মায়ের বদনখানি সেদিন মলিন হয়েছিলো বৈকি! আর শুধু মলিনই বা বলছি কেন? বাংলা মায়ের মুখ সেদিনের চেয়ে ভারাক্রান্ত ও অশ্রুসজল আর কখনও যে কেউ দেখেনি! সন্তান হারানোর বেদনা, সম্ভ্রম হারানোর যন্ত্রণায়, বেদনাবিধুর ও অশ্রুসিক্ত মা আমার! পিশাচেরা মায়ের কোল খালি করে সন্তানের জীবন কেড়ে নিচ্ছিল! তরুণী, যুবতী, কুলবধূ কেউ নিস্তার পায়নি সেদিন হায়েনার থাবা থেকে! শকুনেরা একাত্তরে দেশের মাটি খামচে ধরেছিলো, ছিন্নভিন্ন করেছিলো মায়ের হৃৎপিন্ড! পিশাচদের কালোহাত রুখে দিতে সেদিন সোচ্চার হয়েছিলো, একাট্টা হয়েছিলো, মায়ের দামাল ছেলেরা। তাঁরা শুধু নয়ন জলে ভাসিয়ে মাকে সান্তনা দেয়নি, বিস্ফোরিত রক্তচক্ষু দিয়ে মায়ের সম্মান রক্ষা করেছিলো সেদিন!
সহস্র বাধা পেরিয়ে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের জন্য ছিনিয়ে এনেছিলো লাল সূর্য। সবুজ জমিনের উপরে লাল সূর্য আঁকা সেই পতাকাটির কথা বলছি। কারো দয়ার দানে আমরা স্বাধীনতা পাইনি, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে ওটি আমাদের কষ্টার্জিত অহংকার!
তবে দূরদৃষ্টির অভাবে সে অর্জন আমরা রক্ষা করতে পারিনি। ১৯৭২ এর ১৬ই ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৫ এর ১৫ই আগষ্ট, এই স্বল্পতম সময়ের মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে রাতারাতি পাল্টে দিলো বাংলাদেশের রাজনীতি এবং রাষ্ট্রনীতির দৃশ্যপট। পরবর্তী দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে স্বাধীন বাংলায় কত কিনা দেখলাম আমরা!
বন্দুকধারী জিয়া-এরশাদ দেশের রাজা হলো, রাজাকার শাহ আজিজ হলো প্রধানমন্ত্রী, গোলাম আজম ফিরে পেল বাংলাদেশের নাগরিকত্ব, কুখ্যাত সব দেশদ্রোহী ও রাজাকার নিজামী-মুজাহিদ-সালাউদ্দিন কাদেরদের গাড়িতে লাল সবুজের পতাকা পতপত করে উড়লো, আরো কতসব অপদৃশ্য! আজ সময় বদলেছে।
শতসহস্র বিপত্তি পেরিয়ে একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধের জন্য ইতিমধ্যেই ফাঁসিতে ঝুলেছে জামায়াত নেতা রাজাকার কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামান। যুদ্ধাপরাধের গ্লানি মাথায় নিয়ে জেলের মধ্যেই মৃত্যু হয়েছে গোলাম আজমের, আমৃত্যু যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ওরফে দেইল্যা রাজাকার জেলের মধ্যে পচছে। আরো দুই কুখ্যাত রাজাকার মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদেরের ফাঁসির রায় চূড়ান্ত, যে কোনো সময়ে তা কার্যকরের অপেক্ষায়।
মতিউর রহমান নিজামি’র ফাঁসির আদেশ হয়েছে, বিচারিক প্রক্রিয়া চলছে আরো নরঘাতক সব অপরাধীদের। জাতি যেন আজ অনেকটাই ভারমুক্ত। রাজাকারদের বিচারের এই রায় ও তা বাস্তবায়নের চলমান প্রক্রিয়ায় যেন বাংলার সকল আম্রকানন মুকুলিত হয়েছে।
স্বাধীনতার চেতনা যেন মৌ মৌ গন্ধে সুবাসিত চারিদিক। জাতীয় সংগীতের সেই চরণটি আজ গলা খুলে গাইতে ইচ্ছা হচ্ছে, “ওমা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে”।
হে অনাগত শিশু, আমরা বোধকরি তোমাদের জন্য রেখে যেতে পারলাম রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ। হয়তো তোমাকে আর পড়তে হবে না মুক্তিযুদ্ধের ভ্রান্ত ইতিহাস, আর হয়তো দেখতে হবে না রাজাকার-মন্ত্রীর গাড়িতে লাল সবুজের পতাকা। হয়তো তোমাকে আর শুনতেও হবে না দেশবিরোধীর মুখে দেশপ্রেমের কথা। তুমি নিশ্চয়ই সক্ষম হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপরে দাঁড়িয়ে সোনার বাংলা বিনির্মাণ করতে। চাঁদনিপসর রাতের দক্ষিণা হাওয়ায়, খোলা গলায় তুমি নির্ভয়ে গাইবে, “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি”।
(এ
বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর
সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






