রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় একের পর এক বদলেছে পুলিশের বক্তব্য। শুরুতে ঘটনাটি ডাকাতি বলে ধারণা করা হলেও কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মাদকসেবনে বাধা দেওয়াকে হত্যার কারণ হিসেবে সামনে আনে পুলিশ। পরে আবার সংবাদ সম্মেলনে ডাকাতির উদ্দেশ্যে হত্যার সম্ভাবনার কথা জানানো হয়। এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে দুজন। চারজনকে শ্বাসরোধে হত্যার ভয়াবহতার পাশাপাশি তদন্তের এই ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যও তৈরি করেছে নানা প্রশ্ন। আসলে কী ঘটেছিল গণপতি পরিবারের বাড়িতে? হত্যার নেপথ্যে ডাকাতি, মাদক নাকি অন্য কোনো কারণ? তদন্তের গল্প কেন বারবার বদলে যাচ্ছে-এখনও যেন শেষ হচ্ছে না সেই প্রশ্নের উত্তর।
রংপুর নগরীর কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় একটি নতুন বাড়ি। পরিবারটি সেখানে উঠেছিল খুব বেশিদিন হয়নি। চারপাশের মানুষের সঙ্গে পরিচয়ও পুরোপুরি জমে ওঠেনি। সেই বাড়ি থেকেই শনিবার রাতে উদ্ধার হলো অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী ও ১২ বছরের ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ। চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা।
একই পরিবারের চারজন মানুষকে বাড়ির ভেতর এভাবে হত্যা করার ঘটনায় শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে। কেন হত্যা করা হলো? এটি কি ডাকাতি, নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড? হত্যার পর কেন বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল? কেন মরদেহগুলো বাড়ির বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিল? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন হত্যাকাণ্ড ঘটলেও প্রতিবেশীরা কেন কিছু টের পেলেন না?
শনিবার রাতে গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে তার বোন পূজা চক্রবর্তী স্বামীকে নিয়ে বাড়িতে যান। পরিবারের চারটি ফোনই বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। বাড়ির প্রধান ফটকে ছিল তালা। কলিং বেলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশের পর বেরিয়ে আসে একে একে চারটি মরদেহ।
গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায় ছাদে। তার স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ ছিল সিঁড়ির কাছে। আর ছেলে প্রিয়মের মরদেহ পাওয়া যায় শোবার ঘরের খাটের নিচে। বাড়ির বিভিন্ন কক্ষের আসবাবপত্র ছিল তছনছ। টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালংকার রাখার জায়গাগুলোও ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়। বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল বিচ্ছিন্ন।
মরদেহে পচন ধরেছিল। পুলিশ ধারণা করছে, উদ্ধারের দুই থেকে তিন দিন আগেই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে।
ঘটনার পর পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে ডাকাতির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ঘর তছনছ এবং মূল্যবান জিনিসপত্র রাখার স্থান ভাঙা অবস্থায় পাওয়ায় লুটপাটের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটও ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে। পুলিশ জানায়, চারজনের গলায় দড়ি বা গামছা পেঁচানো ছিল এবং প্রাথমিকভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যার আলামত পাওয়া গেছে।
তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশের বক্তব্যে বড় পরিবর্তন আসে।
রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার আব্দুল মাবুদ মিয়া জানান, এ ঘটনায় সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নামে দুজনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, স্থানীয় কয়েকজন যুবক এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত এবং ডাকাতির উদ্দেশ্যে বাড়িতে ঢুকে চারজনকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
একই সঙ্গে পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর ওই ভবনে ইয়াবা সেবনের আলামতও পাওয়া গেছে।
এর আগে অবশ্য পুলিশ জানিয়েছিল, হত্যার উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয় এবং ডাকাতি হয়ে থাকতে পারে। ফলে তদন্তের শুরুতেই কারণ নিয়ে পুলিশের বক্তব্যে পরিবর্তন দেখা গেছে।
গণপতি চক্রবর্তী শুধু একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন না; সাবেক শিক্ষার্থীদের কাছেও তিনি ছিলেন প্রিয় মানুষ। রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক ছাত্র ও লেখক রাজীব হাসান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে স্মরণ করে লিখেছেন, হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জাবেদা খাতার ডেবিট-ক্রেডিটের পাশাপাশি ছাত্রদের ভালো-মন্দ কাজের হিসাব রাখার শিক্ষাও দিতেন।
গত বছরের ডিসেম্বরে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার চেম্বার পরিচালনা করতেন। তার স্ত্রী প্রীতিলতা ছিলেন গৃহিণী। মেয়ে আগামী চক্রবর্তী কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগ থেকে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েছেন। আর ছেলে প্রিয়ম ছিল রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতের পর থেকেই পরিবারটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ওই রাতে আগামী চক্রবর্তী তার খালা পূজা চক্রবর্তীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন।
শনিবার রাতে পূজা একে একে তার বোন, ভগ্নিপতি, ভাগনি ও ভাগনের ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। সব ফোনই বন্ধ পান। এরপর স্বামীকে নিয়ে তিনি বাড়িতে যান।
বাড়ির ভেতরে ঢোকার সুযোগ পেয়ে তিনি প্রথমেই দেখতে পান ঘরের জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এরপর খাটের নিচে প্রিয়মের মরদেহ দেখতে পান। পরে সিঁড়ির কাছে প্রীতিলতা ও আগামী এবং ছাদে গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায়।
পূজা চক্রবর্তীর প্রশ্ন—একজন শিক্ষক, তার স্ত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়ে এবং স্কুলপড়ুয়া ছেলে চারজনকে এভাবে হত্যা করল কারা?
দুইজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। তবে তদন্তের এই পর্যায়েও বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট নয়।
যদি এটি ডাকাতি হয়, তাহলে লুট হওয়া মালামালের সুনির্দিষ্ট তালিকা কী? হত্যার আগে না পরে বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল? চারজনকে একসঙ্গে হত্যা করা হলেও কেন মরদেহগুলো ছাদ, সিঁড়ি ও ঘরের ভেতর বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া গেল? হত্যাকাণ্ডের সময় কোনো চিৎকার বা ধস্তাধস্তির শব্দ কি প্রতিবেশীরা শুনেছিলেন? হত্যার পর অভিযুক্তরা কতক্ষণ বাড়িতে অবস্থান করেছিল?
আর পুলিশের দাবি অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মাদকসেবনের কোনো যোগসূত্র থাকলে সেই দাবির পক্ষে কী ধরনের আলামত পাওয়া গেছে এ প্রশ্নের উত্তরও তদন্তের মধ্যেই রয়েছে।
রোববারের সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানিয়েছে, অভিযানের একপর্যায়ে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে আটক করা হয়। তাদের একজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান টের পেয়ে পালিয়ে তুঁতবাগানে লুকিয়েছিলেন এবং পরে দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত, মোবাইল ফোনের তথ্য, লুট হওয়া মালামালের হিসাব এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এসবের সমন্বিত ফলই শেষ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত চিত্র সামনে আনতে পারে।
রংপুর মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও উপকমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, “হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেকগুলো সংস্থা কাজ করছে।”
তিনি বলেন, “প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, তাদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয়। তবে বাড়িঘর যেভাবে তছনছ করা হয়েছে, তাতে টাকা-পয়সা ও মূল্যবান জিনিসপত্র লুটপাট করা হয়েছে বলে আমরা মনে করছি।”
একটি পরিবার, চারটি জীবন এবং একটি নতুন বাড়ি সবকিছুর মাঝখানে এখন শুধু প্রশ্ন। গণপতি চক্রবর্তী তার ছাত্রদের ভালো-মন্দ কাজের হিসাব শেখাতেন। তার নিজের পরিবারকে কে, কেন এবং কীভাবে মৃত্যুর খাতায় তুলে দিল এই হিসাবের উত্তরই এখন খুঁজছে রংপুরের মানুষ।










