তার প্রচণ্ড গুলিবৃষ্টিতে থমকে গেলো শত্রুরা। তারা প্রত্যাশাও করেনি এমন পাল্টা আক্রমণ হতে পারে। তার মেশিনগানের নির্ভুল নিশানায় একটি একটি করে সাতটি স্পিড বোটই ডুবে গেলো। এমন পর্যায়ে শত্রু সেনারা তাদের দু’টি লঞ্চ নিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হলো। পিছু হটতে হটতে দু’টো লঞ্চই চলে গেলো রউফের মেশিনগানের গুলির আওতার বাইরে নিরাপদ দূরত্বে। হানাদার বাহিনী এবার তাদের লঞ্চ থেকে শুরু করলো মর্টারের গোলাবর্ষণ। তারা লক্ষ্য স্থির করলো, যেভাবেই হোক থামিয়ে দিতে হবে মুক্তিবাহিনীর মেশিনগানটাকে।
একের পর এক ক্রমাগত মর্টারের গোলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা রউফের একার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। শত্রুর একটি মর্টারের গোলা হঠাৎ এসে পড়ে তার বাঙ্কারে৷ মৃত্যুশেলে ঝাঁঝরা হয়ে যায় তার সমস্ত শরীর। থেমে গেলেন তিনি৷ হাত থেকে পাশে ছিটকে পড়ল মেশিনগান। ততক্ষণে তার সহযোগী যোদ্ধারা সবাই পৌঁছে যেতে পেরেছে নিরাপদ দূরত্বে।
নিজের প্রাণের বিনিময়ে শত্রুদের ঘায়েল করার পাশাপাশি সহযোদ্ধাদের জীবনও রক্ষা করলেন তিনি। সহযোদ্ধারা পরে তার লাশ উদ্ধার করে নানিয়ারচরের চিংড়ি খাল সংলগ্ন একটি টিলার উপর সমাহিত করে।
চির রুদ্রের প্রতীক এই বীরকে সমাহিত করা হয়েছিলো রাঙামাটি শহরের রিজার্ভ বাজারে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে। ১৯৯৬ সালে রাঙামাটিবাসী প্রথম জানতে পারে, এ চিরসবুজ পাহাড়ের মাঝেই ঘুমিয়ে আছেন বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ। ঐ সময় দয়ালন চন্দ্র চাকমা নামে এক আদিবাসী বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফের সমাধিস্থল শনাক্ত করেন।
শনাক্ত করার পর তার সমাধিস্থলটি সরকার নতুনভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে তার বীরত্ব ও আত্মদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করে। বাংলাদেশ রাইফেলস ১৯৭৩ সালে সিপাহী মুন্সী আবদুর রউফকে অনারারি ল্যান্স নায়েক পদে মরনোত্তর পদোন্নতি দান করে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






