কয়েক বছর আগেও যিনি ছিলেন প্রবাসী শ্রমিক, সেই তিনি এখন বাংলাদেশের ‘ফার্স্ট ক্লাস’ ক্রিকেটার। মুন্সিগঞ্জের সালাউদ্দিন শাকিলের এই উঠে আসার কাহিনীটা রূপকথাকেও হার মানায়।
‘প্রতিদিন ভোর চারটা থেকে আমরা কাজে বের হতাম,’ শাকিল ক্রিকইনফোকে শুনিয়েছেন ফেলে আসা সেই দিনগুলোর কথা, ‘রান্না করা ভাত পলিথিনে রাখতে হতো। মরুভূমির ঝড়ের কারণে প্লেটে করে খেতে পারতাম না। বাতাসের সঙ্গে ভাত উড়ে যেত। কখনো কখনো তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রিতে উঠে যেত। তরকারি নষ্ট হয়ে যেত।’
শাকিলের ওই ‘নষ্ট পথ’ গত সপ্তাহে মোড় নিয়েছে ভিন্ন বাঁকে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সেন্ট্রাল জোনের হয়ে অভিষেক হয়েছে এ বাঁহাতি পেসারের।
সাউথ জোনের বিপক্ষে নিজের প্রথম ম্যাচে ৫০ রান দিয়ে দুই উইকেট নেন। এরমধ্যে ছিল ইমরুল কায়েসের উইকেট। আবু হায়দার রনির সঙ্গে নতুন বলে শুরু থেকে তাকে আক্রমণে আনেন রিয়াদ।

যে রিয়াদকে টিভিতে দেখেছেন, সেই তাকে অধিনায়ক হিসেবে পেয়ে শাকিলের কাছে সবকিছু স্বপ্ন মনে হয়, ‘রিয়াদ ভাইকে আগে শুধু টিভিতে দেখেছি। এখন তিনি কী সুন্দর করে আমার সঙ্গে কথা বলছেন। আমার অধিনায়ক। নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়।’
২৮ বছর বয়সী শাকিল ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেটাঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চোখে পড়েছেন। বছরের শুরুতে ফতুল্লায় নেটে বল করার সময় কোচ মিজানুর রহমানের চোখে পড়েন। তারপর মিজানুর রহমানের প্রাইম দোলেশ্বরের হয়ে লিস্ট এ ক্রিকেটের পাঁচটি ম্যাচ খেলেন। ওই মিজানুর রহমানই শাকিলকে সেন্ট্রাল জোনের হয়ে খেলার ব্যবস্থা করিয়ে দেন।
মরুভূমির কঠিন জীবন থেকে যেভাবে শাকিলের মুক্তি মেলে
২০০৬ সালে শাকিলের এএসসি পরীক্ষা ছিল। মুন্সিগঞ্জে বেড়ে ওঠা তরুণের সেই পরীক্ষা দেয়া হয়নি। পরিবারকে একটু ভালো রাখার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেন।
‘আমি ঢালাইয়ের কাজ জানতাম। কিন্তু আমাকে স্টিলের কাজ করতে মরুভূমিতে পাঠানো হয়। ওই জীবন থেকে মুক্তি পেতে সব সময় আল্লাহকে ডাকতাম,’ বলছিলেন শাকিল।
শাকিলের মুক্তি মেলে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায়। বাধ্য হয়ে তার প্রতিষ্ঠান চার বছর বাদে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়। দেশে ফিরে আর বিদেশে যাননি। প্রবাসে থাকার সময়ে কখনো ব্যাট-বল হাতে না নেয়া শাকিল বাড়ি ফিরে শৈশবের মতো টুকটাক টেপ-টেনিস খেলতে শুরু করেন।
তখন ২০১২ সাল। এক বন্ধু শাকিলকে নিয়ে কোচ গোলাম রসুলের কাছে যান। নারায়ণগঞ্জে তিনি একটি অনুশীলন ক্যাম্প করছিলেন। কয়েক মাস বাদে তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেটে খেলা শুরু করেন শাকিল। পরের মৌসুমে দ্বিতীয় বিভাগে সুযোগ পান।
এই সুযোগ পাওয়াটাও শাকিলের জন্য সহজ ছিল না, ‘মনে আছে ২০১৪ সালে একটি ক্লাবে ট্রায়াল দিতে গেলে সবাই হাসছিল। আমার কিছুই ছিল না। বন্ধু মেহরাব হোসেন জোশি একজোড়া বুট দিয়েছিল বল-ব্যাট করার জন্য। সে সবাইকে বলে আগে নেটে আমার খেলা দেখতে, তারপর বিচার করতে। ভাগ্য ভালো আমি ভালো করেছিলাম।’
শাকিল এরপর একদিন ফতুল্লায় দোলেশ্বরের অনুশীলনে নেটে বল করতে আসেন। সেখানেই পরিচয় হয় বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কোচ মিজানুর রহমানের সঙ্গে।
‘তার শারীরিক গঠন আর বলের গতি আমার পছন্দ হয়েছিল। এখনো হয়তো সে নিখুঁত বোলার হয়ে ওঠেনি। কিন্তু আমার মন বলছে সুযোগ পেলে সে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ক্রিকেটার হবে’ -মন্তব্য মিজানুরের।
গত সপ্তাহে রাজশাহীর ঘাসের উইকেটে শাকিলের বোলিং দেখেন জাতীয় নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন। তিনিও সাকিলকে দেখে মুগ্ধ।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার এক জরিপ অনুযায়ী, ১৯৭৬ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৮.৮ মিলিয়ন শ্রমিক বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করতে গেছেন। ওই প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, প্রতি বছর ফিরে আসা শ্রমিকদের অধিকাংশ শারীরিক এবং মানসিকভাবে দুর্বল।
শাকিল ব্যতিক্রম। তিনি ভেঙে পড়েননি। ক্রিকেটের প্রতি গভীর ভালোবাসা তাকে নতুন জীবনের সন্ধান দিয়েছে। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এমন ‘সন্ধানে’র গল্প বিরল।
ক্রিকইনফো অবলম্বনে







