খুন, কেন্দ্র দখল, জালভোট, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, আতঙ্ক সৃষ্টি, ক্ষমতা
দেখিয়ে ভোটার আকর্ষণ, দলীয় গঠনতন্ত্র ও শৃংখলা ভঙ্গের মধ্য দিয়ে ইউপি
নির্বাচন সম্পন্ন হলো। এতে শতাধিক মানুষের প্রাণ ঝরলো। একদিনের একটি পত্রিকার শিরোনাম দেখলেই নির্বাচনের বাস্তবচিত্র বোধগম্য হয়।
গত ৪ জুন দৈনিক প্রথম আলোর কয়েকটি শিরোনাম: ‘নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলো নৌকার প্রার্থী’, ‘ভোট কেনা ঠেকাতে পাহারা’, ‘ভোট কেনার অভিযোগে জামাত নেতা আটক’, ‘মুঠোফোনে টাকা পাঠিয়ে ভোট কেনার অভিযোগ’, ‘হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও এসপির অপসারণ দাবী’। এমন শিরোনামে প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্রের পাতায়ই ইউপি নির্বাচনের অগণতান্ত্রিক, অনৈতিক ও নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতার নানা চিত্র ফুটে উঠেছে।
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের ভোলাকোট বায়তুল মামুর মসজিদের ইমাম ভোটারদের নিরাপত্তা দাবী করে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেছেন। ৩জুন শুক্রবার জুম্মার নামাজ শেষে তিনি সকল মুসল্লী ও ভোটারদের নিয়ে তিনি এই প্রার্থনা করেন। তিনি আল্লাহর দরবারে দুহাত তুলে বলেন, ‘হে আল্লাহ্, চারদিকে মারামারি, হানাহানি চলছে। কাল আমাদের এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হবে। তুমি সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট গ্রহণের জন্য সকলের দিলে রহমত দিয়ো। আমাদেরকে নিরাপদে রেখো।’
গণতন্ত্রের যেখানে মানুষকে নিরাপত্তা দেয়ার কথা সেখানে আজ নিরাপত্তা কেড়ে নেয়া হল। মাদকাসক্ত যুব সমাজ, চরিত্রভ্রষ্ট নারী ও ধর্মজ্ঞানহীন ধার্মিকের মতো আজ গণতন্ত্রও চরিত্র হারালো। মাদকাসক্ত যুবক, চরিত্রভ্রষ্ট নারী ও ধর্মজ্ঞানহীন ধার্মিকের কাছে যেমন মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নেই গণতন্ত্রের কাছেও আজ তেমনই। তৃণমূলে গণতন্ত্রের চর্চাকে বেগবান করার নামে ইউপি নির্বাচন গণতন্ত্রের চরম ক্ষতি করল। মানুষ হারালো ভোট দানের আনন্দ ও উৎসাহ।
যে নির্বাচন গণতান্ত্রিক উৎসবে পরিণত হওয়ার কথা আজ সেটি হল পেশি শক্তি, জালিয়াতি ও রাষ্ট্রীয় শক্তির স্বেচ্ছাচারিতার উৎসবে। শতাধিক মানুষের প্রাণ বিসর্জনের দায় কে নেবে। নির্বাচন কমিশনের কাছে কী ব্যাখ্যা আছে এই প্রাণদানের ব্যাপারে। বিদ্রোহী প্রার্থী বনাম দলীয় প্রার্থী, দলীয় প্রার্থী বনাম উপদলীয় প্রার্থীর বিএনপি -জামাত সমর্থন, দলীয় প্রার্থী সমর্থকদের হাতে বিদ্রোহী প্রার্থী সমর্থক খুন, বিদ্রোহী প্রার্থী সমর্থকদের হাতে দলীয় প্রার্থী সমর্থক খুন, সরকার দলের সমর্থকদের হাতে ভিন্নদলের প্রার্থী সমর্থক খুন, হামলা, ভাঙচুর আরও কতো কী।
পুলিশ ও প্রিজাইডিং অফিসারের সামনে জালভোট, মৃতব্যক্তির ভোট, অনুপস্থিত ভোটারের ভোট, একজনের কয়েকশ ভোট প্রদান প্রভৃতি কারণে ইউপি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা তলানিতে ঠেকেছে। সকলই নীতি নৈতিকতা, মানবিকতা ও গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার বিসর্জন দিয়ে জয়ের নেশায় মাতাল হয়ে উঠেছে। মাতলামোতে প্রথম স্থান অধিকার করলো সরকার দলীয় প্রার্থীরা। তাদের এতবেশী বেপরোয়া হওয়ার কারণ একটাই ক্ষমতাসীন দলের চেয়ারম্যান হলে ক্ষমতার দাপট বেশী, সুযোগ সুবিধা বেশি, টি, আর কাবিখাসহ নানা উন্নয়ন বরাদ্দ আত্মসাৎ করলেও কেউ কিছু করতে পারবে না।
অনেক জায়গায় এমন ঘটনাও ঘটেছে সরকার দলীয় প্রার্থীরা প্রতিপক্ষ বিএনপি দলীয় প্রার্থীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, আর্থিক সুবিধা প্রদান অথবা দল ক্ষমতায় নেই চেয়ারম্যান হলেও কাজ করতে পারবে না এসব কথা বলে তাদের নির্বাচন হতে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। নিশ্চিত করা হয়েছে সরকার দলের দলের প্রার্থীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিজয়কে।
মনোনয়ন বাণিজ্যের পাশাপাশি ঘটলো টাকা দিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ারম্যান কেনাও। শুধু কি তাই? আরও চমকপ্রদ ঘটনা রয়েছে। বাংলাদেশের দুটি ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থীদের চাপে দলীয় প্রতীক দেয়াই সম্ভব হয়নি। নৌকা প্রতীক ছাড়াই এখানে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে গত ২৮মে। ইউনিয়ন দুটি হলো রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের ছেলে রেজওয়ান আহমেদ তৌফিক এমপির সংসদীয় এলাকা অষ্টগ্রামের ৬নং আদমপুর ও ৭নং খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থীরা তাদের নির্বাচনী প্রচারে বলেছেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতির পরিচিত, রেজওয়ান আহমেদ এমপির ঘনিষ্টজন, সাবেক দুই/তিনবারের সফল চেয়ারম্যান ইত্যাদি ইত্যাদি।
এলাকার মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, খয়েরপুর-আব্দুল্লাহ্পুর ইউনিয়ন উপজেলার সর্ববৃহৎ ইউনিয়ন। এখানে জাতীয় নির্বাচনে শতকরা ৭৫ ভাগ ভোট নৌকা মার্কার বাক্সে পড়েছিল। এবারের আওয়ামী লীগের নৌকাবিহীন ইউপি নির্বাচনে আদমপুর ইউনিয়নে জয়লাভ করেছেন আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মন্নাফ, এখানে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোঃ সেলিম মিয়া ধানের শীষ প্রতীকে লড়েছেন। খয়েরপুর-আব্দুল্লাহ্ পুর ইউনিয়নে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা মুত্তার খান, এখানে ধানের শীষ নিয়ে লড়েছেন কালাম মাহমুদ। এ দুই ইউনিয়নে নৌকা প্রতীক না দেয়ায় তৃণমূলের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সারাদেশে এক নিয়ম আর অষ্টগ্রামের দুই ইউনিয়নে অন্য নিয়ম। এনিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন। তৃণমূল নেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তৃণমূলের ভোটে যাদের দলীয় প্রার্থী করা হয়েছিল তাদের ঠেকাতে নৌকা প্রতীক ঘোষণাই ঠেকিয়ে দেয়া হয়েছে। রেজওয়ান আহমেদ তৌফিক এমপির সমর্থিত প্রার্থীরা তৃণমূলের মনোনয়ন ভোটিংয়ে পাশ না করায় কাউকে নৌকাই দেয়া হলো না। এলাকায় শুরু হল ক্ষমতার জোর প্রকাশের অগণতান্ত্রিক প্রচারণা।
তৃণমূল ভোটিংয়ে হেরে যাওয়া প্রার্থীরা প্রচার চালালো, আমাকে ভোট দাও, আমি রাষ্ট্রপ্রতি ও রাষ্ট্রপতির ছেলে রেজওয়ান আহমেদ তৌফিক এমপির ঘনিষ্ট জন। আমাকে নমিনেশন দেয়া হয়নি বলে কাউকে নৌকাই দেয়া হলো না। (ভাবটা এমন, বুঝো আমার ক্ষমতার জোর কত)। খয়েরপুর-আব্দুল্লাহ্পুর ইউনিয়নের এক আওয়ামী লীগ নেতার (এমপির বিরাগভাজন করার ভয়ে তার নাম প্রকাশ করলাম না) সাথে কথা বললে তিনি বলেন, মনোনয়ন সভার তৃণমূল ভোটিংয়ে ১১ ভোট পান আওয়ামী লীগ নেতা মিজানুর রহমান (রাজা মিয়া), মুত্তার খান পান ৫ ভোট। অতঃপর মুত্তার খান এমপি সাহেবকে দিয়ে নৌকাই স্টপ করিয়ে দিলেন। এই কথাটা এলাকায় এলাকায় গিয়ে ভোটারদের বলে ক্ষমতার জোর দেখিয়ে তাদের পক্ষে আনার চেষ্টা করেছেন।
স্পিকার আব্দুল হামিদ রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরে তার ছেড়ে দেয়া সংসদীয় আসনে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয় তার ছেলে রেজওয়ান আহমেদ তৌফিককে। তিনি নৌকা প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আর তিনি এমপি হয়ে তার এলাকার দুটি ইউনিয়নে কাউকে নৌকা প্রতীকই নিতে দিলেন না। এর কি ব্যাখ্যা হতে পারে? আওয়ামী লীগের গঠন তন্ত্র বিশেষজ্ঞ ও নীতি নির্ধারকরা নিশ্চয়ই তার জবাব দেবেন।
সারাদেশের চিত্র এক আর অষ্টগ্রামের দুটি ইউনিয়নে আরেক! আওয়ামী লীগ নেতারা বিভিন্ন মার্কা নিয়ে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে গেল। কেউ কিছু বললো না, নির্বাচন হয়ে গেল। দলীয় প্রার্থী ঘোষণার বিপরীতে কেউ দাঁড়িয়ে গেলে যদি তাদের বহিষ্কার করা হয়। দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করতেই না দিলে তাদের বেলায় দলীয় কি সিদ্ধান্ত? এটা পরিস্কার করা উচিত। দলীয় প্রার্থীর বিপরীতে যারা দাঁড়ালো তাদের বলা হচ্ছে বিদ্রোহী প্রার্থী। যারা দলীয় প্রার্থীই ঘোষণা করতে দিলো না তাদের কী বিশেষণ দেয়া যেতে পারে।
যদি বলি তারা বিদ্রোহী+ অথবা মহাবিদ্রোহী সেটা কি অবান্তর হবে? আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারক, সুশীল সমাজ ও পাঠকদের কাছে এই প্রশ্নটা রাখলাম। এবারের ইউপি নির্বাচন নির্বাচনের সকল নৈতিকতা, গণতান্ত্রিক আস্থা, দলীয় শৃংখলা তথা সকল ইতিবাচক শর্তকেই ডিলিট করে দিল। সৃষ্টি করল স্বেচ্ছাচারিতা, বিশৃংখলা, ক্ষমতান্ধতা, সন্ত্রাস, হামলা,পাল্টা হামলা আর খুনোখুনির প্রকাশ্য অবস্থান। এ নির্বাচন গণতন্ত্র, নির্বাচনী ব্যবস্থা,ও দলীয় শৃংখলার যে ক্ষতি সাধন করেছে তা আর অদূর ভবিষ্যতেও পূরণ হবার নয়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত
মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির
সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









