যেকোন ভাই হওয়ার বাংলা প্রবাদের মতো মন্ত্রীর মুখে ‘মালাউন’ গাল শুনে বাংলাদেশের হিন্দু ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন এবং অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীলদেরতো খুশি হওয়ার কথা ছিল। তারা এত কান্নাকাটি, এত বিলাপ আর এত আহাজারি করছে কেন? এই গালিটা তো বাংলাদেশের বাঙালি মুসলিম সমাজে খুবই প্রচলিত। বাংলাদেশে বছরের পর বছর ধরে প্রতিদিন কতশত হিন্দুইতো এই গালি খান, অপমান হন, ক্ষুব্ধ হোন এবং নীরবে চোখের জল ফেলেন। একইভাবে বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতির মধ্যেও এই গালির বিপরীত গালি আছে।
মন্ত্রী মহোদয় এই গালিকে বরং স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি এভাবে এটিকে স্বীকৃতি দিয়ে সামনে না আনলে তো এটি জাতীয় ইস্যূতে পরিণত হতো না। এটিকে জাতীয় ইস্যু করে তোলায়, কেউ না দিক, আমি মাননীয় মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রী ছায়েদুল সাহেবকে ধন্যবাদ দিচ্ছি। অন্তত এই গালির ব্যাপারে তিনি একটি জাতীয় সচেতনতা তৈরি করেছেন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের হিন্দু সমাজ এই গালির হাত থেকে একটু হলেও রেহাই পাবে। অবশ্য আমাদের মতো চুনোর (চুনোপুঁটি) ধন্যবাদে উনার কিছু কি যায় আসে?
সরকার ও বিরোধীদল জনগণের ক্ষমতায়ন করুক আর না করুক, ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম যে পরিমাণ জনগণের ক্ষমতায়ন করেছে, তাতে তাদের আওয়াজ ও প্রতিবাদ দেখে বোঝা যাচ্ছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের ঘটনার চেয়েও মন্ত্রীর গালি বড় হয়ে গেছে সবার কাছে। তাদের অনেকেই ঘটনাটিকে গোটা বাংলাদেশের চিত্র হিসেবে তুলে ধরছেন।
ঠিক হচ্ছে না! মোটেও ঠিক হচ্ছে না। ঠিক আছে, মানছি যে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বা নাসিরনগর বাংলাদেশের বাইরে নয়, তবে নাসিরনগর কিন্তু গোটা ব্রাহ্মণবাড়িয়া নয়। একইভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নয় গোটা বাংলাদেশ। বাংলাদেশের যত লোক নানাভাবে এই ঘটনার নিন্দা জানাচ্ছে, তারাও ওই ঘটনায় জড়িতদের চেয়ে সংখ্যায় বেশি।
নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলার ঘটনায় যারা প্রতিবাদ জানাচ্ছে তারাও মনে হয় একটা জায়গায় ভুল করছে। বড় ভুলই করছে। তারা এটিকে সাম্প্রদায়িক হামলা বলে চালিয়ে দিতে চাচ্ছে। সংজ্ঞা, সূত্র ও পরিভাষা অনুযায়ী এটিকে হয়ত সাম্প্রদায়িক হামলা বলাই যাবে। কিন্তু এটি কি শুধুই সাম্প্রদায়িক হামলা? নাসিরনগরের অধিকাংশ মানুষ কি এই ঘটনায় জড়িত? কেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়ই বারবার এই ধরনের ঘটনা ঘটছে? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলেতো প্রতিবাদ ও আবেগের তোড়েও মাথা ঠিক রাখতে হবে।
মাথা যদি ঠিক নাই রাখতে পারেন তাহলে ফেসবুকের ছবি-টবির সূত্র ধরে রাগে-ক্ষোভে, আবেগ ও উন্মতার বশে অন্ধ হয়ে যারা হামলা চালিয়েছে তাদের মতোই আপনারাও আবেগের বশে প্রতিবাদ চালাচ্ছেন। আমি বলতে চাই না যে নাসিরনগরের ঘটনা মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন রাগে-ক্ষোভে-আবেগে-উন্মাদনায় ঘটিয়েছে।
ঠিক যেভাবে কোনো জঙ্গি হামলার ঘটনায় আপনারা সব মুসলিমকে দায়ী করেন না, একইভাবে এখানেও আমি নাসিরনগরের মুসলিম সম্প্রদায়কে দায়ী করি না। ঠিক যেভাবে জঙ্গিরা একটি রাজনৈতিক উগ্রবাদী গোষ্ঠি এবং ধর্মের দোহাই তোলা দুর্বৃত্ত, একইভাবে এই হামলায় জড়িতদেরও রাজনৈতিক পরিচয়, পৃষ্ঠপোষকতা, ইন্ধন ও উসকানি আছে।
‘সাম্প্রদায়িকতা’ এই পরিভাষাটিই কিন্তু সাম্প্রদায়িক হামলার সুযোগ করে দেয়। বিপুল আত্মীকরণ ক্ষমতার এই পরিভাষার মধ্যে অপরাধীর গা ঢাকা দেওয়ার সুযোগ থাকে। ‘সাম্প্রদায়িকতা’ শব্দটির মধ্যেই অপরাধীর গোষ্ঠীগত ও দলীয় পরিচয় হারিয়ে যায়। অপরাধীর ব্যক্তি-পরিচয়ের চেয়ে সাম্প্রদায়িক পরিচয় বড় হয়ে ওঠে এবং তার অপরাধের কারণ ও উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়। চাপা পড়ে যায় ভিকটিমের আর্তনাদ এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার সম্ভাবনাও। আমার মনে হয়, ঠিক এই কারণেই সরকার জঙ্গিবিরোধী অভিযানের সময় কখনোই বলে না যে বাংলাদেশে আইএস আছে।
আইএস আছে মেনে নিলেই বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত একটা প্রপঞ্চের মধ্যে স্থানীয় দুর্বত্তদের হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনা থাকে এবং তাদের সনাক্ত করা ও খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে যায়। এজন্যই এক্ষেত্রেও অনুরোধ করব, সরকার, বিরোধীদল এবং সচেতন জনগণ— কেউ যেন নাসিরনগরের হামলার মতো ঘটনাগুলোকে সাম্প্রদায়িক ঘটনা বলে মেনে না নেন। হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের তিন নেতাকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।
বরখাস্তের ওই সংবাদে আমরা যে বিবরণ পাচ্ছি তাতে স্পষ্টতই মনে হয়, নাসিরনগরের ঘটনাতো নয়ই, বরং কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁয়ের স্মৃতির ভিটায় যে হামলা ও ভাংচুর হয়েছিল সেটিও কোনো সাম্প্রদায়িক হামলা নয়; বরং পুরোপুরিই রাজনৈতিক হামলা। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের এলাকায় প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্বের জের ধরেও এসব ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। নাসিরনগরের ঘটনায় আওয়ামী লীগ, সরকার ও প্রশাসনের কেউ জড়িত থাকলে সরকার তাদের খুঁজে বের করে তাদের শাস্তির আওতায় আনবে বলে আমরা আশাবাদী। কারণ, এটি শুধু দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও ভাবমূর্তির প্রশ্নই নয়, এটি রাষ্ট্রদ্রোহের মতোই বিশাল এক অন্তর্ঘাত।
অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী প্রগতিশীলেরা নিশ্চয় বিবর্তনবাদের কথা জানেন এবং মানেন। বিবর্তনের তত্ত্বে একটা জায়গায় ‘মিসিং লিংক’ আছে। শিম্পাজি ও মানুষের মধ্যে ঠিক কোন প্রাণীটা ছিল যেটি থেকে আসলে মানুষের বিবর্তন শুরু হলো সেটি হলো বিবর্তনবাদের মিসিং লিংক। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একজন মন্ত্রীর স্বাভাবিকভাবেই মাৎস্যন্যায় কায়েমের জন্য যথেষ্ট পশুসম্পদ থাকে।
মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রীর যে তা আছে সে খবর আমরা বিভিন্ন পত্রপত্রিকা মারফত পাচ্ছি। কিন্তু বিপুল মৎস্য ও পশুসম্পদের অধিকারী মন্ত্রীর বাইরে আরও যারা সেখানে রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম করতে চান, যারা তার মতোই শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ (সে তার দলেরই হোন বা ভিন্ন কোনো দলের) তারা কি কিছুই করছেন না?
হামলার ঘটনার পর থেকেই স্থানীয় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়গুলো পত্রপত্রিকা ও সামাজিক মাধ্যমের সূত্রে সামনে চলে আসছে। তেমন কোনো ব্যাপার যদি নাই থাকে তবে এই হামলার পরপরই সেসব বিষয় সামনে চলে আসছে কেন? স্থানীয় প্রশাসনের প্রধান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেই বা এতটা মাথা গরম করতে দেখা যায় কেন! তার ভাবসাব ও কথাবার্তা শুনে ও দেখে তাকেই বা সবার দায়ী মনে হয় কেন?
এসব পরিস্থিতিতে তো তাদের মাথা বেশি ঠাণ্ডা থাকে। সব চাপ মাথায় নিয়েও তারা ঠাণ্ডা মাথায় গৎবাঁধা প্রশাসনিক কেতাবি বাক্য ঝাড়েন। নাসিরনগরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাথায় আসলে ঘটনার চাপের বাইরে আর কোন চাপ, যেটা সামাল দিতে গিয়ে তিনি অযোগ্য প্রশাসকের মতো কথা বলেন?
বিবর্তনবাদের তত্ত্ব মানা অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রগতিশীলেরা, বানর ও মানুষের মধ্যকার ‘মিসিং লিংকে’র মতো নিয়ানডার্থাল আর ক্রো-ম্যাগননের মধ্যকার ‘মিসিং লিংকে’র মতো নাসিরনগরের ঘটনায় ‘মিসিং লিংক’ রেখে শুধু শুধু প্রতিবাদ করে শক্তিক্ষয় এবং পরিস্থিতি আরো ঘোলা করবেন না।
প্রতিবাদ করলে চোখ-কান খোলা রেখে, মাথা খোলা রেখে, প্রতিবাদ করুন। বিপুল জনতা চোর চোর বলে হৈ-হল্লা করে চোরকেও জনতার মধ্যে মিশে গলা উঁচিয়ে উচ্চস্বরে চোর চোর বলে চিল্লানোর সুযোগ করে দেবেন না। তাহলে নাসিরনগরের ঘটনার মতো ঘটনা বারবারই ঘটতে থাকবে, সংখ্যালঘু লোকেরাও বারবার শিকার হতে থাকবে, আর আপনারা বেহুদাই বারবার প্রতিবাদ করতে থাকবেন।
আপনাদের প্রতিবাদে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনের কোন লাভ হবে না। তারা কেন হামলার শিকার হচ্ছে, আপনার হৈ-হল্লার কারণে, তারা নিজেরাও তা বুঝতে পারবে না। আর বুঝতে পারলেও আপনাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার ঝাণ্ডা এবং সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী স্লোগানের ভয়ে মুখ খুলতে পারবে না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








