বাঙ্গালি সংস্কৃতি আর বর্ষবরণের ঐতিহ্যের সঙ্গে এক করে নেয়া পান্তা-ইলিশের আলোচনা এখন গণমাধ্যম আর সামাজিক মাধ্যমগুলোর অনেকটাই দখল করে নিয়েছে। সারা বছর ইলিশের খুব একটা খোঁজখবর না থাকলেও বছরের এই সময়টাই ইলিশ যেনো হয়ে ওঠে হীরার চেয়েও মূল্যবান, স্টারের চেয়েও বড় সুপারস্টার।
পহেলা বৈশাখ ঘনিয়ে আসলে ‘বৈশাখের ঐতিহ্য রক্ষায়’ যেনো ইলিশ কেনার ধুম পড়ে যায় সবার মাঝে। সময়টা ইলিশের প্রজনন মৌসুমের শেষের দিকে হওয়ায় এতোদিন বিভিন্ন সংগঠন বৈশাখে ইলিশ খাওয়া বন্ধ করার কথা বলে আসছিলো। সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে একই কথা।
সর্বশেষ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই বর্ষবরণে ইলিশ না খাওয়ার কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব জানান, ইলিশ বাঁচাতে এবারের পহেলা বৈশাখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খাদ্য তালিকায় ইলিশ রাখছেন না।
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষায় নববর্ষ আয়োজনে ইলিশ না রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ইলিশ ছাড়াই বর্ষবরণ উৎসব পালনের ঘোষণা দিয়েছে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। একইভাবে পহেলা বৈশাখে ইলিশ নিষিদ্ধ করেছে আরো কিছু প্রতিষ্ঠান।
গণমাধ্যমসহ
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এসব খবর ছড়িয়ে যাচ্ছে। ইলিশ কেনার পক্ষে-বিপক্ষে চলছে জোর আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক আর টকশো। তবুও ইলিশ কিনতে চায় মানুষ।
পান্তা-ইলিশ যে বর্ষবরণের অবিচ্ছেদ্য অংশ নয় এবং কীভাবে ইলিশ বৈশাখের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে, তা নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে এবং হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে চলছে পক্ষে-বিপক্ষে ঝগড়াঝাঁটি। কেউ বলছে ইলিশ ছাড়া বৈশাখ অসম্পূর্ণ, পান্তা-ইলিশ না হলে বর্ষবরণ জমে? কেউ আবার বলছে কিছুই আসে যায় না ইলিশ না খেলে। ওই একদিনই কেনো খেতে হবে ইলিশ তিন-চারগুণ দাম দিয়ে? কেউ আবার গঠনমূলকভাবে প্রজনন মৌসুমে ইলিশ নিধন রুখতেই এ বছর ইলিশ না খাওয়ার পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন।
বৈশাখে বাঙালির ‘ইলিশ উৎসবে’র কারণে বাজারে চার-পাঁচগুণ দাম হাঁকছে মাছ ব্যবসায়ী ও দোকানিরা। এটা প্রতি বছরের নিয়ম হয়ে দাঁড়ালেও এ বছর দামটা যেনো একটু বেশিই। এর অন্যতম প্রধান কারণ বৈশাখী বোনাস। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বৈশাখী ভাতা পেয়েছেন – এ অজুহাতে ইলিশের বাজারের উত্তাপ ছাড়িয়ে গেছে চৈত্রের দাবদাহকে।
ক্রেতার বাড়তি চাহিদাকে কেন্দ্র করে আকাশচুম্বী মুনাফা করছে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী। এখন আর বড় ইলিশ খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না বাজারে। দু’তিন দিন আগে পাইকারি বাজারেই ৩শ’ থেকে সাড়ে ৩শ’ গ্রামের যে ইলিশের হালি বিক্রি হয়েছে ৮শ’ থেকে ১ হাজার টাকায়, পহেলা বৈশাখের আগের দিন তা বিক্রি হচ্ছে ১৫শ’ থেকে ২ হাজার টাকায়। খুচরা বাজারে তো আরো বেশি।
অন্যদিকে সুপারশপগুলোতে ১ কেজি ওজনের ইলিশ ১৮শ` টাকা থেকে ২ হাজার টাকায়, ক্ষেত্রবিশেষে আরো বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এ নিয়ে সংবাদে সংবাদে গণমাধ্যমও গরম। তারপরও ইলিশ কেনার আগ্রহে ভাটা পড়ছে না।
তবে এবার শুধু চড়া দাম নয়, ক্রেতাদের ঠকাতে এসেছে নতুন পদ্ধতি: নকল ইলিশ! ইলিশের অতিরিক্ত চাহিদা আর সীমা ছাড়ানো দামের লোভে প্রায় ইলিশের মতোই দেখতে সামুদ্রিক সার্ডিন আর চৌক্কা মাছ ইলিশ নামে বিক্রি হচ্ছে দেদারসে। মাছ দু’টি স্বাদ ও গন্ধে ইলিশের ধারে কাছে না হলেও ক্রেতারা চেহারার পার্থক্য ধরতে না পেরে ইলিশ ভেবে বাড়তি দাম দিয়ে এসব মাছ কিনে ঠকছেন।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশে জাটকা ছাড়াও ইলিশের মতো বা কাছাকাছি দেখতে চাপিলা, সার্ডিন ও চৌক্কা পাওয়া যায়। স্থানীয় ভাষায় সার্ডিনকে টাকিয়া এবং চৌক্কাকে চৌক্কা ফ্যাঁইসা বা চটপটিও বলা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির নদীকেন্দ্র, চাঁদপুরের এক গবেষণায় বলা হয়, সার্ডিন মাছ অনেকটা আকারে জাটকার মতো হলেও চৌক্কা বেশ বড় হয়। লম্বায় অনেকটা ইলিশের কাছাকাছি। তবে ইলিশের চেয়ে চওড়ায় বেশ কম। সার্ডিন ও চৌক্কার চোখের আকার বড়। চৌক্কার মাথা লম্বাটে ও সূঁচালো। সার্ডিনের মাথা বড় ও সামনের অংশ ভোঁতা। মূলত সার্ডিনকেই ইলিশ বলে চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এমন ঘটনা প্রকাশের পর থেকে দেশের গণমাধ্যমগুলোর অন্যতম শীর্ষ খবরে পরিণত হয়েছে ‘নকল’ বা ‘ভুয়া’ ইলিশের বিক্রি। আমজনতার মধ্যে ফেসবুক-টুইটারে এই ‘ইলিশ ধোকা’র তীব্র সমালোচনা আর প্রতিবাদ হচ্ছে।
কিন্তু এতোকিছুর পরও থেমে নেই ইলিশ কেনা-বেচা। শেষ মুহূর্তে চড়া থেকেও চড়া দামে জনগণ রূপালি ইলিশ কিনতে ছুটছে বাজারে। বাড়ুক দাম, নিষেধ করুন প্রধানমন্ত্রী, বা তিনি নিজেই বৈশাখে ইলিশ খাওয়া বন্ধ করুন, এমনকি আসুক যতোই ভুয়া ইলিশ… তবুও কিন্তু ইলিশই চাই! টিভি, পত্রিকা, রেডিও, অনলাইন, ফেসবুক সবখানেই ইলিশের ছড়াছড়ি। তাই সবাইকে এ বছর ইলিশময় নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন অনেকে।










