ভাবতেই ভাল লাগছে হেনরি কিসিঞ্জার বেঁচে আছেন, আর তার দেশে থেকেই উৎক্ষেপণ হল “বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট” বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ। বাংলাদেশের মাথায় একটা সোনার পালক। অনেকের অবাক দৃষ্টির সামনে বাংলাদেশের গর্বিত নাম। হেনরি কিসিঞ্জার কি ভাবতে পেরেছিলেন যে তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করে জন্ম নেওয়ায় তিনি যে দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলেছিলেন সেই দেশের স্যাটেলাইট উড়বে মহাকাশে!
১৯৭২ থেকে ২০১৮, ৪৬ বছর। পথ দীর্ঘ আর বন্ধুর, সেই পথ পাড়ি দিয়ে তথাকথিত বটমলেস বাস্কেট আজ নিজস্ব উপগ্রহ মহাকাশে পাঠাল। হেনরি কিসিঞ্জার আপনি কি শুনেছেন বা দেখেছেন! পৃথিবীর ১৯৫টি অফিসিয়াল দেশের মধ্যে ৫৭তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উপগ্রহ উৎক্ষেপণ হয়েছে, শুরু হয়েছে বাংলাদেশের মহাকাশ যাত্রা, আপনারই দেশের মাটি থেকে।
জার্মান-বংশোদ্ভূত আমেরিকান শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক বিজ্ঞানী, কূটনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী। তার পুরো নাম হেঞ্জ আলফ্রেড হেনরি কিসিঞ্জার। ১৯৭২ সালে যুদ্ধপরবর্তী বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে অভিহিত করেছিলেন। ১৯৬৯-১৯৭৪ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড সরকারদ্বয়ের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মেয়াদ শেষ হলেও আজ অবধি অনেক প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এবং বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে তার মতবাদ সম্পর্কে বক্তব্য প্রদান করতে দেখা যায়। ৯৪ বছর বয়সী হেনরি কিসিঞ্জারের জীবিতবস্থায় বাংলাদেশের উপগ্রহ উৎক্ষেপণ আনন্দের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিলো।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ (বিএস-ওয়ান) বাংলাদেশের প্রথম ভূস্থির যোগাযোগ উপগ্রহ। বিএস-১ মূলত যোগাযোগ ও সম্প্রচার স্যাটেলাইট। মহাকাশে প্রায় ৫০টির উপর দেশের দুই হাজারের উপর স্যাটেলাইট রয়েছে। এগুলোর মধ্যে আবহাওয়া স্যাটেলাইট, পর্যবেক্ষক স্যাটেলাইট, ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট ইত্যাদি। টিভি চ্যানেলগুলোর স্যাটেলাইট সেবা নিশ্চিত করাই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের প্রধান কাজ। এর সাহায্যে চালু করা যাবে ডিটিএইচ বা ডিরেক্ট টু হোম ডিশ সার্ভিস।
এছাড়া যেসব জায়গায় অপটিক কেবল বা সাবমেরিন কেবল পৌঁছায়নি সেসব জায়গায় এ স্যাটেলাইটের সাহায্যে নিশ্চিত হতে পারে ইন্টারনেট সংযোগ।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের অবস্থান ১১৯.১ ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমার কক্ষপথে। এর ফুটপ্রিন্ট বা কভারেজ হবে ইন্দোনেশিয়া থেকে তাজিকিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত। শক্তিশালী কেইউ ও সি ব্যান্ডের মাধ্যমে এটি সবচেয়ে ভালো কাভার করবে পুরো বাংলাদেশ, সার্কভুক্ত দেশসমূহ, ফিলিপিন্স এবং ইন্দোনেশিয়া।
১৫ বছরের জন্য রাশিয়ার কাছ থেকে অরবিটাল স্লট ভাড়া নেওয়া হয়েছে। তবে বিএস ওয়ানের স্থায়িত্ব হতে পারে ১৮ বছর পর্যন্ত।
৩.৭ টন ওজনের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটির ডিজাইন এবং তৈরি করেছে ফ্রান্সের কোম্পানি থ্যালাস অ্যালেনিয়া স্পেস। যুক্তরাষ্ট্রের স্পেসএক্স’র তৈরি ফ্যালকন-৯ রকেটের ব্লক ৫ সংস্করণ বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটকে মহাকাশের জিওস্টেশনারি ট্রান্সফার কক্ষপথে নিয়ে গেছে। উৎক্ষেপণ হয়েছে ফ্লোরিডার কেইপ কেনাভেরালের কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চপ্যাড থেকে।
আর্থ স্টেশন থেকে ৩৫ হাজার ৭৮৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে স্যাটেলাইটটির কক্ষপথে যেতে সময় লাগবে ৮-১১ দিন। আর পুরোপুরি কাজের জন্য প্রস্তুত হবে এক মাসের মধ্যে।
এরপর প্রথম ৩ বছর থ্যালাস অ্যালেনিয়ার সাহায্যে এর দেখাশোনা করবে বাংলাদেশ। পরে পুরোপুরি বাংলাদেশী প্রকৌশলীদের হাতেই গাজীপুর ও রাঙামাটির বেতবুনিয়া আর্থ স্টেশন থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক জানান, “বর্তমানে বাংলাদেশের সবগুলো টিভি চ্যানেল তাদের সম্প্রচারের জন্য বিদেশি স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীল। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপনের পর টিভি চ্যানেলগুলোর বিদেশ নির্ভরতা যেমন কমে আসবে তেমনি সাশ্রয় হবে মহামূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা।
“আমরা আমাদের দেশের সকল টিভি চ্যানেলের চাহিদা মিটিয়ে আমাদের স্যাটেলাইট অন্যান্য দেশের টিভি চ্যানেলের জন্য ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রাও আয় করতে পারব। আমাদের স্যাটেলাইটে মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার রয়েছে। আমাদের বর্তমানে যে চাহিদা রয়েছে তা পূরণ করেও আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে যে, অনন্ত ২০টি ট্রান্সপন্ডার বিদেশিদের জন্য ভাড়া দেব।”
স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ অনেকের কাছে তেমন গুরুত্ববহন করবে না, কারণ বর্তমান সময়ে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যে সুবিধা পাওয়া যাবে তা কমবেশি সবাই ভোগ করছে। কিন্তু আমাদের কাছে এর গুরুত্ব অসীম কারণ বিএস-১ আমাদের নিজের। অনেক দাম্ভিক দেশের কাছে আমাদের মাথা উঁচু হওয়া। হেনরি কিসিঞ্জারদের মতো ব্যক্তিদের জন্য উপযুক্ত জবাব। ভাড়াটিয়া জীবনের শেষ। স্যাটেলাইট নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলবে। চলুক। সেই সাথে চলুক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পর যে সুবিধাপ্রাপ্ত হবে তার সঠিক ব্যবহার। এটা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে কুক্ষিগত হয়ে গেলে স্যাটেলাইট নিজের হয়ে লাভ হবে না, শুধু নামেই থাকবে।
দেরিতে হলেও আমাদের একান্ত নিজের স্যাটেলাইট হবার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আপনার হাত ধরে দেশ মহাকাশের পথে পাড়ি দিবে। আগামী দিনগুলিতে আরো স্যাটেলাইট মহাকাশে ভাসুক। আমাদের আনন্দিত হবার আরো কারণ আসুক। আমরা সাধারণ জনগণ আর কিছু না পেলেও আনন্দিত হলেই খুশী, দেশের নাম উজ্জ্বল হলে, না পাওয়ার সব বেদনা ভুলে যাই হাসি মুখে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







