মতামত

নির্বাচনী আলাপ, মনোনয়ন বিলাপ

নির্বাচনী আলাপ, মনোনয়ন বিলাপ

মনোনয়ন আকাঙ্খার বাম্পার ফলন হয়েছে এবার। ‘অমুক-তমুক বিভাগ চাই’- এর পর এবার যেন শুধুই ‘নির্বাচনে মনোনয়ন চাই’। এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ট্রল বা তামাশায় ওজন হারিয়েছে। 

গত কিছুদিন ধরে নির্বাচনী আবহাওয়া ইতিবাচক গতিপথে প্রবাহিত হচ্ছে দেখে খুব আশাবাদী হয়েছিলাম। বিশেষত, রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সংলাপ, ইসি কর্তৃক দেশবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল; মাশরাফির নমিনেশন ইত্যাদি কারণে মনে হয়েছিল নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশটা বোধহয় সঠিক পথেই এগুচ্ছে।

কিন্তু ভুল সবই ভুল!

আমার নিজ জেলা নরসিংদীর উদাহরণই টানি। ১৪ নভেম্বর জাতীয় একটি দৈনিকের খবরে দেখলাম, নরসিংদীর ৫টি আসনে নৌকার মনোনয়নপ্রত্যাশী ৩৯ জন। এ বিষয়ে আমি নিজেই ট্রল করেছিলাম যে, ‘নরসিংদীবাসী ভালবেসে আমাকেও মনোনয়ন দিতে চায়। ৪০ একটি পূর্ণ সংখ্যা ফ্যাক্টস।’

আওয়ামী লীগ-মনোনয়ন-মনোনয়নপত্র-নির্দেশনা মানছে না

কিন্তু বিষয়টি কেবল মজা পাবার বা ট্রল করার জন্য ঠিক নয়। এর ভেতরের গভীর যে অর্থ লুকিয়ে আছে তা নিশ্চয়ই আমাদের কাউকে আর বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আজ সকালে জানা গেল নরসিংদীর ৫টি আসনে নৌকার মনোনয়নপ্রত্যাশী এখন ৪১ জন। এই অবস্থা কেবল নৌকা প্রতীকে তা নয়, এমনকি নরসিংদীর ৫টি আসনে বিএনপির মনোনয়ন কিনেছেন ২৪ জন। তাহলে যদি যোগ করি তাহলে দাঁড়ায় ৪১+২৪=৬৫ জন ৫ আসনের জন্য।

এছাড়া স্বতন্ত্রসহ আরো বাড়তে পারে। তবু আপাতত ৫ আসনের জন্য ৬৫-তেই রইলাম। মানে দাঁড়াচ্ছে ১৩ জন একটি আসনের জন্য। এই অনুপাতে গেলে সারা দেশের অবস্থা আরও ভয়াবহ।

এবার আসুন বিশ্লেষণ করি, এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক। প্রাথমিক ভাবে মনোনয়নকে সামনে রেখে আমরা অনেক দিন পর একরকম উৎসব মুখর পরিবেশ দেখতে পেয়েছি। যেটি আপাতদৃষ্টিতে সকলের কাছে স্বস্তিকর হলেও তা খুব দ্রুতই অস্বস্তি বাড়ালো। পাশাপাশি বড় শহরকেন্দ্রিক জনগনের দুর্ভোগ এরও কমতি ছিল না।

এই দুর্ভোগটা কাম্য নয় তবু এ পর্যন্ত মেনে নেয়ার সংস্কৃতিতে আমরা খুব একটা অনভ্যস্ত নই।

বড় দল দুটির মনোনয়ন বাবদ আয়ের অংকটা কিন্তু বেশ ভাল শুনিয়েছে। মনোনয়ন ফরম বাবদ ৩ দিনে আওয়ামী লীগের আয় ১০ কোটি টাকা।  বিএনপির পাল্লাও কম ভারী তা বলা যাবে না।

সুতরাং দলের জন্য এটি একটি আয় বলা যায়। কিন্তু শুধু এইটুকু দিয়ে কি সম্ভব ইতিবাচক ভাবনার? একেবারেই নয়।

নেতিবাচকতার পাল্লাই বেশি ভারি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামালের নেতৃত্বে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সংলাপে বসা, আলোচনা-পর্যালোচনার মত বিষয়টি বাংলাদেশে একটা ভোটের আমেজ নিয়ে এসেছিল। কিন্তু মনোনয়ন কেন্দ্রিক জটিলতা আবার সেই আমেজকে কিছুটা ধোঁয়াশার সৃষ্টি করেছে। কেন এবার মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সংখাটা এত বেশি ? মনোনয়ন প্রত্যাশীরা কী চিন্তা ধারা পোষণ করছেন? সরকার পক্ষ, বিরোধী পক্ষের হর্তাকর্তারা কী ভাবছেন, কিংবা খোদ নির্বাচন কমিশন এই বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন? এমন বহু প্রশ্নের উদয় হওয়া খুব স্বাভাবিক। কিন্তু উত্তর দেয়া ঠিক এই সময়ে দাঁড়িয়ে খুব একটা যে সহজ নয় তা সবাই বুঝতে পারছেন।

আওয়ামী লীগ-মনোনয়ন-মনোনয়নপত্র

এমনকি খোদ ক্ষমতাসীন সরকারী দলেও এই বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে এ আভাস পাওয়া গেছে। আওয়ামীলীগ থেকে কিন্তু এক প্রকার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে, এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কোনভাবেই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন হিসেবে চিন্তা করার সুযোগ নেই।

এবার অন্তত ৫ জানুয়ারির মত ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ার সুযোগ নেই। তার মানে দাড়াচ্ছে রাতারাতি এমপি বনে যাওয়া এবার সম্ভব নয়। আর ২০১৪ সালের মত প্রতিপক্ষ ও আর বোকামি করবে না সেটা এর মধ্যেই পরিষ্কার।

বিষয়টি না বোঝার কোন কারণ আমি দেখি না। তাহলে গণ্ডগোলটা ঠিক কোথায়? বিভিন্ন জন বিষয়টিকে বিভিন্নভাবে দেখে থাকলেও যে বিষয় এখানে পরিষ্কার তা হল, মোটা দাগে বলতে গেলে, আমাদের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল চরম অসহিষ্ণু-অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেটা কারোর জন্যেই সুখকর নয়।

যদিও ক্ষমতাশীল দলের অনেকেই বলছেন যে, দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় থাকার কারণে রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ বেড়েছে।  তাই নেতৃত্ব তৈরির জায়গা সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমে ভাবলাম ঠিক আছে, এটা একটা ব্যাখ্যা হতে পারে। কিন্তু যখন দেখা গেল একই চিত্র বিএনপির ক্ষেত্রেও, তখন আর এই ব্যাখ্যা মেনে নেয়া গেল না।

তাহলে ৩০০ আসনের বিপরীতে এই বিশাল সংখ্যা আমাদের কী ইঙ্গিত করে????

এটি আমাদের ইঙ্গিত করে দলের ভেতরকার ভয়াবহ রকম সাংগঠনিক দুর্বলতা, কেন্দ্রীয় একক নির্দেশ না মানা, পারস্পারিক অশ্রদ্ধা, দলীয় কোন্দল, কলাগাছের মত যত্রতত্র কমিটি দেয়া ইত্যাদি ইত্যাদি বহুকিছু।

ঠিক এই জায়গাতেই কিছু কথা বলতে চাই। চলুন, আবার একটু আমাদের নরসিংদী থেকে ঘুরে আসি; বিশেষ করে আমার এলাকা রায়পুরা।

নরসিংদী ৫ (রায়পুরা) আসন থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে জমা দিয়েছেন আটজন। তারা হলেন বর্তমান সাংসদ ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সাবেক মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু ও তাঁর ছেলে রাজিব আহমেদ পার্থ, ছোট ভাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমেদ বাচ্চু, যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. হারুনুর রশীদ, আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটি সদস্য অ্যাডভোকেট রিয়াজুল কবীর কাউছার, কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ সামছুল হক, ব্যারিস্টার তৌফিকুর রহমান, কেন্দ্রীয় মৎস্যজীবী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার।

আওয়ামী লীগ-মনোনয়ন-মনোনয়নপত্র-নির্দেশনা মানছে না

আমি শুধু বলব একটু খেয়াল করেন, যখন একই পরিবারের পিতা, পুত্র এবং পিতার ভাই বা পুত্রের চাচা যাই বলি না কেন তাড়া প্রত্যেকেই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এর চেয়ে হাসির খোরাক আর কী হতে পারে? একটি পরিবার নিজ পরিবারের ভেতর থেকেই যখন ৩ জন থেকে ১ জন প্রতিনিধি নির্বাচনে ব্যর্থ সেখানকার পরিস্থিতি কি আর চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর দরকার আছে?

এবার চলুন দেখি, সেখানকার রাজনৈতিক অংশীদার কারা কারা? তারা হলেন, বর্তমান সাংসদ ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক, আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটি সদস্য, কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক, কেন্দ্রীয় মৎস্যজীবী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং অন্যান্য। বাহ বাহ চমৎকার!

আমরা এখানে অন্য লীগের সভাপতির নাম দেখলেও অবাক হতাম না। না বলে পারছি না যে, এই যে কৃষক লীগ, তাঁতি লীগ, মৎস্যজীবী লীগ- এত এত কমিটি এগুলোর স্বীকৃতি দিচ্ছে কারা? কারা বানাচ্ছে এত এত কাবিল নেতা?

এর পাশাপাশি ছাত্রলীগ, যুবলীগ জেলা কমিটি, কেন্দ্রীয় কমিটি -এইসব কমিটি কে কার অধীনে, কোথা থেকে এর নিয়ন্ত্রণ সুতো টানা হয়, তা নিয়ে দল থেকে কোন বিশেষ দিক নির্দেশনা নেই? আমি বিশ্বাস করি আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মত দলের অবশ্যই সঠিক নির্দেশনা আছে। আমি নিজে এক সময় ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলাম। অন্তত ছাত্রলীগ এর ভেতর যে চেইন অব কমান্ড আছে তার ১০ ভাগও মনে হয় এই সংসদ আসন কেন্দ্রিক স্থানীয় পর্যায়ে নেই। কেবল আওয়ামী লীগের উদাহরণ টানলাম বলে একথা ভাবার কোন সুযোগ নেই যে অন্যান্য দলের পরিস্থিতি ভাল। সব দলেই এক চিত্র। এর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের একটানা ক্ষমতা চর্চার অভ্যাসে ফের ক্ষমতা পেতে মরিয়া হয়ে যাওয়া কি এর কারণ?

অপর পাশে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থেকে যাওয়া প্রতিপক্ষের দেয়ালে পিঠ থেকে যাওয়া কি কারন? এই দুটি কারণকেও উড়িয়ে দেয়া সম্ভব নয়।

এখন প্রশ্ন হল- এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

প্রতিবার নির্বাচনের সময় আমাদের জানমালের পাশাপাশি কিছু প্রাণের ক্ষতি হয়। একেবারে অতীতের সকল নির্বাচনের চিত্র একই। আমরা মোটামুটি ধরেই নেই কিছু প্রাণের অপচয় তো হবেই। তাই সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকে, এই ক্ষতি যত কমানো যায় তত মঙ্গল। কিন্তু আদতে আমরা তা কমাতে পারছিনা। একজন সরকার প্রধান, একজন নির্বাচন প্রধানের পক্ষে কী একা কেন্দ্রিয় জায়গা থেকে এই ক্ষতি কমানো সম্ভব?

উত্তর এক শব্দে- না। আমাদের শরীর ও মন থেকে ২০১৪ সালের আগুন সন্ত্রাসের ক্ষতের জ্বালা শুকায়নি এখনও।  সেই ক্ষতে আবার কেরোসিন ঢেলে নতুন ক্ষত সৃষ্টি হল আজই। সারাদিন তাকানো যায়নি সংবাদ মাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।  দোষ কার, দায় কার? সেই হিসেব কষতে বসে লাভ নেই। এইতো সবে শুরু। তাহলে সংলাপ করে কার কী লাভ হল?

সবচেয়ে দুঃখজনক যখন রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী ঐক্যফ্রন্ট এর প্রতিনিধিদের সাথে বসে নির্বাচনের পরিকল্পনা ও মত বিনিময় করছেন, ঠিক একই সময়ে দুই প্রধান দলের স্থানীয় প্রতিনিধিরা একক একক সিদ্ধান্তে নিজেদের নমিনেশন কাগজ তোলার আনন্দ উৎসবের আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়ে ভাবছেন। যখন আমরা নিজের ঘর, নিজের সমাজকেই সামলাতে পারছি না তাহলে এই জাতীয় সংলাপের কী প্রয়োজন আছে?

কোন প্রয়োজন নেই। আমাদের বরং এখন বেশি প্রয়োজন নিজেদের ভেতর আলাপের। স্থানীয় পর্যায়ের নেতা কর্মীদের নিজেদের মধ্যে আলাপ জরুরী। নতুবা এই নির্বাচনের যে পরিমানের প্রাণের ক্ষতি হবে তা আমি আপনি গুণে শেষ করতে পারব না।

শেষ করব নীতি কথা দিয়ে। আসলেই আগের দিনের গল্পের শেষের নীতি বাক্য আবারো আমাদের পড়ার সময় এসেছে। আজকের লেখার নীতি উপদেশ হল, ‘ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে দলের স্বার্থ বড়, আর দলের স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থ বড়’।

তাই বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় নিজ স্বার্থ, দলের স্বার্থ সব ভুলে দয়া করে দেশের স্বার্থ ভাবুন।

যে নির্বাচনে আপনাকে ক্ষমতার আসনে বসাতে আসা জনতার জীবনের অপচয় হয়, সেই নির্বাচন জনতার প্রয়োজন নেই।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিষয়:আওয়ামী লীগ বিএনপি মনোনয়ন

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…