সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকাটার কথা যখনই মনে হয়, খুব ছোটবেলাকার গরমকালের কিছু দুপুরের কথা মনে পড়ে আমার। মা আর পড়শি কিছু মহিলারা দুপুরের খাবারের পর আলস্যের গড়ানো বিকেলে এটি নিয়ে কথা বলতেন। ট্যাবলয়েড সাইজের সাদা-কালো পত্রিকাটির নানা ব্যক্তিগত ঘটনাবলীর উপর বেজায় আগ্রহ আমার। মাঝখানের এক-আধটা পৃষ্ঠা খসিয়ে নিয়ে বুঝি আর না বুঝি, গোগ্রাসে গিলতে চাইতাম সেগুলো। সবচেয়ে ভালো লাগতো সাদা-কালো কিছু ছবি। ছবিগুলো কেটে কেটে একটা খাতায় আঠা দিয়ে সেঁটে রেখেছি, মনে পরে। পরে সে খাতায় ধীরে ধীরে রঙিন ভিউকার্ড, চিত্রালির ছবি জায়গা করে নিয়েছিলো। কিন্তু বেগম পত্রিকার সাদা-কালো আমেজে মা-প্রতিবেশি খালাদের আঁচলের গন্ধ আর মৃদুকথার সুবাস ছড়িয়ে ছিলো।
বেগম পত্রিকার কদর সেসময়ে বুঝতে ব্যর্থ হলেও পরবর্তীতে যখন বিচিত্রা, রোববার, যায় যায় দিন, কলকাতার সানন্দা’র মতো পাক্ষিক, দ্বি-পাক্ষিক পত্রিকাগুলোয় মন মজেছিলো, তখন একটু একটু করে যেন অনুধাবন করতে লাগলাম কি বিরাট কর্মযজ্ঞ ঘটে একেকটি পত্রিকা বের করতে হলে। আরো পরে, সহ-সম্পাদক পদে চাকরির সুবাদে একটি দ্বি-পাক্ষিকে যোগ দিয়েই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি কাজ কাকে বলে। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, ততদিনে বেগম পত্রিকা আমার মনোযোগের সীমানা থেকে বহুদূরে, এমনকি খোঁজ নেবার প্রয়োজন বোধ করিনি পত্রিকাটি আদৌ আছে কি না তখনো। তারপর যখন প্রথম আলোর মতো দৈনিক পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টারের চাকরি নিতে হলো, ততদিনে হুড়মুড়িয়ে এক তুমুল জীবনে ঢুকে পড়া।
সেসময়ই একাধিকবার নূরজাহান বেগমের সাক্ষাত পেয়েছি। কাছে থেকে এই মহিয়সী নারীকে দেখে, কথা শুনে বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া ‘বেগম’ নতুন অর্থ নিয়ে হাজির হলো সামনে। কিছুতেই যেন এই বয়সী মানুষটির যৌবনের পরিশ্রমকে, আমাদের পশ্চাদপদ সমাজের ততোধিক পশ্চাদপদ নারীদের পাশে দাঁড়ানোর অবস্থায় মেলাতে পারছিলাম না। চেহারা-ভঙ্গীতে তুমুল আভিজাত্য আর দাপট তখনও বিদ্যমান। বক্তৃতায়-বুলিতে শক্ত অবস্থানটা টের পেতাম সহজেই!
সেটা না হলে তিনি কি পারতেন! না, পারতেন না। কারণ সাংবাদিকতার পুরুষালি জগতে মেয়েদের প্রবেশ অত সহজ ছিলো না। তসলিমার মতো মেয়েদেরই শুরুটা করতে হয়েছিলো চিঠিপত্র বিভাগের মাধ্যমে। আর সেখানে অত আগে নারীর প্রতিনিধিত্বকারী ‘বেগম’ নাম নিয়ে পত্রিকা বের করা কি মুখের কথা! বেগম রোকেয়ার পথ ধরে সমাজের নারীর জন্য বরাদ্দ কিছু আচরণকে মেনে নিয়েই কিছু অবরোধ ভাঙতে হয়েছিলো বেগম সুফিয়া কামাল আর নূরজাহান বেগমকে।
তিনি ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই থেকে কলকাতা থেকে বেগম পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন প্রথম বেগম সুফিয়া কামাল। সেখানে কিছুদিন কাজের পর ১৯৫০ সালের ৩ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে চতুর্থ সংখ্যা বের হয় নূরজাহান বেগমের সম্পাদনায়। নারীরা তাদের ভীরু কলম ধরেছিলেন বেগমের জন্যে। তার আগে নারীরা যে লিখতে পারে, সেই ধারণাই তো ছিলো না। সেই নারীরা রান্না-বান্না, নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, গল্প আর বেনামে চিঠিপত্র লেখা শুরু করে বেগম পত্রিকায়। না, পুরুষরা সম্ভবত তাদের জন্য পড়ার যোগ্য মনে করতো না বেগমকে। কিন্তু নারীমহলে বেশ সাড়া জাগাতে, বিশেষ করে ঢাকা শহরের নারীদের অন্দরে বেগমের নিত্য আসা-যাওয়া দিনে দিনে বাড়তে থাকে। আমাদের এক প্রতিবেশী খালার এক লেখা বেনামীতে ছাপা হওয়াতে পাড়ার সবার মধ্যে তার বেশ একটা সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিলো মনে পড়ে। নারীরা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক কথাবার্তা লিখতে শুরু করে ১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলনকে ঘিরে, রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের আবহকে ঘিরে। সাপ্তাহিক বেগমের ভূমিকা তাই শুধুমাত্র নারীর হাত ধরে লেখার জগতে টেনে আনাই নয়, বিপ্লবী ভূমিকায় নারীকে সামনে আনাও ছিলো বটে!

তাই বলে বেগম পত্রিকা কি তুমুল হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলো? না, তা নয়। বেগম কাজ করেছে নিভৃতে, কচ্ছপের গতিতে। খরগোশের তীব্র দৌঁড় হলে সমাজ তা ঝাঁকুনি খেয়ে টের পেতো, কচ্ছপের মৃদু পদক্ষেপে বেগম চলমান এক নারীসমাজকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে। আর শক্ত হালের বৈঠা ধরে রেখেছেন নূরজাহান বেগম। হাতে করে টাইপ বসিয়ে প্রেসে পত্রিকা ছাপানোর দু:সাধ্য কাজে যিনি নিজেকেসহ আরো কিছু নারীকে জড়িয়ে এগিয়ে চলেছিলেন, সেই চিত্র আজকের ডিজিটাল যুগে বসে চিন্তা করাও বাতুলতা!
তার অবদান তাই লোবানের সুরভির মতো; বাকেঁ বাকেঁ পাকে পাকে বাংলাদেশের নারীদের ঘিরে রেখেছিলো অন্তরে, বাইরে। নারীরা নিজেদের উপর আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছিলেন যে, তারাও কলম ধরতে পারেন, তারাও সাংবাদিক হবার যোগ্যতা রাখেন। তিনি মাঝপথে হাল ছেড়ে দেননি; ভাঙা হাল পুনরায় ধরতে সাহায্য করেছেন। আজকের সংবাদপত্র অফিসগুলোর চলচঞ্চল নারীদের, আজকের বাঘা বাঘা কলাম লেখক নারীদের, আজকের সমাজ-সচেতন বক্তৃতায় ফুলকি-ছোটানো নারীদের পূর্বসূরী বেগম নূরজাহান, আপনাকে অভিবাদন!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল
আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)










