যে কৃষক দাম পাবেন না তাই মন খারাপ করে ধানক্ষেতে আগুন জ্বেলে দেন, যে বাবা ভালো ফলাফল করেনি বলে সন্তানকে বাড়ি থেকে বেশ করে দেন, যে মা প্রেমিকের মন পেতে নিজের সন্তানকে হত্যা করেন, যে মাদকাসক্ত সন্তান টাকার জন্য মা কিংবা বাবাকে হত্যা করেন, এদের সবার বিক্ষোভ বা বিদ্রোহ কি এক হতে পারে? আপনারা কে কী মনে করেন জানি না, আমার মনে হয় উগ্র চেতনা যদি মাপা হয়, এদের প্রত্যেকেই এক।
এখন কৃষি অনেক লাভজনক। চারটি ফসল অনায়াসে ফলাতে পারেন কৃষক। বাণিজ্যিক কৃষি পাল্টে দিয়েছে কৃষির সংজ্ঞা। কৃষক এক ফসলে মার খেলে অন্য ফসলে পুষিয়ে নিতে পারেন। সারাদেশেই সবচেয়ে সাফল্যের সঙ্গে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন কৃষক। যারা মানুষকে শান্ত থাকার জন্য, ধৈর্য্য ধারণের জন্য সবসময় দৃষ্টান্তে স্থাপন করে যাচ্ছেন সেই কৃষক তার সন্তানতুল্য ফসলী ক্ষেতে আগুন জ্বেলে দিলেন! হলো কিছু?
ক্ষেতের আগুনের ছবি তুলে ভাইরাল করা হলো। অবশেষে আমরা সাংবাদিকরা আহা উহু করে সংবাদ পরিবেশনের মহান ব্রত ধারণ করতে গেলাম। এতে যেটি হলো, সেটি হচ্ছে বিশ্বময় আমাদের দেশ প্রশ্নে আরো নতুন এক নেতিবাক্য পাওয়া গেল। কৃষক ধানের মূল্য না পেয়ে ক্ষেতে আগুন ধরিয়ে দেন। এর আগে দুগ্ধ খমাারি রাস্তায় দুধ ঢেলে একইরকম প্রতিবাদ করেছিলেন, সবজি চাষি বাজারে কয়েক টন সবজি ঢেলে এমন প্রতিবাদ করেছেন।
আমাদের দেশে সবসময় একটি ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। ঘটনাটি যতই নতুন, অচেনা ও বিস্ময়কর হোক, দুর্ঘটনা হোক আর সুঘটনা হোক, মানুষ ঘটনার অনুকরণ করতে পছন্দ করে পরিণাম দেখার জন্য। অনেক রকম ফসল তোলার জন্য। আবার বিষয়গুলো উসকে দেয়া হয়। এতে মানুষ বেশি দু্ঃসাহসী হয়ে ওঠেন। এমনও ঘটনা আছে, ব্যাংক ঋণ থেকে রেহাই পেতে কৃষক নিজে তার গরুর খামারে আগুন জ্বেলে হালের গরু, দুধের গাভী পুড়িয়ে মেরেছেন। এসব ধ্বংসযজ্ঞ। ধ্বংসকে আশকারা দিয়ে, তার পক্ষে দাঁড়িয়ে আর যাই হোক, ভালো কোনো ফল আনা সম্ভব নয়।
কৃষক ভাই, ধানের দাম কম। বাড়ানোর জন্য আন্দোলন করুন, বিক্ষোভ করুন। কিন্তু ক্ষেতের ফসলে আগুন জ্বালবেন না। বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবন চলে শুভ লক্ষণের বাস্তবতাকে সঙ্গে নিয়ে। খনার বচন মুখে নিয়ে। প্রকৃতির পানে চেয়ে। আপনি চাইলেই সবকিছু আপনার মতো করতে পারবেন না, যতই বিজ্ঞানের যুগ হোক। এর জন্য শুভ লক্ষণ আর সৃষ্টিকর্তার অমোঘ নিয়মের কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্রের কাছে সরকারের কাছে দাবি আর প্রতিবাদের ভাষাগুলো যুগে যুগে মানুষ পৌছে দিচ্ছে সক্রিয় শক্তিমত্তায়। চোরের ওপর রাগ করে মাটিতে ভাত ঢেলে খাওয়া কোনো ভালো কাজ নয়, এতে অন্যরা সুযোগ নেয়।
মনে পড়ে কবি ইমরান মাঝির কবিতা ‘বিজ্ঞানী কলিন্স পড়ে চাঁদে যাওয়ার দোয়া/ আমি ইমরান মাঝি ছৈ এর মধ্যে শোয়া’। ফেসবুকের খবর এখন সাংবাদিককে মাতায়। দেখলাম, ধানের বাজার দর নেই বোঝাতে সাংবাদিক ভাইয়েরা নানা হিসাব তুলে ধরছেন। এর অনেকটাই বাস্তবতাবর্জিত। কৃষকের ফসলী হিসাব মাঠের চিত্র ও গ্রামীণ জীবন বাস্তবতার সঙ্গে ওইসব হিসাবের মিল ও সম্পর্ক থাকে না। বরাবরই কৃষি ও কৃষি সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে এদেশে ভুল সাংবাদিকতা হচ্ছে। বিভ্রান্তিকর তথ্যও ছড়ানো হচ্ছে। মাঠের কাজ টেবিলে বসে হয় না, একথা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কৃষি সাংবাদিক শাইখ সিরাজ বারবার বলে আসছেন। 
বিজ্ঞান বলে, এক কেজি ধান উৎপাদনে সাড়ে তিন হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়। এই তথ্য শুনে মনেই হতে পারে ধান মাটিতে হয় না, হয় জলাশয়ে। এক কেজি গরুর মাংস উৎপাদনেও ২৫’শ থেকে ৩ হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়। তার মানে এই নয় যে গরু এক ধরনের মাছ। আশংকা আছে, ভুল ব্যাখ্যা আর উড়ে ভাষার সাংবাদিকতা আমাদেরকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে।
সিটিজেন জার্নালিজম ভালো জিনিস। কিন্তু জনতথ্যের ওজন সম্পর্কে সিটিজনের মধ্যে ধারণা তৈরির কাজটি সরকারকেই করতে হবে। যে ঘটনার সঙ্গে দেশ এ জনগণের বিশাল স্বার্থ সম্পর্কিত, সে বিষয়টি উষ্টুম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাতে নিতে হবে সরকারকে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








