২০১১ সালে চীনের সাহায্যে মিয়ানমারের কাচিন রাজ্যে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ইরাওয়াদ্দি নদীতে বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিয়ে স্থানীয়দের ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে প্রকল্পটি বন্ধ করে দিতে হয়েছিলো মিয়ানমারকে। সম্প্রতি সেই প্রকল্পটি আবারও শুরু করার জন্য নতুন করে তোড়জোড় শুরু করেছে চীনা কোম্পানিগুলো।
বিবিসি নিউজ বার্মিজের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশ, ওই বাঁধের মাধ্যমে স্থানীয় লোকেরা কখনো সুবিধা দেখতে পাবে কিনা, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নয় স্থানীয় জনগণ। সেজন্য ওই বাঁধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ নতুন মাত্রাযুক্ত করেছে।
জার লাই নামের একজন স্থানীয় বাসিন্দা বিবিসিকে বলেন,‘প্রতিবার আমি যখন বাঁধের কথা বলি, তখনই কাঁদতে থাকি।’
জার লাই আট বছর আগে ওই বাঁধের কারণে তার ৪০ একর খামার জমি ছেড়ে প্রায় ছয় মাইল (নয় কিলোমিটার) দূরে অং মিয়ান থাই গ্রামে পুনর্বাসনে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেখান থেকে তাকে পুনর্বাসন করে চীনা কোম্পানি। তার জমি ইরাওয়াদ্দি নদীর উৎসে ৩.৬ বিলিয়ন চীনা অর্থায়নে মাইসটোনে বাঁধ প্রকল্পের কারণে জলাশয়ে প্লাবিত হয়েছিলো।
জার লাইসহ অনেক ভূক্তভোগীদের নিয়ে গড়ে ওঠা নতুন গ্রামে এখন রয়েছে বেইজিংয়ের স্টেট পাওয়ার ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন (এসপিক) কর্তৃক তৈরি করা একটি নতুন বাজার, একটি হাসপাতাল, নামফলক অঙ্কিত সড়ক এবং একটি স্কুল। কিন্তু জার লাই বলছেন, কৃষি জমিহীন তার জীবন সেখানে অত্যন্ত দুর্বিষহ।

তিনি বলেছেন, ‘আগে আমরা যা উৎপাদন করতাম তা খেতে পারতাম। কিছু কেনার প্রয়োজন হতো না। কিন্তু এখানে আমার চাষবাসের জমি নেই, জমি ছাড়া কীভাবে কী করবো? অন্য কোনোভাবে অর্থ উপার্জন করতে আমি জানি না। এখানে আসার পরে আমি খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছি’।
বাঁধটি এই বছর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সবেমাত্র নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। ওই বাঁধ নির্মাণ নিয়ে চীন ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রায়সময় ক্ষমতার ভারসাম্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বিরাজ করেছে দীর্ঘ আটটি বছর।
এই অঞ্চলে বেইজিং ভিত্তিক কোম্পানি এসপিকে যে সাতটি বাঁধ নির্মাণ করতে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মিয়ানমার দিয়েছে তার মধ্যে মাইসটোন বৃহত্তম বাঁধ। যা দ্রুত বিকাশমান মিয়ানমারে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি। এমনকি তারা ধারণা করছে যে, প্রকল্পটি থেকে এখন পুরো দেশটির উৎপাদনের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
যদিও এসপিকের সঙ্গে স্বাক্ষরিত প্রকল্প চুক্তিটি সাবেক সামরিক সরকার প্রকাশ্যে আনেনি। তবে মে মাসে বিবিসি বার্মিজের এক সাক্ষাতকারের মাধ্যমে একটি স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশ্যে আসে। মিয়ানমারের রাজ্য বিদ্যুৎ সংস্থার সাবেক উপমন্ত্রী ইউ মাউ খার এইচটিও চুক্তির সবচেয়ে উস্কানিমূলক অংশটি নিশ্চিত করেন যে, ‘এই বাঁধ থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের ৯০ ভাগ চলে যাবে চীন সীমানা অঞ্চলে।’
ইউ মাউ খার এইচটিওয়ের মতে, ‘বাঁধে সরকার ১০ ভাগ পাবে। তবে কাজ শুরু হওয়ার দুই দশক পরে তার বিনিয়োগের কিছু অংশ দেখতে পাবে’।
নদীর প্রবাহ ধ্বংস করবে এই বাঁধ?
বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়ার শুরু থেকে প্রশ্ন উঠেছে যে, বাঁধটি আসলে কার স্বার্থে কাজ করবে? ইরাওয়াদ্দি নদীকে মিয়ানমারের প্রাণশক্তি হিসেবে ধরা হয়। মাইসটোন অঞ্চলটি কাচিন জনগোষ্ঠীর জন্মস্থান হিসেবে বিশ্বাস করা হয়, যার নাম অনুসারে এই রাজ্যটির নামকরণ করা হয়েছে। ১৯৬২ সাল থেকে জাতিগত কাচিন বিদ্রোহীরা সম্পদ, সমৃদ্ধ অঞ্চলে আরো বেশি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য বার্মিজ সামরিক বাহিনীর সাথে লড়াই করছে। এটি বিশ্বের দীর্ঘতম চলমান গৃহযুদ্ধগুলির মধ্যে একটি।
কাচিনের স্বাধীনতাকামী নেতৃবৃন্দ এখানকার বাঁধটিকে তাদের জনগণ ও জীবন-জীবিকার জন্য প্রত্যক্ষ হুমকি হিসেবে দেখছিলেন। এই বাঁধের কারণে হাজার হাজার লোক বাস্তচ্যুত হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়ে পরিবেশবিদরা বলেছিলেন যে, এই অঞ্চলে সিঙ্গাপুরের সমান এলাকা প্লাবিত হতে পারে।

পরিবেশবিদ ডা. মাইন্ট জাও বলেছিলেন, ‘ইরাওয়াদ্দি নদীর বাঁধের জন্য এই সংকটপূর্ণ জলসন্ধিক্ষণ এবং আমাদের শেষ কয়েকটি অবশিষ্ট ঘন-বনাঞ্চল সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যপূর্ণ এলাকা হারিয়ে ফেলতে যাচ্ছি আমরা’।
তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘বাঁধটি সম্ভবত নদীটিকে হত্যা করবে। নদীর বিশাল জোয়ার পরিবর্তন করবে। লাখ লাখ জেলের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং নদীর বিশাল প্রবাহে মারাত্মক প্রভাব পড়বে।
২০১১ সালে বাঁধের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিলো। মিয়ানমারের বাইরেও পরিবেশ ও মানবাধিকার উভয় গ্রুপের কর্মীরা ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে প্রভাব ফেলেছিলো। জনগণের বিক্ষোভের মুখে সে সময় মিয়ানমার কেন্দ্রীয় সরকার এই প্রকল্পটি স্থগিত করেছিলো। তারপর থেকে আর কোনো বড় কাজ হয়নি প্রকল্পটির।
এই প্রকল্পের ভবিষ্যত নিয়ে ২০১৬ সালে একটি সরকারি কমিশন গঠিত হয়েছিলো। এই বিষয়ে তদন্ত শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন গত বছরের নভেম্বর মাসে রাষ্ট্রপতির কাযালয়ে জমা দেয়া হয়। কিন্তু সরকার সেই প্রতিবেদন কখনো প্রকাশ করেনি।
অবশেষে স্থগিত থাকার আট বছর পরে বাঁধ নির্মাণের পক্ষে চীন স্থানীয় বাসিন্দা এবং কর্মকর্তাদের সমর্থন আদায়ের জন্য বিভিন্ন বিষয়ে বুঝানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মিয়ানমারে চীনের সাবেক রাষ্ট্রদূত হংক লিয়াং গত বছরের ডিসেম্বরে এই অঞ্চলটি পরিদর্শন করেন এবং তিনি পরবর্তীতে দাবি করেন যে, কাচিন জনগণ বাঁধটির বিরোধিতা করেনি।
এক বিবৃতিতে তিনি বাঁধের বিরোধিতার জন্য বহিরাগত আন্দোলনকে দায়ী করেছেন। যেসব কাচিন নেতা প্রথম দিকে এই বাঁধকে অগ্রাহ্য করেছিলেন তাদের কয়েকজনের সঙ্গে তিনি সাক্ষাত করেছেন বলে তিনি দাবি করেছেন।
তারপর চলতি বছরের জুন মাসে একদল চীনা বিশেষজ্ঞ কাচিন সংসদে আইনজীবীদের বাঁধের পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে ইতিবাচক আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করেন।
বিবিসি নিউজ বার্মিজকে দেওয়া লিখিত বিবৃতিতে এসপিকে বলেছে যে, এই বাঁধের উদ্দেশ্য মিয়ানমারের উন্নয়নের জন্য পরিচ্ছন্ন, দক্ষ ও টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহ।
এই প্রকল্পটি হিমশীতল হবে বলে ইঙ্গিত করে সংস্থাটি বলেছে যে, এই বিষয়ে একটি সুন্দর ও উদ্দেশ্যমূলক সিদ্ধান্ত আসবে বলে বিশ্বাস করি।
‘মাইটসোন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি মিয়ানমার ও চীন সরকার কঠোরভাবে পরীক্ষা করেছে এবং অনুমোদন করেছে’ বলা হয় বিবৃতিতে। ‘আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি রাখবো’।
অংসান সুচির মত পরিবর্তন
বিরোধী দলে থাকার সময় অংসান সুচি বাঁধের বিরুদ্ধে কথা বলেছিনে। কিন্তু ২০১৫ সালের নির্বাচনের পরে মিয়ানমারের ডি ফ্যাক্টো নেতা হওয়ার পর থেকে এই বিষয়ে তিনি তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলেছেন।। তিনি বলেছেন, সাবেক সামরিক সরকারের অধীনে যে চুক্তি হয়েছিলো তা সম্মানিত হওয়া উচিত।
এই বছরের শুরুর দিকে একটি পাবলিক ফোরামে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বাঁধ সম্পর্কে তিনি বিরল মন্তব্য করেছিলেন এই বলে যে, ‘আমাদের দেশের মযাদা রক্ষার জন্য, দেশের প্রতি বিশ্বের আস্থা রাখতে আমাদেরকে আমাদের প্রতিশ্রুতি রাখতে হবে’।
কাচিন রাজ্যে বিক্ষোভের নতুনমাত্রা
বিতর্কিত মেগা প্রকল্পটি আবার শুরুর বিরুদ্ধে কাচিন রাজ্যে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। এই বাঁধ পুনরুদ্ধার হওয়ার আশঙ্কায় বিক্ষোভের নতুন মাত্রাযুক্ত হয়েছে সেখানে।
এপ্রিলের শেষের দিকে অংসান সুচি বেইজিংয়ে চীনা বিদেশি বিনিয়োগের শীর্ষ সম্মেলন যাওয়ার সময় হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ জনতা বাঁধটির বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে।

বিশ্লেষকরা বলছেন যে, এই বিষয়টি নিয়ে অংসান সুচি দ্বিধাদ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়েছেন। বার্মিজ জনগণকে গণতন্ত্রের সুফল সম্পর্কে অবগত করতে হলে তাকে সমৃদ্ধি ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ তারই অংশ হবে। তাকে এটাও স্পষ্ট করতে হবে যে, ‘তিনি দেশ বিক্রি করছেন না’।
চীনকে প্রয়োজন মিয়ানমারের
তবে মিয়ানমারের প্রযোজন চীনকে। একটি প্রধান বিনিয়োগকারী এবং ব্যবসায়ী অংশীদার হিসাবে চীন সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে মিয়ানমারে।
এই দিকটির কথা বিবেচনা করে বিশ্লেষকরা বলছেন, বাঁধটির পক্ষে ব্যাপক বিরোধিতা রয়েছে জানা আছে। তবে মিয়ানমারে চীনের ভূমিকা এতো বেশি তাৎপযপূর্ণ , যার ফলে দেশটিকে এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। কেননা, চীন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে মিয়ানমারের মুক্তিদাতা হিসেবে পরিচিত এবং তারা দেশের বৃহত্তম বিনিয়োগকারী রাষ্ট্র। তাদের বিনিয়োগ ব্যতিত মিয়ানমার সামনের দিকে যেতে পারবে কিনা তা প্রশ্নবিদ্ধ। যদি মিয়ানমার সরকার এই প্রকল্পটি পুরোপুরি বাতিল করে দেয় তবে দেশটিকে ৮০০ মিলিয়ন চীনা মুদ্রা সমমানের জরিমানা দিতে হতে পারে।
কাচিনদের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ?
তবে কাচিনের স্থানীয়দের কাছে এই নদী তীরবর্তী এলাকা এই সম্পর্কের চেয়ে বেশি কিছু। এটি তাদের কাছে যেমন পর্যটনের আধার, তেমনি কৃষি কাজের মূল যোগান। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এখানে স্নান করতে এবং মনোরম অঞ্চলের ছবি তুলতে আসেন।
তারা বলছেন, এই সুন্দর জায়গাটি, নদী, বন ও পর্বতগুলি দেখুন। সাদা মেঘের চারদিকে কী অদ্ভূত সুন্দর। এখানে প্রাণ জুড়িয়ে যায়।
জার লাই ওই নদীর দিকে ইশারা করে কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ওই এলাকায় আমার বসবাস ছিলো। রয়েছে অনেক স্মৃতি, যা আমি ভুলতে পারি না। আমি ফিরে এসে এই অঞ্চলটি আর দেখতে পাবো না, ভাবতেই মনটা অনেক অস্থির হচ্ছে’।










