রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় এক মাদ্রাসা ছাত্রী গত শনিবার দলগত ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার রাজধানীর উত্তরার এক বিপণিবিতানের বিক্রয় প্রতিনিধি এক কিশোরী সন্ধ্যার পরে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে ধর্ষিত হয়েছেন তারই এক সহকর্মীসহ কয়েকজন নরপশুর দ্বারা।
নিজেদের বিকৃত লালসা চরিতার্থ করতে কিছু লোক দলবদ্ধভাবে নারী ধর্ষণ করছে—কিছুদিন পরপর এমন খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এর কোন প্রতিকার হচ্ছে না। এসব জঘন্য অপরাধীর বিচার ও শাস্তির খবরও তেমন পাওয়া যায় না। ফলে সমাজে এমন এক বিচারহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে তাতে করে ধর্ষণের প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
মাত্র কিছুদিন আগে রাজধানীতেই এক দোকানকর্মী আদিবাসী তরুণীকে কয়েকজন যুবক কাজ থেকে ঘরে ফেরার পথে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে গিয়ে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করেছিলেন।
ধর্ষণ বা ধর্ষণের বিচার না হওয়াটা কেবল আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত সমস্যা নয়, এটা আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের গভীর এক অসুখ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মেয়েদের যৌনবস্তু ছাড়া অন্য কোন কিছু ভাবতে নারাজ।
সমাজে এখনও বেশিরভাগ পুরুষ মনে করে যে, মেয়েরা দুই প্রকার (ছোট বেলায় বিজ্ঞান বইতে যেমনটি পড়েছিলাম, জীব দুই প্রকার, প্রাণী আর উদ্ভিদ; ঠিক সেই রকম)!
যথা, ১ – ভাল মেয়ে; এরা বাড়ির কাজ করে, সন্ধ্যের পর একা বাড়ির বাইরে বেরনো এদের কাছে মহা-পাপ, এরা স্বামী–শ্বশুরের খিদমৎ খাটে, ‘বাচ্চা দেয়’, আর রাতের বেলা বন্ধ দরজার আড়ালে ‘স্বামী সেবা’ করে ।
২ – আরেক রকম ‘মেয়েছেলে’ আছে; এরা চাকরি-বাকরি করে, সন্ধ্যায় কিংবা রাতে এরা একা বা কয়েকজন মিলে বাড়ির বাইরে যায়, আড্ডা মারে, মার্কেটে ঘুড়ে বেড়ায়, ‘খারাপ কাপড়’ বা ‘জিনস’ পরে। এদের কারণেই নাকি ছেলেরা ‘নষ্ট’ হয়, নানা রকম পাপাচারে লিপ্ত হয়।
আমরা যারা ‘সমানাধিকারে’ বিশ্বাস করি, আমাদের অন্তকরণ জুড়েও ‘পাপ’, আছে দ্বিধা-যুক্তিবোধের অভাব। এই আমরাও শেষ পর্যন্ত বলে ফেলি, কী দরকার এসব পোশাক পরার, ‘প্রভোক’ করার? রাত-বিরেতে বাইরে না বেরোলেই কি নয়? কেউ কেউ তো এমন উপমাও দেয় যে, ‘খাদ্য খোলা থাকলে কুকুর তো মুখ দেবেই!’ নিজেকে তো হীন করি-ই; না বুঝে কুকুরকে পর্যন্ত অপমান করে বসি!
আমাদের মনমানসিকতা, চিন্তাভাবনা, শিল্পসংস্কৃতি জুড়ে রয়েছে পুরুষের বাহাদুরি আর নারীর উপর জোর-জুলুম চালানোর অভিপ্রায়। এখানকার সিনেমা-নাটকে দেখানো হয়, প্রেমের ক্ষেত্রে ‘বিরক্ত করে যাও, এক সময় ঠিকই পাবে’! এটা দেখানো মানে একটি মানুষের মৌলিক অধিকারের কথা বিস্মৃত হয়ে, তার উপরে নিজ আকাঙ্ক্ষার ভার ও দায় চাপিয়ে দেওয়া। এর মধ্যে রয়েছে নিজেকে অতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদান করবার ও অন্যের ব্যক্তিত্বকে অবজ্ঞা করবার বার্তা।
নারীকে দেখে পুরুষের ভাল লাগতেই পারে এবং নারীটিকে না পেয়ে তার হৃদয়ে প্রবল বেদনা জন্মাতেই পারে, কিন্তু নারীটির তাকে না-ভালবাসার অধিকারকে শ্রদ্ধা না করলে সেই প্রেম ও জুলুমের পার্থক্য থাকে না। ওই প্রেমকে মহিমান্বিত করবার অর্থ এক প্রকার পুং-গুন্ডামিকে প্রশ্রয় দেয়া ও প্রশংসায় রঞ্জিত করা। এমনকী, নারীকে নির্যাতন করবার সাফাই রচনা। আমাদের দেশের সিনেমা-নাটকে যুগ যুগ ধরে এটাই দেখানো হচ্ছে।
পুরুষতান্ত্রিক বিধানে যৌনতার অনুষঙ্গকে বহন করে চলার আবহমানকালীন অভ্যাস মেয়েদের মেনে নিতে হয়েছে বলে নিজস্ব এক সন্ত্রাসের জগতে বাঁচাটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের অনিবার্য নিয়তি। সে জগতে পুরুষের প্রতিপক্ষে একা নারী, নারীর মন সেখানে অস্বীকৃত-উপেক্ষিত, কেবল আছে নারীর শরীরটুকু আর তাকে ঘিরে আদিমতার উল্লাস। ভোগের সেই উৎসবে শামিল শত-সহস্র-লক্ষ জন। নইলে ব্যক্তিগত যৌন লালসা থেকে পারিবারিক বিবাদের আক্রোশ পর্যন্ত যে-কোনও কারণেরই সহজ শিকার নারী, প্রতিশোধস্পৃহার সহজ নিবৃত্তি ধর্ষণ কেনো? এই হিংস্রতার অনালোচিত বৃত্তে ধরা দিতে হয় কখনও ধনীর দুলালিকে, কখনও নিরীহ গৃহবধূকে, হতদরিদ্র বালিকাকে। আবার কখনও আট-নয় বছরের স্কুল ছাত্রীকে, মূক-বধির তরুণীকে, এমনকী দুই-তিন বছরের শিশুকন্যাকেও, কারও নিস্তার নেই।
ধর্ষণের পরেও থাকে আর এক রকম ধর্ষণ। তাই পুরুষের সঙ্গে সমান আগ্রহে পুরুষের চিন্তা দিয়ে গড়া নারীরাও ধর্ষিতার পেশা, জীবনযাত্রা, বিবাহজনিত সুলুকসন্ধান করেন এবং শেষ পর্যন্ত নারীটিকে অভিযুক্ত সাব্যস্ত করে মহাস্বস্তির কাঙ্ক্ষিত শ্বাস ফেলেন! তাঁরা যে আসলে পুরুষতন্ত্রেরই মুখ, পিতৃশাসনেরই স্বর, এ কথা বুঝি নিজেরাও বোঝেন না।
এদিকে একদল আবার বই লিখছে, মেয়ে হয়ে জন্মালে কী কী করতে হবে, কোথায় কোথায় যাওয়া বারণ, কোন ধরনের জামাকাপড় পরা বারণ৷ অন্যথায়, কী কী আচরণ করলে পুরুষের খুবলে খাওয়া সহ্য করতে হবে! এর বাইরেও অনেকে আছেন, যারা সব জানেন, বোঝেন, মানেন, কিন্তু আদতে তারা ভয়ানক ভীতু। কখনও যুক্তি কিংবা পেশি নিয়ে দাঁড়াতে চান না।
যখন শহুরে কর্মজীবী নারীর পুরুষ সহকর্মীর কামনার কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া কোনও বিকল্প থাকে না, তখন দু’মুঠোয় শূন্যতাকেই কেবল আঁকড়ে ধরতে ইচ্ছে হয়। ফলে মেয়েরা কেবলই ক্ষয়ে যায়, একটু একটু করে গর্তে ঢুকে যায়। সচেতন সোচ্চার হয়েও সামগ্রিক বৈরীতায় আবার গতানুগতিকতার জলে গা ভাসায়।
প্রশ্ন হলো, আর কতদিন এভাবে রঙিন কাচের আড়ালে, মুখোশ পরে, সমস্ত পরিস্থিতি এড়িয়ে, গা বাঁচিয়ে চলব আমরা? আমাদের দেশে মশা আছে, রয়েল বেঙ্গল টাইগার আছে, পভার্টি-পল্যুশন আছে। এসব তো অনেকদিন থেকেই আছে। আমাদের চেকলিস্টে নতুন সংযোজন– ‘রেপ’ এবং ‘গ্যাং রেপ’। আসলে আমরা জানি, আমাদের ঘরে আগুন না লাগলেই হল। অন্যরা আগুনে পুড়ে গেলে কী আর করব, সৌখিন মধ্যবিত্তরা ‘আহা-উহু’র আপডেট দেব ফেসবুকে, টুইট করব নিজের ফিলিংস। পারলে ইনস্টাগ্রামে একটি ছবি আপলোড করব, ব্যস। খেল খতম, পয়সা হজম।
তাই বলে কি দেশে মানুষ নেই? হ্যাঁ, মান আর হুঁশ যুক্ত প্রাণীদের মানুষ বলা হয়। আমাদের সমাজে একেবারেই হাতে গোণা কিছু মানুষ তো এখনও রয়েছে (বাকিরা বোধহয় নেহাতই ‘পুরুষ’ নামক প্রাণী)! তারা কবে নড়েচড়ে উঠবেন? মনুষ্যত্বের উপর আরোপিত কলংকের দায় শোধ করতে রুখে দাঁড়াবেন?







