অর্থনীতি

দেশের অর্ধেক ব্যাংক কর্মকর্তা প্রযুক্তি নিরাপত্তা না বুঝা কতটা ঝুঁকির?

দেশের অর্ধেক ব্যাংক কর্মকর্তা প্রযুক্তি নিরাপত্তা না বুঝা কতটা ঝুঁকির?

দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তি নিরাপত্তা সম্পর্কে ব্যাংকারদের জ্ঞান না থাকাকে ভয়াবহ হুমকি বলে মনে করছেন বিষেশজ্ঞরা। তাদের মতে, সাইবার ঝুঁকি সংক্রান্ত বিপদের কোনো সীমা নাই। নি:সন্দেহে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের বিপদ অপেক্ষা করছে। আশু ঝুঁকি মোকাবেলা করতে না পারলে যেকোনো সময়ে যেকোনো ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়াসহ বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। তাই দ্রুত কর্মকর্তাদের উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আইটি জ্ঞানসম্পন্ন করে গড়ে তোলা জরুরী বলে মত দিয়েছেন বিষেশজ্ঞরা।

ব্যাংকিং খাতের প্রযুক্তি নিরাপত্তা বিষয়ে জানতে চাইলে দেশের অর্থনীতিবিদ, বিশিষ্ট ব্যাংকার ও প্রযুক্তিবিদরা চ্যানেল আই অনলাইনকে এসব ঝুঁকির কথা বলেন।

মঙ্গলবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) এক গবেষণায় বলেছে, প্রযুক্তি নিরাপত্তা সম্পর্কে দেশের অর্ধেক বা ৫০ শতাংশ ব্যাংক কর্মকর্তা জানে না। যার মধ্যে ২৮ শতাংশের অবস্থা একেবারে তলানিতে, ২২ শতাংশের মোটামুটি জ্ঞান রয়েছে। আর সামান্য ধারণা রয়েছে ২০ শতাংশ কর্মকর্তার। দেশের সরকারি-বেসরকারি ২১টি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের উপর উপর জরিপ চালিয়ে এই তথ্য পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এর আগে ৪ মে অন্য একটি গবেষণায় প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, ৫২ শতাংশ ব্যাংক তথ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। যার মধ্যে ভয়াবহ মাত্রায় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ১৬ শতাংশ। আর উচ্চ মাত্রার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে ৩৬ শতাংশ। এছাড়া ৩৬ শতাংশ ব্যাংক মনে করে, যেকোনো মুহূর্তে তাদের তথ্য হ্যাক হতে পারে।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রযুক্তি জ্ঞান না থাকাকে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন বিআইবিএমের সহযোগী অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমান আলম ও সফটওয়্যার, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা খাতের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্য সংগঠন বেসিসের সভাপতি প্রযুক্তিবিদ মোস্তফা জব্বার ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জা আজিজুল ইসলাম।

তারা মনে করেন, ভবিষ্যত ব্যাংকিং খাতে ভয়াবহ বিপদ অপেক্ষা করছে। এই বিপদ মোকাবেলায় প্রযুক্তিগত জ্ঞান থাকা আবশ্যক।

অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমান আলম

অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমান আলম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, সব ব্যাংক কর্মকর্তারই প্রযুক্তি সম্পর্কে কমবেশি জ্ঞান থাকা লাগবে। কারণ যিনি ক্যাশে বসেন তিনিও কম্পিউটারে কাজ করেন। যা অফিসের সার্ভারের আওতাভুক্ত। আর সার্ভার মানে নেটওয়ার্কভুক্ত।

বিশ্বব্যাপী সাইবার আক্রমণ বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর ফলে যেকোনো সময়ে যেকোনো ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কারণ  বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সাইবার নষ্ট, সাইবার হ্যাক ও অগ্নিকান্ডসহ বিভিন্ন কারণে গত ২০ থেকে ৩০ বছরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রায় ৪৫ টি ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। কার্যক্রম সচল করতে ৫ থেকে ৬ দিন লেগে গেছে। এতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ব্যাংকগুলোর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয় নিয়ে গবেষণা করা এই অধ্যাপক বলেন, ইন্টারনেটের আওতা দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে সব অফিসে কার্যক্রম অনলাইনে হয়। এর ফলে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতাও। সেজন্য অবশ্যই কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান থাকা দরকার।

তবে এটা শুধু ব্যাংকের ক্ষেত্রে নয়, সব অফিসের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যেহেতু বর্তমানে ব্যাংক খাত বেশি ঝুঁকিতে, তাই এক্ষেত্রে আগে নজর দেয়া উচিত।

মোস্তফা জব্বার

প্রযুক্তিবিদ মোস্তফা জব্বার চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, জাতীয় আলোচ্যসূচীতে প্রযুক্তি নিরাপত্ত বা হুমকির বিষয়গুলো অন্তর্ভূক্ত থাকে না। ব্যাংকগুলোতে অনলাইন সফটওয়ার ব্যবহার করে ঠিকই কিন্তু সফটওয়ার ব্যবহারের জন্য দক্ষ কর্মকর্তা তৈরি করা হয় না। দেশ ডিজিটাল হচ্ছে। কিন্তু ডিজিটাল দেশ কিভাবে এনালগ লোক দিয়ে পরিচালনা করবে? যাদের ৯৫ শতাংশ লোকেরই আধূনিক প্রযুক্তিগত জ্ঞান নাই।

ভবিষ্যতে সাইবার ঝুঁকি সংক্রান্ত বিপদের কথা বলার কোনো সীমা থাকবেনা-এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে এই প্রযুক্তিবিদ বলেন, আমরা চরম হুমকিতে পড়তে যাচ্ছি। এখনও হয়তো টের পাচ্ছি না। তবে সামনে যে বড় ধরনের বিপদ অপেক্ষা করছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নাই।

মির্জা আজিজুল ইসলাম

 

প্রায় একই কথা বললেন মির্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, এটা অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ দিন দিন মোবাইল ব্যাংকিং, ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার, অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেমসহ অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম বাড়ছে। এরফলে একদিকে গ্রাহককে দ্রুত সেবা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে। অন্যদিকে বাড়ছে ঝুঁকিও। বিশ্বব্যাপী এ ঝুঁকি দেখা যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তাদের আইটি বিষয়ে অবশ্যই দক্ষ হওয়া অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে এখনই এসব বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া দরকার।

 

খন্দকার ইব্রাহীম খালেদ

তবে দেশের অর্ধেক ব্যাংক কর্মকর্তা প্রযুক্তি নিরাপত্তা সম্পর্কে না জানার বিষয়টিকে খুব বেশি উদ্বেগের মনে করেন না বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডিপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহীম খালেদ।

তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, এটা খুব বেশি ঝুঁকি নয়। কারণ সবার প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারনা থাকা লাগে না। যেমন ক্যাশ বিভাগসহ কয়েকটি বিভাগ আছে তাদের প্রযুক্তির ব্যবহার খুব দরকার হয় না। বলতে গেলে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাশ ব্যাংক কর্মকর্তার প্রযুক্তিগত জ্ঞান থাকা খুব জরুরী নয়।

কিন্তু দিন দিন প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির সাথে সাথে এর ঝুঁকিও বাড়ছে। এই জন্য প্রশিক্ষণ দরকার। যদিও প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে তবে সেটা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করেন তিনি।

বিষয়:বিআইবিএম গবেষণা প্রতিবেদন

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…