সাদা মার্বেল পাথরের ওপর ফুলদানি, ফুলের ঝাড়, গোলাপ ফুল, এক বৃন্তে একটি ফুল, চাঁদ, তারা, নক্ষত্র ও আরবি ক্যালিগ্রাফিক লিপি; কী নেই্ মসজিদটির নকশায়? ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিশেলে ঝলমলে এক স্থাপনা। নির্মানের পর থেকে মির্জা গোলাম পীরের মসজিদ বা সিতারা মসজিদ হিসেবে পরিচিতি থাকলেও এখন তারা মসজিদ হিসেবেই পরিচিত। দেয়ালের সাদা জমিনে নীল রঙের তারার নকশা বেশি থাকার কারনেই স্থানীয়রা মসজিদটির এমন নাম দেন।
নান্দনিক নকশায় আর অনুপম স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত মসজিদটি দেশের পুরনো মসজিদগুলোর অন্যতম। কিন্তু চাকচিক্যে তা যেকোন পুরনো মসজিদ থেকে ঝলমলে নিজ চোখে দেখে যে কেউই রায় দিয়ে দেবেন। প্রাচীনকাল থেকেই স্থানীয়দের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় মসজিদ এখন এক পর্যটক আকর্ষণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে থাকা এ স্থাপনাটি দেখতে প্রতিদিন শত শত মানুষ আসেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে।
নির্মান ইতিহাস
পুরনো ঢাকার আরমানিটোলার আবুল খয়রাত রোডে অবস্থিত মসজিদটির নির্মানকাল এর খোদাই না থাকায় এর নির্মানকাল সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা যায়নি। তবে বাংলাপিডিয়াসহ বেশ কয়েকটি দলিল অনুসারে উনিশ শতকের গোড়ার দিকে এটি নির্মান করা হয়। তারা মসজিদটি ঢাকার জমিদার মির্জা গোলাম পীর((মির্জা আহমদ জান) নির্মাণ করেছিলেন বলে মসজিদটি মির্জা সাহেবের মসজিদ বলেও অভিহিত হয়ে থাকে। মির্জা গোলাম পীরের মৃত্যু হয় ১৮৬০ সালে; তাই এ মসজিদের নির্মাণকাল উনিশ শতকের প্রারম্ভে ছিল বলে প্রতীয়মান হয়ে থাকে।

অনুপম নকশা
ভেতরে ও বাইরে সম্পূর্ণরূপে মোজাইক নকশা করা। এ বিভিন্ন দেয়ালে চিনামাটির প্লেট, পেয়ালা ইত্যাদির ছোট ভগ্নাংশ ও কাঁচের টুকরা ব্যবহৃত হয়েছে। এ পদ্ধতিকে ‘চিনি টিকরী’ বা চিনি দানার কাজ বলা হয়। ফুলদানি, ফুলের ঝাড়, গোলাপ ফুল, এক বৃন্তে একটি ফুল, চাঁদ, তারা, নক্ষত্র ও আরবি ক্যালিগ্রাফিক লিপি মসজিদের নকশায় প্রাধান্য পেয়েছে। এ মসজিদের অলংকরণ জুল্লার অভ্যন্তরে ফুলদানি থেকে উত্থিত ফুলগাছ, খিলান শীর্ষে পেন্ডেন্টিভের উপর ও দেয়ালের গায়ে বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছে। বারান্দাঘর দেয়ালে জাপানের বিখ্যাত ‘ফুজিসান’-এর দৃশ্যসম্বলিত গ্লেস টাইল উল্লেখযোগ্য। ‘ফাসাদ’ এর কেন্দ্রে আরবি লিপি সম্বলিত সূক্ষ্ম অর্ধচন্দ্র ও তারার অলংকরণ স্থান পেয়েছে। বৃত্তাকার সাদা-শুভ্র গম্বুজগুলোতে বসানো হয়েছে নীল রঙের অসংখ্য তারা বা নক্ষত্র। সমগ্র নকশায় সর্বাধিক প্রাধান্য পেয়েছে তারার ‘মোটিফ’; তাই মসজিদটি তারা মসজিদ নামে খ্যাত।

দুই দফা সংস্কারে বর্তমান রূপ
আজ যেমন দেখতে মসজিদটি নির্মানের পর এমন ছিল না। দুই দফা সংস্কারের পর বর্তমান রূপ পায় নান্দনিক এ মসজিদটি। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার তৎকালীন স্থানীয় ব্যবসায়ী, আলী জান বেপারী মসজিদটির প্রখম সংস্কার করেন। এই সময় মসজিদটির আকার বৃদ্ধি করা হয়। এই সময় এর পূর্বদিকে একটি বারান্দা যুক্ত করা হয়। এই সময় মসজিদের মেঝে মোজাইক করা হয়। চিনিটিকরি (Chinitikri) কৌশলের এই মোজাইকে ব্যবহার করা হয় জাপানী রঙিন চীনা মাটির টুকরা এবং রঙিন কাঁচের টুকরা।
এরপর ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে এই মসজিদটির পুনরায় সংস্কার করা হয়। এই সময় পুরনো একটি মেহরাব ভেঙে দুটো গম্বুজ আর তিনটি নতুন মেহরাব বানানো হয়। সব মিলিয়ে বর্তমানে এর গম্বুজ সংখ্যা পাঁচটিতে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে মসজিদের জায়গা সম্প্রসারিত হয়।

দ্বিতীয়বার সংস্কারে তিন গম্বুজের তারা মসজিদকে পাঁচ গম্বুজের মসজিদে রূপান্তর করা হলে মসজিদটি দৈর্ঘ্যে বৃদ্ধি পায়। তবে প্রস্থে কোনোরূপ পরিবর্তন করা হয় নি। বর্তমানে সম্প্রসারিত মসজিদের দৈর্ঘ্য ২১.৩৪ মিটার এবং প্রস্থ ৭.৯৮ মিটার। পাঁচ গম্বুজের মসজিদে পরিবর্তন করার প্রয়োজনে একটি মিহরাব ভেঙ্গে ফেলা হয় এবং দুটি নতুন গম্বুজ ও তিনটি নতুন মিহরাব যুক্ত করা হয়। মসজিদের জুল্লায় প্রবেশের জন্য পাঁচটি খিলানবিশিষ্ট পথ সৃষ্ট করা হয়েছে। এ খিলানগুলি বহু খাঁজবিশিষ্ট এবং চারটি অষ্টভুজাকৃতির স্তম্ভ হতে উত্থিত।
টাকা ও খাদি কাপড়েরর নকশায় তারা মসজিদ
নান্দনিকতার কারণে মসজিদটি স্থান পায় টাকার বিভিন্ন নোটে। সর্বপ্রথম ১৯৭৬ সালে সরকার এই স্থাপনাটি কেন্দ্র করে ৫ থেকে ৫০০ টাকা সিরিজের ব্যাংক নোট মুদ্রণ করে। এখনও নান্দনিক এ স্থাপনায় তৈরি মসজিদটির চিত্র দেখা যায় ১০০ টাকা মূল্যমানের নোটে।
এছাড়া ২০১৬ সালের ১০ ডিসেম্বর এই মসজিদের ডিজাইনকে খাদি কাপড়ে ফুটিয়ে তুলে রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু হোটেলে ফ্যাশন ডিজাইন কাউন্সিল অব বাংলাদেশ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় খাদি ফ্যাশন শো।
বর্তমান অবস্থা
সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে থাকা মসজিদটি বর্তমানে পরিচালতি হচ্ছে স্থানীয়দের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে। পদাধিকারবলে এই কমিটির সভাপতি ও তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক। মসজিদের উন্নয়ন ও বিভিন্ন খরচ বাবদ প্রতিবছর বাংলাদেশ সরকার তিন লাখ টাকা দিয়ে থাকে। মসজিদটির পাশেই রয়েছে মাদ্রাসা যার দেখাশোনাও মসজিদ কর্তৃপক্ষই করে থাকে।
মসজিদের মোয়াজ্জিন এবং সহকারী ইমাম আলহাজ মাওলানা তোফাজ্জল হোসেন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: নামাজ পরিচালনার জন্য ৬ এবং মক্তব পরিচালনার জন্য ৫ জন কর্মরত আছেন। নামাজ পরিচালনার জন্য রয়েছেন একজন প্রধান ইমাম এবং পেশ ইমাম বা খতিব, একজন মোয়াজ্জিন এবং তিনজন খাদেম। এছাড়া সকাল বিকেল দুই শিফটে মসজিদ ভিত্তিক মক্তব পরিচালনার জন্য রয়েছেন পাঁচ জন শিক্ষক। এই মক্তব্যে বিনা বেতনে শিক্ষার্থীদের নামাজসহ ইসলামের মূল বিষয়গুলো শেখানো হয় বলে জানান মুয়াজ্জিন।

১৯৮৭ সাল থেকে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করে আসা তোফাজ্জল জানালেন একটি ক্ষোভের কথাও। জাতীয়করণ করা এ মসজিদটির সকল কর্মচারীকে সরকারই বেতন দেয়। কিন্তু সরকারের অন্যান্য সেক্টরের কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হলেও এই মসজিদে কর্মরতদের বেতন স্কেল বাড়ানো হয়। তাই এই মসজিদে কর্মরতদের জন্য সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।








