ধর্ষণ আজ এক মহামারীর নাম বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে। ৬ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৬০ বছরের বৃদ্ধাও রেহাই পাচ্ছেন না ধর্ষণের হাত থেকে। নিজের জন্মদাতা পিতা, সৎ পিতা, শিক্ষক, নিকটাত্মীয় কারো হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না ভিকটিমরা। কর্মক্ষেত্রে, চলন্ত বাসে, এমনকি নিজের ঘরে পর্যন্ত নেই নিরাপত্তা। এ যেন এক অন্তবিহীন ঘূর্ণিঝড়ের করাল থাবা। অতৃপ্ত যৌন আকাঙ্খা, দেয়ালে নগ্ন পোস্টার, যৌন উত্তেজক অবৈধ বইয়ের রমরমা ব্যবসা, অশ্লীল পত্রপত্রিকা, অশ্লীল ছায়াছবি প্রদর্শন, ব্লু-ফিল্ম, পর্নোগ্রাফি, চলচ্চিত্রে নারীকে ধর্ষণের দৃশ্যের মাধ্যমে সমাজে রাস্তাঘাটে বাস্তবে ধর্ষণ করার উৎসাহ যোগান, নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার, ইন্টারনেটে অশ্লীল সাইটগুলো উম্মুক্ত করে দেয়া, প্রেমে ব্যর্থতা, ১৮ প্লাস চ্যানেলে নীল ছবি প্রদর্শন, যৌন উত্তেজক মাদক ইয়াবার বহুল প্রসার ইত্যাদি কারণে দিন দিন ধর্ষণ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কিছুদিন আগে গাজীপুরে হযরত আলী নামের এক বাবা তার ৮ বছরের কন্যাশিশু আয়েশার ধর্ষণের বিচার না পেয়ে সন্তানসহ ট্রেনের নিচে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন। এই আত্মহত্যার পরেই আলোড়ন হলো খোদ রাজধানী শহরে ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠে প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানের বিরুদ্ধে। গত বছর ৩০ মার্চ কুমিল্লার সোহাগী জাহান তনুর লাশ উদ্ধার হয়। প্রতিবাদের ঝড় উঠে। অভিযোগ উঠে যে ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়েছে। লাশ উদ্ধার হয়েছে, কিন্তু তনু হত্যা রহস্য আজ পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড উপপরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ১৪ বছরে নারীর ওপর সব মিলিয়ে ২৪ ধরণের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে ৫৫ হাজার ৯৯৫টি। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা সাত হাজার ২৩২টি। ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা এক হাজার ৩৭২টি। গণধর্ষণের ঘটনা দুই হাজার ৮৫৪টি। ধর্ষণ-সংক্রান্ত এই তিন ধরনের অপরাধ ঘটে ১১ হাজার ৪৫৮টি। ধর্ষণ-সংক্রান্ত অপরাধের পরেই সংখ্যার দিক দিয়ে বেশি অপরাধ হত্যাকাণ্ডের। হত্যাকাণ্ড ঘটে ১০ হাজার ১৬১টি। এরপর বেশি ঘটনা শারীরিক নির্যাতনের। নারীর ওপর এ ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটে পাঁচ হাজার ৬২৭টি। দেখা গেছে, ১৪ বছরের এই হিসাব ধরে প্রতি বছরে গড়ে ধর্ষণ-সংক্রান্ত অপরাধ ঘটেছে ৮১৮টি। প্রতিদিন ঘটছে এ ধরনের দুটি অপরাধ। প্রকাশ হওয়া ঘটনার আড়ালে ধর্ষণের ঘটনা থেকে যাচ্ছে আড়ালে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছে এ ধরনের মামলার সংখ্যা বাড়ছে।
বাংলাদেশে ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ধর্ষণের বিভিন্ন জরিপ নিম্নে দেয়া হলো –
• ২০১০ সাল-৪১১ জন
• ২০১১ সাল-৬০৩ জন
• ২০১২ সাল-৮৩৬ জন
• ২০১৩ সাল-৭১৯ জন
• ২০১৪ সাল-৭৭৯ জন
• ২০১৫ সাল-১০৬৯ জন
• ২০১৬ সাল-৮৬৭ জন (অক্টোবর মাস পর্যন্ত)
(তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির দেয়া ধর্ষণের পরিসংখ্যান )
source: http://info.totthoapa.gov.bd/…/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%…
ধর্ষণ কি?
উইকিপিডিয়াতে ধর্ষণের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে “Rape is a type of sexual assault usually involving sexual intercourse, which is initiated by one or more persons against another person without that person’s consent.” সহজ ভাষায় বলতে গেলে, কোন মহিলার সম্মতি ব্যতিরেকে তার সাথে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপন করাই হলো ধর্ষণ।
পেনাল কোড দন্ডবিধির ৩৭৫ ধারায় ‘ধর্ষণ’-কে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে তা হলো: যদি কোন পুরুষ নিম্নবর্ণিত পাঁচ প্রকারের যে কোন অবস্থায় কোন নারীর সাথে যৌন সহবাস করে তবে সে ব্যক্তি নারী ধর্ষণ করেছে বলে গণ্য হবে-
১. কোনো নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে অথবা
২. কোনো নারীর সম্মতি ছাড়া অথবা
৩. কোনো নারীকে মৃত্যু বা শারীরিক আঘাতের ভয় দেখিয়ে সম্মতি দিতে বাধ্য করলে অথবা
৪. নাবালিকা অর্থাৎ ১৬ বছরের কম বয়স্ক শিশু সম্মতি দিলে কিংবা না দিলে (সে যদি নিজ স্ত্রীও হয়) অথবা
৫. কোনো নারীকে বিয়ে না করেই ব্যক্তিটি তার আইনসঙ্গত স্বামী এই বিশ্বাস দিয়ে যদি কোনো পুরুষ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে তাকে আইনের ভাষায় ধর্ষণ বলা হবে।
এখানে উল্লেখ্য যে, অনুপ্রবেশই নারী ধর্ষণের অপরাধ রূপে ‘গণ্য হবার যোগ্য যৌন সহবাস’ অনুষ্ঠানের জন্য যথেষ্ট বিবেচিত হবে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধনী-২০০৩) ধারা ৯-এর ১-এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে:
যদি কোনো পুরুষ বিবাহবন্ধন ছাড়া ১৬ বছরের অধিক বয়সের কোনো নারীর সঙ্গে তার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলক ভাবে তার সম্মতি আদায় করে অথবা ১৬ বছরের কম বয়সের কোনো নারীর সঙ্গে তার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহলে তিনি ওই নারীকে ধর্ষণ করেছেন বলে গণ্য হবে।
ধর্ষণকারীর জরিমানা ও শাস্তি: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০(সংশোধনী-২০০৩)-এর ধারা ৯-তে বলা হয়েছে:
১. যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।
২. যদি কোনো ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ বা ওই ধর্ষণ-পরবর্তী তার অন্যবিধ কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহলে ওই ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অতিরিক্ত এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।
৩. যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে এবং ধর্ষণের ফলে ওই নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে বা তিনি আহত হন, তাহলে ওই দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অতিরিক্ত এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।
৪. যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টা করেন, তাহলে ওই ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন। এ ছাড়া যদি কেউ ধর্ষণের চেষ্টা করেন তাহলে ওই ব্যক্তি অনধিক ১০ বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।
৫. যদি পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন কোনো নারী ধর্ষিত হন, তাহলে যাদের হেফাজতে থাকাকালীন ওই রূপ ধর্ষণ সংঘটিত হয়েছে, সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা ধর্ষিত নারীর হেফাজতের জন্য সরাসরি দায়ী ছিলেন, তিনি বা তারা প্রত্যেকে ভিন্নরূপ প্রমাণিত না হলে হেফাজতের ব্যর্থতার জন্য অনধিক ১০ বছরের কিন্তু অনূ্যন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।
ধর্ষণ প্রতিরোধে তাই আমাদের অবিলম্বে যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা উচিৎ আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায় তা নিম্নরূপ:
# ধর্ষণ সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তি আরো কঠোর করতে হবে।
# যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী মাদক ইয়াবা ট্যাবলেটের বিস্তার রোধ করতে হবে। কেননা এটি প্রচলিত হওয়ার পর থেকেই হঠাতই বেড়ে গেছে ধর্ষণের মাত্রা।
# ইন্টারনেটের ১৮+ সাইটগুলো বন্ধ করতে হবে। সেই সাথে বন্ধ করতে হবে পর্ণোগ্রাফিক পত্রপত্রিকা আর নীল ছবির প্রদর্শন ও বিক্রি। কারণ এগুলো থেকেই যৌন বিকৃতির জন্ম নেয়। যা ধর্ষণের অন্যতম কারণ।
# যৌন পল্লীগুলোর বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা আরোপ করা প্রয়োজন। কারণ অবদমিত যৌনাকাংখা ধর্ষণের অন্যতম কারণ।
# যৌনবিজ্ঞানকে একাডেমিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কারণ এতে যৌনজীবন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা জন্মে। ফলে ধর্ষণের আশঙ্কাও কমে আসে।
পরিশেষে শুধু এটাই বলি, নারী মানে মা, মাটি, মাতৃভূমি, বধু , জায়া, ভগ্নি। তাদের যথাযথ সম্ভ্রম রক্ষার দায়িত্ব আপনার, আমার সবার। আর এই দায়িত্বে অবহেলা করলে তার চরম মূল্য হয়তো এর পরেরবার আপনাকে বা আমাকেই দিতে হতে পারে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







