বিসিবির সাবেক প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ মনে করেন জাতীয় দলে নতুনদের অভিষেকের উপযুক্ত মঞ্চ হল অনুকূল কন্ডিশন। প্রতিকূল কন্ডিশনে অনেক তরুণ ক্রিকেটারের অভিষেক হতে দেখে হতাশা প্রকাশ করেছেন সাবেক এ অধিনায়ক।
চ্যানেল আই অনলাইনের নিয়মিত ফেসবুক লাইভ অনুষ্ঠান কথাবার্তা’য় মঙ্গলবারের অতিথি ছিলেন ফারুক আহমেদ। আলোচনায় তরুণদের অভিষেক প্রসঙ্গে বললেন, ‘তরুণ ক্রিকেটারদের বিচ্ছিন্নভাবে সুযোগ দেয়া হচ্ছে। যেটি হতে পারে ক্ষতির কারণ। নতুন কাউকে হোম সিরিজে সুযোগ দেয়া উচিত। অনুকূল কন্ডিশনে ভালো খেলে যেন আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে নিতে পারে।’
বয়সভিত্তিক দল থেকেই নির্বাচকদের রাডারে ছিলেন নাজমুল হোসেন শান্ত। অনূর্ধ্ব-১৯ দল, ঘরোয়া লিগ, ‘এ’ দলে দুর্দান্ত পারফর্ম করেই জাতীয় দলের ঠিকানা পেয়েছেন এ বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। নিউজিল্যান্ড সফরে তিন ক্রিকেটার চোটে পড়লে অচেনা কন্ডিশনেই হয়েছিল শান্তর টেস্ট অভিষেক।
তার দুই বছর পর ওয়ানডে অভিষেক হল মরুর বুকে এশিয়া কাপের বড় মঞ্চে। সুযোগ পেয়ে তেমন কিছুই করতে পারেননি অপার সম্ভাবনাময় এ তরুণ। উদ্বোধনীতে নেমে তিন ম্যাচে করেছেন মাত্র ১৯ রান। দুই অঙ্ক ছুঁতে পারেননি কোনো ম্যাচেই। রানে ফিরতে না পারলে হয়তো জাতীয় দল থেকে ছিটকেই পড়তে হবে তাকে। তেমন কিছু ঘটলেও সম্ভাবনাময় এ ব্যাটসম্যানকে আগলে রাখতে বলছেন ফারুক।

‘তরুণদের জাতীয় দলে সুযোগ গুরুত্বসহকারে দেয়া উচিত। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে সুযোগ দেয়া হচ্ছে। শান্তকে দেখলাম, তার ডেব্যু হল কঠিন জায়গায়, নিউজিল্যান্ডে। তরুণদের অভিষেকের উপযুক্ত জায়গা হোম সিরিজ। কিংবা সহজ জায়গা, অনুকূল কন্ডিশনে হতে হবে। যে ধরনের উইকেটে খেলে অভ্যস্ত সে ধরনের উইকেট যেন পায়। সেটার জন্য ভুগছি। শান্ত ভালো ব্যাটসম্যান। তাকে নিয়ে বোর্ড যেন আলাদা করে কাজ করে। ট্যালেন্ট প্রতিদিন জন্মায় না। তাকে গড়ে তুলে যেন কাজে লাগাতে পারি। কখন, কীভাবে কাজে লাগাতে পারি সেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’
শুধু শান্ত নয়, ফারুক আহমেদ মনে করেন এশিয়া কাপে অনেক তরুণ ক্রিকেটারই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি, ‘তামিম চলে আসার পর মনে করেছিলাম নতুনরা সুযোগটা লুফে নেবে। সেক্ষেত্রে আমাদের দুর্ভাগ্য বলব। শান্ত এখনও তেমন কিছু দেখাতে পারেনি। ওপেনিংয়ের জন্য যে কারণে আমরা দুজনকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছি। সবমিলিয়ে হতে পারত, এশিয়া কাপটা ইয়াং স্টারদের। তবে এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি। সম্ভবত কাল সেমিফাইনাল। জিতলে ফাইনাল, সামনে দুটি ম্যাচ।
ইমরুল কেনো আগে গেল না?
তামিম চোট নিয়ে ফিরে আসার পরও বাড়তি ওপেনার যোগ করেনি বাংলাদেশ। নাজমুল হোসেন শান্ত ও লিটন দাস দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবেন, ভাবা হচ্ছিল এমনই। কিন্তু তাদের ব্যর্থতায় টুর্নামেন্টের মাঝপথে গিয়ে হঠাৎ দলে ডাক পান ইমরুল কায়েস ও সৌম্য সরকার। তামিমের মতো অভিজ্ঞ একজন ছিটকে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেনো আরেক অভিজ্ঞ ক্রিকেটারকে দলে নেয়া হল না সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ফারুক আহমেদ। তিনি মনে করেন দূরদৃষ্টির অভাব রয়েছে বিসিবির।

‘যদি উড়ে যেতেই হবে প্রথম ফেসে ছিল না কেনো। দূরদৃষ্টির অভাব। আগেই খেলোয়াড় নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। মিঠুন অল্প ম্যাচ খেলেছে, শান্তর মাত্রই ডেব্যু হল। প্রায় তিন বছর পর মুমিনুল ফিরল। দলে অনেক অনভিজ্ঞতার ব্যাপার ছিল। তামিম যখন ইনজুর্ড হল, তখন কেনো ইমরুল গেল না। এটা নিয়ে আমার বিরাট প্রশ্ন। কেউ রান করছে না, তাই হুট করে দল বড় করে ফেললাম। উড়িয়ে নিয়ে গেলাম, এটা কাম্য না। পরের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল নয় প্রথমটা ভুল ছিল।’
দ্বি-স্তরবিশিষ্ট নির্বাচক দল নিয়ে ফারুকের প্রশ্ন
কথাবার্তার কমেন্ট বক্সে একজন দর্শক প্রশ্ন করেন ফারুক আহমেদকে আবারও প্রধান নির্বাচকের দায়িত্বে দেখা যাবে কিনা? জবাবে ‘না’ সূচক উত্তর দিয়েছেন এ সাবেক নির্বাচক, ‘এ মুহূর্তে চিন্তা করছি না ফিরে আসার। কারণ আমি ব্যবসা নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে গেছি। ওরকম সময় এখন নেই। যে কাজটা আমি যখন করার চেষ্টা করেছি পুরো হৃদয় দিয়ে করেছি, যাতে ম্যাক্সিমাম দেয়া যায়। ওই সময়টা আমার নেই। খুব ব্যস্ত আছি বিজনেস নিয়ে।’
প্রধান নির্বাচকের পদ থেকে কেনো পদত্যাগ করেছিলেন সে আভাসও দিয়েছেন ফারুক। বিসিবি দ্বি-স্তরবিশিষ্ট নির্বাচক দল করার পরপরই ছেড়েছিলেন দায়িত্ব, তার অখুশির কারণ পদ্ধতিটি নিয়েই।
‘যেকোনো একটা বিশেষ কারণেই তো আমি কাজটা ছেড়েছিলাম। এখনও বিশ্বাস করি দ্বি-স্তরবিশিষ্ট নির্বাচক দল ভালমত কাজ করছে না। এই পদ্ধতি কিন্তু কখনও লংটার্মে ভালো হবে না। এখনও বেশিরভাগ মানুষ জানে না সিলেকশন কীভাবে হচ্ছে। দুজন খেলোয়াড় গেল, এটারও কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা ছিল না। অধিনায়ক বলছে জানে না, সহ-অধিনায়ক জানে না, নির্বাচকরা কতটা জানে আমি জানি না। এই সিদ্ধান্তগুলো কে নিচ্ছে? এটার জন্য কৈফিয়ত দেয়ার মতো কেউ কিন্তু নেই। যদি ভালো খেলে বলবে আমি করেছি, খারাপ খেললে কাউকে পাওয়া যাবে না।’

‘ভালমত কাজ করতে চাইলে নির্বাচকদের পুরো দায়িত্ব দিতে হবে। এটা সরকারি চাকরি না, যদি কেউ না পারে তাকে সরানোর জায়গা আছে। সবাই ঘোরের উপর থাকে দল নির্বাচন কে করল। বোর্ড সভাপতি বুদ্ধি-পরামর্শ দেবে, নির্বাচক কমিটিতে সাবেক অধিনায়ক আছে দুই-তিনজন। কোচ আছে, ক্যাপ্টেন আছে। কিন্তু কাজটা বা সিদ্ধান্ত নিয়ে কিন্তু প্রধান নির্বাচকদের ব্যাখ্যা দিতে হবে। ভালো করলে তার খারাপ করলেও তার ব্যাখ্যা দিতে হবে।’ -যোগ করেন ফারুক আহমেদ।
নির্বাচক প্যানেল ও নির্বাচক কমিটি নাম নিয়ে বাংলাদেশ দলের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় চণ্ডিকা হাথুরুসিংহের সময়ে। দল নির্বাচনে কোচ, ম্যানেজারের ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দিতেই আবির্ভাব হয় অভিনব ওই নির্বাচক ফরম্যাটের। যেটি নতুন কোচ স্টিভ রোডস আসার পরও বলবৎ রেখেছে বিসিবি।
শুরুতে প্যানেলে ছিলেন সাবেক প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ, মিনহাজুল আবেদীন নান্নু ও হাবিবুল বাশার সুমন। এই তিনজনের সঙ্গে নির্বাচক কমিটিতে ছিলেন কোচ চণ্ডিকা হাথুরুসিংহে ও ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ সুজন। দল নির্বাচনের এ প্রক্রিয়ায় নির্বাচকদের কাজের স্বাধীনতা থাকে না বলে ২০১৬ সালের জুনে নির্বাচক কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন ফারুক আহমেদ।







