নড়াইল থেকে ফিরে: এক সময় বল হাতে দুরন্ত গতিতে ছুটেছেন মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। পেয়েছেন নড়াইল এক্সপ্রেস তকমা। হাঁটুর চোট কেড়ে নিয়েছে গতি। তবুও দমে যাননি। বোলিংয়ে নানা বৈচিত্র্যের সম্মিলন ঘটিয়ে খেলে যাচ্ছেন এখনও। মাঠের এ অদম্য নায়ক মাঠের বাইরে দুরন্ত গতিতে ছুটছেন নিজের গড়া ফাউন্ডেশন নিয়ে।
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন গঠনের মাধ্যমে নিজ জেলা ও জেলার মানুষের সর্বাঙ্গীণ উন্নয়নে কাজ করছেন মাশরাফী। এ উদ্যোগের সাথে একাত্ম প্রশাসন থেকে শুরু করে নড়াইলের সর্বস্তরের মানুষ। ফাউন্ডেশনের জন্য সব সদস্যই কাজ করে যাচ্ছে অত্যন্ত আন্তরিকতায়।
নড়াইলকে বদলে দেয়ার মিশনে প্রয়োজনীয় সকল বিষয় নিয়ে কাজ করছে ফাউন্ডেশনটি। এর মধ্যে খেলাধুলা, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক কাজের অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি। নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের অধীনে ক্রিকেট, ফুটবল ও ভলিবলের তরুণ প্রতিভা বাছাই শেষে শুক্রবার বিকেলে নড়াইল সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় মাঠে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের উদ্বোধন করা হয়। উপস্থিত ছিলেন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মাশরাফী।

এক মাসে জেলার প্রতিটি ইউনিয়ন, পৌর এলাকাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে খেলোয়াড় বাছাই করা হয়েছে। প্রায় ৪০০০ খেলোয়াড় থেকে ফুটবলে ৭৮, ক্রিকেটে ১০৪ এবং ভলিবলে ৭০ জনকে নির্বাচিত করা হয়েছে। দ্রুতই শুরু হয়ে যাবে ক্যাম্প। আগামী তিন বছর খেলোয়াড়দের খরচ বহন করবে আইপিডিসি ফাইন্যান্স লিমিটেড। সম্প্রতি নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের সাথে তিন বছর মেয়াদী একটি চুক্তি করে কোম্পানিটি।
প্রতিভাবানরা যাতে ঢাকায় এসে খেলতে পারেন সে জন্য ক্রিকেট ও ফুটবলের দ্বিতীয় বিভাগ লিগের একটি করে ক্লাব কিনবে নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নড়াইলে নিজেরে বাড়িতে ফাউন্ডেশনের মিটিংয়ে এ ঘোষণা দেন মাশরাফী। ভলিবলের আসরেও নড়াইলের খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ বাড়ানো হবে বলে জানান মাশরাফী। নড়াইলে ভলিবলের প্রেরণা বাংলাদেশ ভলিবল দলের অধিনায়ক হরসিত বিশ্বাস।
মাশরাফী জানান নড়াইলের খেলোয়াড়দের জন্য আইপিডিসি দেবে জিমের আধুনিক ও উন্নত সরঞ্জাম। এমন সরঞ্জামে সমৃদ্ধ জিম বাংলাদেশে দু-তিনটির বেশি নেই। যার একটি মিরপুরে জাতীয় দলের জিম যেটি। জিমের সরঞ্জাম কোথায় বসাবেন সেটির জন্য জায়গা নির্বাচনের কাজ শুরু করেছে নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন।

নড়াইল হবে প্রজন্মের অন্যতম সেরা বাসস্থান’এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কাজ শুরু করে এই ফাউন্ডেশন। তরিকুল ইসলাম অনিককে জেনারেল সেক্রেটারি করে ১৯ সদস্যের একটি নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। শুরুতেই নড়াইলের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির জন্য রংপুর রাইডার্স কাছ থেকে অ্যাম্বুলেন্স নেন মাশরাফী। এরপর অল্প সময়ের ব্যবধানেই নড়াইলবাসীর সমন্বিত প্রচেষ্টায় কেবল এগিয়ে গেছে ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম।
বহুজাতিক ও আন্তর্জাতিক মান স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থাইরোকেয়ার এর সাথে চুক্তি হয়েছে। এর ফলে অর্ধেক খরচে ৪০০ এর অধিক রক্ত পরীক্ষা করার সুবিধা পাবে নড়াইলবাসী। চিকিৎসা সেবাকে এগিয়ে নিতে দেশের স্বনামধন্য ক্লিনিক ও ডায়াগনোসিস সেন্টার ‘প্রেসক্রিপশন পয়েন্ট’এর মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী চলতি মাস থেকে প্রেসক্রিপশন পয়েন্ট এর বনানী ও বাড্ডা শাখায় ৫০% ছাড়ে সকল ধরনের স্বাস্থ্য সেবা দেবে।
নড়াইলের গরীব মেধাবি ছাত্র-ছাত্রী যাদের ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই এমন ১১০টি পরিবারের জন্য সোলার লাইটের ব্যবস্থা করবে ফাউন্ডেশন। ইতিমধ্যে প্যানাসনিক কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়ে গেছে। কাদের দেয়া হবে করা হচ্ছে সেই তালিকা ।
মেধাবীরা যাতে উচ্চশিক্ষা নিতে পারে সেজন্য একাধিক বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি করেছেন নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন। আগামী ২০ বছর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল মেধাবীদের বিনামুল্যে পড়ার সুযোগ করে দেবে।
নড়াইলের জনবহুল তিন এলাকা নড়াইল শহর, লোহাগড়া ও রূপগঞ্জে বসানো হবে তিনটি পাবলিক টয়লেট। নারী-পুরুষ আলাদা টয়লেটের ডিজাইনও হয়ে গেছে। নড়াইলকে পরিচ্ছন্ন রাখতে ১০০টি ডাস্টবিন বসানো হবে। ডাস্টবিন তৈরির কাজও প্রায় শেষ। এটি বসলে যত্রতত্র ময়লা ফেলা থেকে বিরত থাকবে নড়াইলের মানুষ।

নড়াইল এক রাস্তার শহর। এই রাস্তা যাতে চার লেনের হয় সে জন্য কাজ করছে ফাউন্ডেশন। ইতিমধ্যেই স্থানীয় প্রশাসন রাস্তা প্রসারিত করারও উদ্যোগ নিয়েছে।
মাশরাফীর বাবা গোলাম মোর্ত্তজা বলেন, ‘স্বনামধন্য ইঞ্জিনিয়ার, এলজিইডি, রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে, পিডব্লিউইডি সকলে মিলে জেলা প্রশাসকের কক্ষে আমরা মিটিং করেছি। তাদের আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা শুনেছি। নড়াইলকে বাসযোগ্য করতে হলে যত্রতত্র বাড়ি করলে হবে না। তারা কথা দিয়েছে বাড়ি তৈরির ব্যাপারটি পরিকল্পনার মধ্যে আনবে। এজন্য কমিটি করা হয়েছে।’
রাস্তার দুই পাশে দোকানের সামনে যাতে সারিবদ্ধভাবে গাছ লাগানো হয় সেজন্য মার্কেট মালিকদের সঙ্গে কথা বলে গাছ লাগিয়ে দেবে ফাউন্ডেশন।
খুলনা বিভাগের ছোট একটি জেলা শহর নড়াইল। চিত্রা নদীর পাড়ের শহরটির কথা শোনেননি এমন মানুষ পাওয়া কঠিন। বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফী ছোটবেলায় এই নদীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাতার কাটতেন সে কথা সবারই জানা। চিত্রা নদীর জন্য এখনও তাই বিশেষ এক আবেগের নাম। কিন্তু একটু একটু করে নদীর পাড় দখল হতে শুরু হওয়ায় নদীর সৌন্দর্য আর আগের মতো চোখ কেড়ে নেয় না। প্রশাসনের সহায়তায় নদী পুনরুদ্ধারে কাজ করে যাচ্ছে নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নড়াইলের নানা শ্রেণীর সুবিধাবঞ্চিত মানুষদেরকে সহযোগিতার জন্য ‘নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন’ আয়োজন করেছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ‘কনসার্ট ফর দ্যা হেল্পলেস’। সেখান থেকে প্রাপ্ত ৬ লাখ টাকা সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের প্রদান করে ফাউন্ডেশন।
নড়াইল শহরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে একটি সাইনবোর্ড-ভিক্ষুকমুক্ত শহর। প্রশাসন ও স্থানীয়দের উদ্যোগে এটি করা হয়েছে আরও আগেই। যারা সত্যিকার অর্থেই অসহায় তাদের করা হয়েছে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। ফাউন্ডেশনের লক্ষ্যের সঙ্গে দারুণভাবে মিশে গেছে নড়াইলের জনগণ।

ফাউন্ডেশন নিয়ে মাশরাফীর স্বপ্ন অনেক বড়, ‘একদিন অন্য জেলাগুলো সব দিক থেকে নড়াইলের উন্নতি দেখে হিংসা করুক। যার যার নিজ জেলার উন্নতিতে কাজ করুক। এভাবে একদিন হয়ত পুরো দেশটাই পাল্টে যাবে। স্বপ্ন বড় করেই দেখা উচিত। আমার স্বপ্ন এ ফাউন্ডেশন আন্তর্জাতিক মানের হবে। ওভাবেই সব কার্যক্রম চলছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন আর্থিক সাহায্য করে পাশে থাকতে চাচ্ছে। কিন্ত আমরা অর্থ নিচ্ছি না। ফাউন্ডেশনের কাজে একেকেজন একেকটা দায়িত্ব নিলেই হয়। কেউ হয়ত ব্যাট-বল-প্যাড দিচ্ছে কেউ হয়ত চিকিৎসা সেবা দিবে। এভাবেই চলবে কার্যক্রম।’
‘নড়াইল-এক্সপ্রেস’ নামটা কারও কাছেই অপরিচিত নয়। দেশের ক্রিকেটের সীমানা পেরিয়ে এই নাম পৌঁছে গেছে ক্রিকেট বিশ্বে। এবার পালা ‘নড়াইল-এক্সপ্রেস’ ফাউন্ডেশনের।







