দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর অবস্থায় থাকা ননএমপিও ভুক্ত শিক্ষকরা এখন রাজপথে। গত ২৬ ডিসেম্বর থেকে রাজধানীর প্রেসক্লাবের সামনে নিজেদের দাবিদাওয়ার বিষয়ে আন্দোলন করছেন সরকারি সুবিধা বঞ্চিত এই শিক্ষকরা। বছরের পর বছর ধরে তারা মহান শিক্ষা পেশার সাথে যুক্ত থাকলেও নীতিনির্ধারকদের অমনোযোগের কারণে তারা ভাগ্যবঞ্চিতই হয়ে আছেন। আজ পর্যন্ত তাদের কপালে সরকারি সুবিধা জোটেনি। অর্থাৎ সরকারি বেতন-ভাতার কিছুই তারা পান না। ফলে শুধু আশায় পথ চেয়ে চেয়ে তারা কাজ করে গেছেন। বেতন-ভাতা না পাওয়ায় শিক্ষকদের কষ্টের অন্ত নেই। বেশিরভাগ শিক্ষককেই অভাব অনটনের মধ্যে দিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। অনেকেই তাই শিক্ষকতার পাশাপাশি চাষবাস, ক্ষুদ্র ব্যবসা করে কোনোরকমে সংসার চালান বলে জানিয়েছেন। নিজেদের দাবি পূরণ করে শিক্ষকরা হাসিমুখে শ্রেণীকক্ষে ফিরে যেতে চান। জীবনের অসহনীয় সময়কে তারা জয় করতে চান।
বেসরকারি যে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-র্কমচারীরা সরকারের দেওয়া বেতন পান সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত বলা হয়। এই পদ্ধতিতে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের মূল বেতনের ১০০ ভাগ সরকার প্রদান করে। সুনির্দিষ্ট কোনো আশ্বাস না পাওয়ায় ৩১ ডিসেম্বর থেকে নন এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা আমরণ অনশন শুরু করেন। শীত, ধুলোবালি সব উপেক্ষা করে প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তায় তারা এখনও দলবদ্ধভাবে শুয়ে আছেন। আমরণ অনশনে থাকা প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষক ইতিমধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। গণমাধ্যমের কাছে অনেক শিক্ষকই কষ্টের কথা বলতে গিয়ে চোখের পানি ফেলেছেন। কিন্তু শিক্ষকদের সেই আর্তনাদ এখন পর্যন্ত নীতিনির্ধারকদের মন গলাতে পারেননি। সুনির্দিষ্ট আশ্বাস তারা পাননি।
সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১১টায় প্রেসক্লাবের সামনে আন্দোলনরত ননএমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অনশন ভাঙাতে গিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। মাইক্রোফোন হাতে তিনি এমপিওভুক্তি সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যত করণীয় সম্পর্কে বক্তব্য দেন। কিন্তু সেই বক্তব্যে সন্তুষ্ট হতে পারেননি আন্দোলনরত শিক্ষকরা। ফলে মন্ত্রীর যে বক্তব্য প্রদান করেন সেটা আন্দোলনরত শিক্ষকরা প্রত্যাখান করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। মন্ত্রীর সামনেই শিক্ষকরা ‘মন্ত্রীর আশ্বাস মানি না’ বলে শ্লোগান দেন। আন্দোলনরত শিক্ষকরা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় যা বলেছেন তাতে কোনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য বা দিকনির্দেশনা নেই। এমনতরো প্রেক্ষিতে আন্দোলন থেকে তারা সরবেন না যতক্ষণ না মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত ও ঘোষণা আসবে।
তবে দৈনিক সমকাল আজ ‘এমপিওর বন্ধ দুয়ার খুলছে’ শিরোনামের একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। রিপোর্টে বলেছে সাতবছর সাতমাস পর এমপিওভুক্তির বন্ধ দুয়ার খুলতে যাচ্ছে। দৈনিক সমকাল বলেছে মাউশির নতুন করা প্রস্তাবে সারাদেশের এমপিওবিহীন ৭ হাজার ১৪২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করতে বার্ষিক ২ হাজার ১৮৪ কোটি ২৭ লাখ ৫২ হাজার ২৫০ টাকা লাগবে বলে মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে ১২২৭টি নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য ২১৯ কোটি ৭১ হাজার ৩০০ টাকা; ১ হাজার ৮৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য ৩৬৮ কোটি ১৫ লাখ ২৭ হাজার ৮৫০ টাকা; এমপিওভুক্ত ৩ হাজার ২৭৫টি নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে মাধ্যমিকে উন্নীত করে এমপিওভুক্ত করতে ৫২২ কোটি ৬০ লাখ ৮১ হাজার ২৫০ টাকা; ৫১৮টি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের জন্য ৩৫৭ কোটি ১২ লাখ ৪৭ হাজার ৪০০ টাকা এবং এমপিওভুক্ত ১ হাজার ৩৩টি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজকে ডিগ্রি স্তরে উন্নীত করে এমপিওভুক্ত করতে ৭১৭ কোটি ৩৮ লাখ ২৩ হাজার ৪৫০ টাকা লাগবে।
প্রকাশিত ওই রিপোর্ট মতে, এই মুহূর্তে সারাদেশে এমপিওভুক্তির সব শর্ত পূরণ করে অপেক্ষমাণ ৫ হাজার ২৪২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এগুলোতে এমপিওভুক্তির যোগ্য শিক্ষক-কর্মচারী আছেন প্রায় ৭৫ হাজার। তাদের সবাইকে এক অর্থবছরের বাজেটে এমপিওভুক্ত করা কঠিন। এ জন্য পর্যায়ক্রমে যোগ্য সবাইকে এমপিওভুক্ত করা হবে। এই মুহূর্তে থোক বরাদ্দ পেলে দুই থেকে আড়াই হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হতে পারে। ছয় মাস পর ২০১৮-২০১৯ সালের বাজেটে আরও আড়াই হাজার নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো এই মুহূর্তে কেন এটি বলা হচ্ছে। বিষয়টি দেখে মনে হচ্ছে শিক্ষকরা আন্দোলনে না নামলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এমপিওভুক্তির কোনো উদ্যোগই বোধ হয় নেওয়া হতো না। আজকে শিক্ষকরা যে আন্দোলন করছে এবং অমরণ অনশনে নেমেছেন এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাপনার চরম ত্রুটির কারণেই হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাস এবং কথাগুলোকেও এলোমেলো এবং অপরিকল্পিত মনে হয়েছে। সাতবছর আগে সর্বশেষ নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি হয় ২০০৯ সালে। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেন পর্যায়ক্রমে এমপিওভুক্তির কাজ এগিয়ে নেয়নি? মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিল সেই সময় থেকে অপেক্ষমান এবং নতুন আবেদনকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাকাল, শিক্ষার্থী, সামর্থ এবং মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রদত্ত শর্ত বিবেচনায় নিয়ে গ্রেডিং করে সুনির্দিষ্ট তালিকা করা। যে তালিকার ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় ধারাবাহিকভাবে বা পর্যায়ক্রমে এমপিওভুক্তির কাজগুলো এগিয়ে নিতে পারতো। এতে করে মন্ত্রণালয়ের উপর চাপ কমতো। মন্ত্রণালয়ের কাজের মধ্যেও জবাবদিহিতা থাকতো। ফলে শিক্ষকদেরও বছরের পর বছর বা যুগ যুগ ধরে মানবেতর জীবনযাপন করতে হতো না। কিন্তু মন্ত্রণালয় সে পথে হাঁটেনি। এখন শিক্ষকরা যখন আন্দোলনে নেমেছেন তখন তহবিলের অজুহাত দেখানো হচ্ছে। আবার শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষকদের আমরণ অনশনে গিয়ে যেভাবে প্রত্যাখাত হয়ে এলেন সেই আঘাত তার হৃদয়ে কোনো রেখাপাত করেছে বলে মনে হয়নি।
শিক্ষা মন্ত্রী অনেক কিছুই দক্ষতার সাথে সামাল দিতে পারছেন না। অনেক প্রতিশ্রুতি তিনি রক্ষা করতে পারছেন না। ফলে ক্রমশই তার ইমেজ বিবর্ণ থেকে বিবর্ণতরো হয়ে পড়ছে। আমি একটি বিষয় বুঝিনা যে, শিক্ষামন্ত্রী কী করে ভাবলেন যে, তহবিল নেই বলে বলে ননএমপিও ভুক্ত শিক্ষকদের তিনি যুগের পর যুগ অভুক্ত রাখবেন। শিক্ষকরা আন্দোলন না করলে, অনশন না করলে তিনি নড়াচড়া করবেন না। কথা বলবেন না। শিক্ষামন্ত্রীরতো আর অজানা থাকার কথা নয় যে শিক্ষকদেরও ঘর সংসার, স্ত্রী-সন্তান, বাবা-মা আছে। আজকে দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে বলে আমরা গর্ব করি সেখানেতো শিক্ষামন্ত্রীরই উচিত ছিল অনেক আগেই এমপিওভুক্তির নতুন ঘোষণা দিয়ে কাজগুলো এগিয়ে নেওয়া। তহবিলের যে সংকটের কথা বলেন, সেব্যাপারে তিনি কী অনেক আগেই অর্থমন্ত্রীর সাথে কথা বলতে পারতেন না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলতে পারতেন। এমনটি করা হলে এর আগে যে শিক্ষকদেরকে মারধর করা হয়েছিল মরিচের গুড়া ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেই কালিমা সরকার মোচন করতে পারতো।
এখন শিক্ষকদের আন্দোলনের মুখে সবাই নড়েচড়ে বসেছেন। ফাইল চালাচালিও শুরু হয়েছে। মাউশি তৎপর হয়েছে। তবুও মন্দের ভালো। সরকারের নীতি নির্ধারকদের উচিত দ্রুতই শিক্ষকদের ন্যায়সঙ্গত দাবি মেনে নিয়ে তাদেরকে বাড়ি ফেরানোর ব্যবস্থা করা। আর শিক্ষামন্ত্রীকে বিনয়ের সাথে বলবো শিক্ষা খাতের কিছু অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে যে অঢেল টাকা খরচ করার উদ্যোগ নিচ্ছেন সেগুলো বন্ধ করুন। দেশে সবার বেতন বেড়েছে-আর শিক্ষা পেশার মানুষগুলো অভুক্ত হয়ে থাকবে এটি হতে পারে না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







