১২/১৩ বছরও হয়নি খায়রুন্নেসার বয়স। কিন্তু গ্রামের মেয়েদের এটাই বিয়ের বয়স। বাবা-মা বিয়ে দিয়ে দিলেন খায়রুন্নেসার। সময়টা মুক্তিযুদ্ধের বছর দুই আগের। বছর যেতেই বাচ্চাও হলো একটা। তখনতো সারাদেশে প্রচণ্ড উত্তেজনা। যুদ্ধ লাগে লাগে অবস্থা। তার রেশ লাগে গ্রামে-গঞ্জে। তবে তখনো বাড়িছাড়ার মতো দুরবস্থা হয়নি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাসখানেক আগে খায়রুন্নেসার বাচ্চাটা মারা যায়, প্রায় বিনাচিকিৎসায়। স্বাভাবিকভাবেই মন খারাপ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি। একেকসময় একেক সংবাদ আসে। শোনা যায়- ওই জায়গায় ঐ জায়গায় এতজন মানুষকে খুন করেছে পাকিস্তানি ও তাদের দোসররা। ওই জায়গায় গ্রাম কি গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে।
ঢাকা ও অন্য শহরগুলো দখল করারও বেশ কয়েকদিন পর তাদের এলাকাতেও পাকিস্তানিরা ঘাঁটি করে। ভয়টা বেড়ে যায়। এলাকা থেকে অনেকেই পালিয়ে যায়। অধিকাংশই যায় ভারতে। আশ্রয় নেয় শরণার্থী শিবিরে।
কিন্তু খায়রুন্নেসার স্বামী সমর আলী বললেন, ময়মনসিংহ আমার জেলা। চাউড়াপাড়া গ্রাম। এখানে পূর্বপুরুষের বাস। আমার জন্ম এখানে। এই জায়গা ছেড়ে যাবো কোথায়। গ্রামের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ রয়ে গেছে। আর গেলেও কোথায় যাবো। খাবো কি? কৃষি কাজ করাও সম্ভব হবে না। সুতরাং বাড়িতেই থাকতে হয় তাদের। ওই এলাকার মানুষগুলো অর্থনৈতিকভাবে গরিব। পেশায় প্রায় সবাই কৃষিজীবী। রাজনীতির ধারেকাছে নেই এরা। সবারই ভাবনা- নিরীহ মানুষকে কি আর পাকিস্তানিরা মারবে? আর তাদের হাতে দেশের নারীদের ইজ্জত নষ্ট হওয়ার কথা তো ভাবতেও পারেনি তারা।
কিন্তু সেই ভাবনাকেও ভুল প্রমাণিত করলো পাকিস্তানি বাহিনী। সময়টা শ্রাবণ মাস আসতে আরো ৩দিন বাকি ছিল। প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টির কারণেই হোক কিংবা অন্য কোনো কারণেই হোক খায়রুন্নেসার স্বামী আর জমিতে যাননি। সকাল ১০টা হবে আনুমানিক। খায়রুন্নেসা দেখলেন, তারা ঘেরাও হয়ে পড়েছেন পাকিস্তানি আর্মির। তখনো বিশ্বাস করতে পারছিলেন না কতটা বিপদের মুখে আছেন তারা। খুব বেশি সৈন্য নেই ওদের সঙ্গে। বড়জোর ৪/৫জন। কিন্তু তারা যেভাবে বাড়িতে ঢুকেছে তাতে মনে হতেই পারে- এটা যেন মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো ক্যাম্প। না হলে এভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি কেন।
শত্রুকে যেভাবে সৈন্যরা ধরে ফেলে। তেমনি দৃশ্য চোখে পড়ে খায়রুন্নেসার। দেখেন ওরা ঢুকেই তার স্বামী সমর আলীকে ধরে ফেলে। উর্দুতে হলেও খায়রুন্নেসা বুঝতে পারেন, পাকিস্তানিরা জানতে চাইছে এই বাড়ির মহিলারা কোথায়। সমর আলীও হয়তো বুঝতে পেরেছেন। তিনি জবাব দিচ্ছিলেন না। শুধু আকুতি করছিলেন তাকে যেন ছেড়ে দেওয়া হয়। বাড়ির মহিলাদের সন্ধান না দেওয়ায় পাকিস্তানিরা আরো ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। তাকে পেটাতে থাকে ছোট লাঠি দিয়ে। তাও কাজ হচ্ছে না। সমর আলী কিছুতেই বাড়ির মহিলাদের কোনো সন্ধান দিচ্ছেন না। কারণ তিনি তো বুঝতে পারছিলেন হানাদার বাহিনী মহিলাদের ইজ্জত নষ্ট করার জন্যই এসেছে। তিনি অনড় থাকেন। অন্যদিকে সৈন্যদের অত্যাচারও চলতে থাকে।
লুকিয়ে থাকা খায়রুন্নেসা ভাবেন, যেভাবে মানুষটাকে পিটাচ্ছে তিনি যে মরে যাবেন। তার সামনে তার স্বামীকে এভাবে মারবে, সেই অবস্থায় তিনি কিভাবে লুকিয়ে থাকবেন। তিনি দৌড়ে আসেন পাকিস্তানিদের সামনে। প্রথমে হাতজোড় করে আবেদন জানান, তার স্বামীকে যেন ছেড়ে দেওয়া হয়। তার আকুতি দেখে হায়েনার হাসি বেরিয়ে আসে হানাদার বাহিনীর সৈন্যদের মুখে। একটা এসে তাকে জাপটে ধরে। তারপরও ধস্তাধস্তি করেন তিনি। একসময় রাইফেলের বাট দিয়ে তাকে পেটাতে থাকে ওরা। প্রায় নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। তখন ২/৩জন সৈন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে তার উপর। অবর্ণনীয় অবস্থা তখনকার। একসময় তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। জ্ঞান হারানোর আগেই দেখতে পেলেন পাকিস্তানি সৈন্যদের দুইজন তার স্বামীকে হাত বাধা অবস্থায় ঘর থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে।
একসময় পাকিস্তানিরা বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। যাওয়ার সময় তার স্বামীকেও নিয়ে যায়। বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে তিনি যান পাশের বাড়িতে। কিন্তু কে যাবে তার স্বামীকে ছাড়িয়ে আনার জন্য? আর পুরো গ্রামেইতো হাহাকার। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই চলছে কান্না। একটাই কথা- গ্রামটাকে ওরা পুরুষশুন্য করে ফেলছে নাতো? অনেককে ওরা বন্দী করে নিয়ে গেছে। কয়েকজন বলল, সবাইকে গরুর দড়িতে বেধে নিতাই নদীর দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু খায়রুনের পক্ষে এই শরীর নিয়ে নিতাই নদী পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব নয়। আর যাওয়াটা মোটেও নিরাপদ নয়। ভাসুরের ছেলেটা খুঁজলেন তাকে পাঠানো যায় কিনা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সংবাদ পাওয়া গেলো, তাকেও বেধে নিয়ে গেছে পাকিস্তানি সৈন্যরা। কী করবেন খায়রুন বুঝতে পারছিলেন না। নিজের শরীরের চিকিৎসা করাবেন নাকি স্বামীর সন্ধানে যাবেন।
এদিকে তাদের গ্রাম থেকে ৪০জনকে বেধে নদীর পাড়ে নিয়ে দাঁড় করানো হয়। দুটি লাইনে ওদের দাঁড় করিয়েছিল। গুলি করে গ্রামবাসীকে লক্ষ্য করে। সমর আলীর মৃত্যু হয়নি গুলিতে। সমর আলী ও তার মতো আরো যারা গুলিবিদ্ধ হয়েও বেঁচে ছিলেন বলে তাদের কাছে অনুমান হয়েছে, তাদের ওপর চালানো হয় বেয়নেট। সঙ্গে বুটের লাথি। এই ৪০জনের মধ্যে ছিলেন খায়রুনের ভাসুরের ছেলেও। আল্লাহর অশেষ রহমতে তার ভাসুরের ছেলের পায়ে গুলি লাগলেও তিনি পড়ে থাকেন মৃতের মতো। বেয়নেট চার্জও হয়নি তার উপর। তিনি বেঁচে যান। দেখতে পান সঙ্গে থাকা নিকটজনদের কেউ বেঁচে নেই।
পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের গুলি করে লাথি দিয়ে নদীতে ফেলে দেয়। খায়রুনের ভাসুরের ছেলেকেও ফেলে দেয়। অনেকের লাশই ছিলো নদীর পানি আর কাদায়। তিনিও সেখানে পড়ে থাকেন। পাকিস্তানি সৈন্যরা চলে গেলে তিনি বাড়ি ফিরেন। বাড়ি এসে দেখেন অসুস্থ খায়রুনকে। খায়রুন স্বামী হারানোর খবর পেয়ে আরো অচল হয়ে পড়েন। পুরো গ্রামই হয়ে পড়ে যেন মৃতপল্লী। যারা বেঁচে ছিলেন তারা যান নিতাই নদীর পাড়ে। ততক্ষণে অনেক লাশ ভেসে গেছে নদীর স্রোতে। কয়েকটা পড়ে ছিল কাদাপানিতে। কিন্তু সেগুলো বাড়িতে এনে দাফন করার মতো অবস্থা ছিল না। সবার একটাই ভয়, আবার বুঝি আসছে পাকিস্তানিরা। কারণ থেমে থেমে দূরে কোথাও থেকে ভেসে আসছিল গুলির শব্দ। গ্রামের মানুষ বোঝার ক্ষমতা নেই এই গুলির শব্দ কোথা থেকে আসছে। আর পাকিস্তানিরাও এদিকে আসছে কিনা। তাই বাধ্য হয়ে তারা ওই লাশগুলোও নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে আসে।
খায়রুন্নেসার তখন চলার শক্তি নেই। বেঁচে থাকা মানুষগুলো একমত হয়, আর গ্রামে থাকা সম্ভব হবে না। রওনা হয় ভারতের দিকে। কিন্তু খায়রুনের হাঁটার শক্তি নেই। ততক্ষণে রক্তক্ষরণে তিনি বসতেও পারছিলেন না। দরজার পাল্লা খুলে তাকে তাতে শোয়ানো হয়। তিনজন তাকে কাঁধে করে নিয়ে যায় ভারতে। অসুস্থ খায়রুনের জায়গা হয় শরণার্থী ক্যাম্পে। ওখানেই যুদ্ধকাল কাটিয়ে দেন। স্বাধীনতা লাভের পর দেশে ফিরেন খায়রুন। সে কী কষ্ট! জীবন চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। মড়ার ওপর খাড়ার ঘা হিসেবে জুটে অপবাদ। সব সহ্য করে পড়ে থাকেন কয়েক বছর। তার কথায়, শেখ সাব যখন সংগ্রাম করছিল তখনতো গ্রামে আর্মি এসেছিল, তাদের হাতে তো জীবনের সর্বস্ব হারিয়েছিলেন তিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন শেখসাবকে মেরে ফেললো, তখনো আরেকটা সংগ্রাম হয়েছিল। সেটা ছিল কাদেরিয়া বাহিনীর সংগ্রাম। ওই সময়ই তিনি আবার গ্রাম ছাড়েন। এবার আর ভারতে নয়। চলে এলেন ঢাকায়। কিন্তু ঢাকায় তো তার থাকার জায়গা নেই। রাস্তায় রাস্তায় কাটিয়ে দেন কয়েকদিন। একসময় একজন তাকে তোলে নেয় নিজের বাসায়। কাজ দেন বাসায়।
তারপর কেটে যায় প্রায় ৩৫ বছর ঢাকাতেই। বার্ধক্য ভর করেছে তার। বড় শখ জাগে মৃত্যুর পর যেন তার দাফন হয় নিজ গ্রামে। গ্রামের মানুষের জানাজা পাননি তার স্বামী। অন্তত তিনি যেন বঞ্চিত না হন গ্রামের মানুষের জানাজা থেকে। কিন্তু কে দেবে তাকে আশ্রয়? শেষ পর্যন্ত ভাইয়ের ছেলে তাকে কাছে টেনে নেন। নিজের ঘরের বাইরে একটু চাল বাড়িয়ে খায়রুনের থাকার জায়গা করে দেন। ফুপুকে আশ্বস্ত করেন, দুমুঠো খাবারেরও ব্যবস্থা করেন।
খুব একটা সচল নয় ভাইয়ের ছেলে। তারপরও আগলে রেখেছেন ফুপুকে। খায়রুন অপেক্ষা করছেন, কবে ডাক আসবে ওপার থেকে। একাত্তরের সেই স্মৃতি তাকে উৎকণ্ঠিত করলেও ভাবেন, নিজের এলাকায় দাফনের সম্ভাবনাটাতো তৈরি হলো।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








