পৃথিবীতে মানুষ আসে আবার চলে যায়। এই স্বল্পক্ষণে অন্যকে মনে রাখা খুব কঠিন ব্যাপার। মাসখানেক
অাগে শিক্ষক আমিনুল ইসলাম তার স্ট্যাটাসে জানিয়েছিলেন, ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক ছাত্র হলে সিট না পাওয়ায় শীতের রাতে বাইরে থাকতে
গিয়ে মারা গিয়েছে।
অনেকে হয়তো ঘটনাটি জেনেছিলো আবার সময়ের ঢেউও ভুলে গেছে।
তবে ভুলে যায়নি আমিনুল ইসলাম। ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন: ছেলেটা মারা
গেছে বেশ কিছু দিন হতে চললো। আমার ধারণা আমরা প্রায় সবাই ভুলতে বসেছি। আমি
যেহেতু এই নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম, তাই হয়তো পুরোপুরি ভুলতে পারিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ছাত্রের কথা বলছি। গরীব বাবার সন্তান মাত্রই গ্রাম থেকে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে।
মেসে থাকার টাকা নেই, হলে সিট মেলেনি। তখন মাঘ মাসের শীত। ছেলেটিকে থাকতে হচ্ছে হলের বারান্দায়। ভেতরে জায়গা হয়নি। তাও বারান্দায় থাকার ব্যবস্থা হয়েছে হলের “বড় ভাইদের” ধরে! সেই বড় ভাইদের কথা মতো জ্বরের মাঝেই শীতের রাতে সারা রাত দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে জ্বর মাথায় মিটিং এর জন্য! শেষমেশ আর না পেরে নিজের গ্রামের বাড়িতে ফিরে গিয়ে বাবাকে বলেছিলো ‘আমি মনে হয় আর বাঁচবো না’।
ছেলেটি আর বেশি দিন বাঁচেনি। কয়েকদিন পরেই মৃত্যু হয় ছেলেটির। মারা যাওয়া পর ছেলেটি যেই হলে থাকতো সেই হলের প্রভোস্ট’কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো ছেলেটির ব্যাপারে। তিনি বলেছিলেন, অনেক ছাত্রই তো হলের বারান্দায় থাকে, কই তারা তো কেউ মারা যাচ্ছে না। এই মন্তব্য পড়ে আমি লিখেছিলাম- মরে গিয়ে বরং ছেলেটিই অন্যায় করেছে!
হ্যাঁ, আমরা সেই দেশের নাগরিক, সেখানে দেশ সেরা ছাত্র-ছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থাকার জন্য হলে সিট না পেয়ে এবং আর্থিক অনটনের কারণে শেষ পর্যন্ত শুধু মাত্র হলে থাকার জন্য বড় ভাইদের কেনা গোলাম হয়ে যায়! অনেক সময় এর জন্য জীবনও দিতে হয়! আবার জীবন চলে গেলে শিক্ষকরা বলেন-কই অন্যরা তো মরেনি!
থাকার জন্য পর্যাপ্ত হল কেনো নেই, জানেন তো? কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিংবা সরকারের এতো সামর্থ্য নেই যে পরিমাণ মতো হল নির্মাণ করে সবাইকে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়া যায়। আপনাদের জানিয়ে রাখি যেই ছাত্রটি মারা গেছে, সেই ছাত্রের গরীব বাবা গতকাল বলেছেন, আমার সন্তান তো আর নেই, তাই আমি মারা যাওয়ার পর আমার সব সম্পত্তি আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে গেলাম। তিনি যে আমাদের পুরো সমাজ’কে সপাটে চড় মেরেছেন, সেটা বোঝার বুদ্ধি অবশ্য আমাদের হয়নি। অবশ্য হওয়ার কথাও না।
যে দেশে, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো জায়গা থেকে লক্ষ কোটি ডলার হ্যাক করে সহজেই বিদেশে পাচার হয়ে যায়; সেই দেশে এটাই স্বাভাবিক। এই নিয়ে দেখছি কারো কোন সমস্যাই নেই। অবশ্য সমস্যা হওয়ার কথাও না। কারণ এই টাকা তো আর তাদের না। এই টাকা হচ্ছে এই আমার, আপনার আর ওই ছাত্রের বাবার মতো মানুষের ট্যাক্সের টাকা! আমাদের টাকা পাচার হয়ে গেলে সুশীল, সভ্য সমাজের কোন ক্ষতি নেই!
অথচ কাল থেকে আমার মাথায় বার বার একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, এই যে এতো টাকা পাচার হয়ে গেলো, এই টাকা দিয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কতো গুলো হল নির্মাণ করা যেতো? তাহলে তো আর ওই ছেলেটাকে দিনের পর দিন শীতের রাতে বারান্দায় থেকে মরতে হতো না।







