গত কয়েকদিন ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বলা হচ্ছে, মেধাবীদের বাদ দিয়ে তুলনামূলক কম মেধাবীদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীই দাবি করছে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ছাত্র শিবিরকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, বর্তমান বিরোধীদলের নেতা-কর্মীরা দাবি করছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধাবীদের বাদ দিয়ে ছাত্রলীগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আর এসব কিছুর জন্য দায়ী করা হচ্ছে উপাচার্যকে। কিন্তু, নতুন শিক্ষক নিয়োগের মূল প্রক্রিয়ায় উপাচার্যের কোন সম্পৃক্ততা নেই। যদি উপাচার্যের সম্পৃক্ততা নাই থাকে, তাহলে সকল দায়-ভার কেন উপাচার্যকে নিতে হবে? উপাচার্য প্রতিষ্ঠানের প্রধান, শুধু সে কারণে? নাকি এর পেছনে অন্য কিছু আছে? শুধু প্রতিষ্ঠানের প্রধান হবার জন্য যদি উপাচার্যকে দায় নিতে হয় তাহলে, তিনি শতভাগ দায়ী। আর যদি, যার যে দায়িত্ব সেটার জন্য সেই দায়ী হয় তাহলে, উপাচার্য সর্বোচ্চ শতকরা ১০ ভাগ দায়ী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী, নতুন শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় উপাচার্যের সম্পৃক্ততা একেবারেই সামান্য। এবং যে দুই জায়াগায় উপাচার্যের সম্পৃক্ততা রয়েছে সেখান থেকে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করা খুব কঠিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়।
কোন নির্দিষ্ট বিভাগে শিক্ষক স্বল্পতা থাকলে, পদ ফাঁকা থাকা সাপেক্ষে, সেই বিভাগের জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষকদের দ্বারা গঠিত সিএনডি কমিটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ঐ নির্দিষ্ট বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেন। এই সুপারিশকৃত আবেদনটি ঐ নিদিষ্ট বিভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর প্রেরণ করলে, রেজিস্ট্রার সেটি বিবেচনার জন্য উপাচার্য বরাবর প্রেরণ করেন। উপাচার্যের সম্মতিতে, এই আবেদনটি যাই প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা) বরাবর। প্রো-উপাচার্য যদি মনে করেন, ঐ নিদিষ্ট বিভাগে শিক্ষকের স্বল্পতা রয়েছে এবং পদ ফাঁকা আছে তাহলে, তিনি শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
পরবর্তীতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট অফিস শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেন। বিজ্ঞাপনে শিক্ষক নিয়োগের শর্ত কী থাকবে- সেটা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক নির্ধারণ করা থাকে। তবে, বিভাগের সিএনডি কমিটি চাইলে সেটি কমানো বা বাড়ানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ করতে পারেন। সাধারণত, বিভাগের সিএনডি কমিটি শিক্ষক নিয়োগের যে শর্ত প্রদান করেন সে অনুসারেই বিজ্ঞাপন প্রদান করা হয় ।
বিজ্ঞাপনের পর, প্রার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সরবরাহকৃত নির্দিষ্ট আবেদনপত্রের মাধ্যমে তাদের আবেদনপত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রেজিস্ট্রার বরাবর জমা দেন। পরবর্তীতে, রেজিস্ট্রার অফিস সেগুলো তাদের অফিসে লিপিবদ্ধ করে, বিজ্ঞাপনের শর্ত অনুযায়ী সব কিছু ঠিক আছে কী না, তা যাচাই-বাছাই করার জন্য বিভাগের সিএনডি বরাবর প্রেরণ করেন। এ পর্যায়ে বিভাগের সিএনডি কমিটি চাইলে বিজ্ঞাপনের শর্ত পূরণ না হলেও কোন প্রার্থীকে সাক্ষাৎকারের জন্য কার্ড প্রদানের সুপারিশ করতে পারেন। এই সুপারিশসহ সবকিছু পুনরায় প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা) বরাবর পাঠানো হয়। তিনি সব কিছু পুনরায় যাচাই-বাছাই করে, কোন আবেদনকারীরা সাক্ষাৎকার কার্ড পাবেন তা নির্ধারণ করেন, সাক্ষাৎকারের জন্য নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করে, তাদের সাক্ষাৎকার পত্র পাঠানোর নির্দেশ দেন।
প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকের নিয়োগ বোর্ডে প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা) সভাপতিত্ব করেন। এই নিয়োগ বোর্ডে নির্দিষ্ট অনুষদের ডীন, নির্দিষ্ট বিভাগের চেয়ারপার্সন, একজন সিন্ডিকেট সদস্য এবং একজন ঐ নির্দিষ্ট বিষয়ের এক্সপার্ট থাকেন। নিয়োগ বোর্ডে এই গুরুত্বপূর্ণ সিনিয়র শিক্ষকগণ প্রার্থীর একাডেমিক জ্ঞান ও রেজাল্টের পাশাপাশি ভালো শিক্ষক হবার জন্য যে গুণাবলী প্রয়োজন, সেগুলো ঐ নির্দিষ্ট প্রার্থীর আছে কী না তা যাচাই করে দেখেন। সাক্ষাৎকারের সময় একাডেমিক প্রশ্নের পাশাপাশি কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে লিখতে দেওয়া বা বলতে বলা, এমনকি একটি নির্দিষ্ট বিষয় নির্ধারণ করে ডেমো ক্লাস পর্যন্ত নিতে বলা হয়। রেজাল্টের পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেন- তারা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন, এমন অনেক শিক্ষক আছেন, যাদের অনার্স, মাস্টার্সে প্রথম বা দ্বিতীয় স্থান নেই- কিন্তু, তারা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয় শিক্ষক এবং দেশের পাশাপাশি বিদেশেও তাদের স্থান অনেক উপরে। তাই, রেজাল্টকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পর অন্যান্য বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সাক্ষাৎকার শেষে নিয়োগ বোর্ডের সদস্যবৃন্দ তাদের বিবেচনায় যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেন। যদি, কোন প্রার্থীর বিষয়ে বোর্ডের বেশিরভাগ সদস্য সম্মতি প্রদান করেন এবং একজনও যদি অসম্মতি প্রদান করেন তাহলে, তিনি তার অসম্মতির বিষয়টি ঐ সুপারিশ নামায় লিখিত দিয়ে থাকেন।
পরবর্তীতে এই সুপারিশ পত্রটি সিন্ডিকেটে পাস করানোর জন্য পাঠানো হয় এবং এই সিন্ডিকেট সভার সভাপতিত্ব করেন উপাচার্য। সাধারণত, উপাচার্য এবং সিন্ডিকেট সদস্যদের কাছে সুপারিশকৃত প্রার্থীদের বিষয়ে কোন নেতিবাচক তথ্য না থাকলে এবং নিয়োগ বোর্ডে সর্বসম্মতিক্রমে সুপারিশ করা হলে সেটি পাস হয়ে যায়।
যদি নিয়োগ বোর্ডের কোন সদস্য নির্দিষ্ট কোন প্রার্থীর বিষয়ে আপত্তি জানান তাহলে, সেটি সিন্ডিকেটে সভায় আলোচনা করা হয় এবং সম্ভব হলে এখানেই সেটি সমাধান করা হয়। আর সমাধান না হলে, পুনরায় রিভিউ করার জন্য পাঠানো হয়।
এই পুরো নতুন শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাত্র দুই জায়গায় উপাচার্যের সম্পৃক্ততা রয়েছে। একটি বিজ্ঞাপনের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে এবং অন্যটি সিন্ডিকেটে সুপারিশকৃত প্রার্থীদের নাম পাস করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে। এই দুই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থেকে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কতটুকু প্রভাব রাখা সম্ভব? সেটি ভেবে দেখার বিষয়।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যদি কোন অস্বচ্ছতা থেকে থাকে তাহলে, নিয়োগ বোর্ডে যাহারা থাকেন দায়ভার তাদের উপর যাবে এটাই স্বভাবিক। অনেকেরই ধারণা উপাচার্য সকল ক্ষমতার মালিক। কিন্তু, বিষয়টি তা নয়। উপাচার্য চাইলেই সব কিছু করতে পারেন না।
উপাচার্য চাইলে, সুপারিশকৃতদের নাম পাস না করিয়ে আবার রিভিউ করার জন্য পাঠাতে পারে এটি সত্য। কিন্তু, তার কাছে যদি কোন প্রার্থীর বিষয়ে সকল তথ্য না থাকে তাহলে, তিনি কীভাবে বুঝবেন যে নিয়োগে অস্বচ্ছতা রয়েছে। প্রতি মাসেই বিভিন্ন বিভাগের নিয়োগ হচ্ছে- সেক্ষেত্রে হয়ত দু’একটি প্রার্থীর তথ্য উপাচার্যের কাছে থাকতে পারে, সবার নয়। তাই শিক্ষক নিয়োগে বিভাগের সিদ্ধান্তকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কেননা, বিভাগের শিক্ষকগণই প্রার্থীদের একাডেমিক ও অন্যান্য বিষয়ে সব থেকে বেশি অবগত থাকেন। যেহেতু নিয়োগ বোর্ডে ঐ বিভাগের চেয়ারপার্সনসহ সিনিয়র সকল শিক্ষক প্রার্থীকে মূল্যায়ন করেন সেহেতু তাদের মূল্যায়ন সঠিক হবে সেটাই স্বাভাবিক। যদি প্রতিটি নিয়োগে উপাচার্য হস্তক্ষেপ করেন তাহলে হয়ত তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় চালানোই অসম্ভব হয়ে উঠবে।
উপাচার্য যে আবার হস্তক্ষেপ করে না সেটিও ঠিক নয়। আবার উপাচার্য হস্তক্ষেপ করলেই সব হয়ে যাবে সেটিও ঠিক নয়। কেননা, উপাচার্যের দাবি যদি নিয়োগ বোর্ডের সদস্যগণ গুরুত্বের সাথে গ্রহণ না করেন তাহলে, উপাচার্যের কিছুই করার নেই।
একটি ঘটনা জানার সুযোগ আমার হয়েছিল। কোন এক বিভাগের নিয়োগে, অনার্স এবং মাস্টার্স দুটোতেই প্রথম স্থান অধিকারী, গরিব পরিবারের একটি প্রার্থীকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। পরে, ঐ প্রার্থী বিষয়টি জানতে পেরে উপাচার্যের কাছে যায় এবং তার বিষয়ে বিস্তারিত বলে। প্রার্থী অনার্স ও মাস্টার্স দুটোতেই প্রথম, গরিব পরিবারের সন্তান এবং তার পরিবারের সদস্যরাও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত।
যেহেতু প্রার্থী গরিব পরিবারের সন্তান ছিল এবং রেজাল্টও ভাল ছিল- তাই উপাচার্য চেয়েছিল সে শিক্ষক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করুক। তিনি বিষয়টি সিন্ডিকেটে উঠিয়েছিলেন এবং তিনি নিয়োগটি সেই সিন্ডিকেটে পাস না করিয়ে বিষয়টি পুনরায় বিবেচনার জন্য নিয়োগে বোর্ডের সভাপতিকে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু উপাচার্যকে জানানো হয়েছিল, তিনি অনার্স এবং মাস্টার্স দুটোতেই ফার্স্ট হতে পারেন কিন্তু, সে ভালো সাক্ষাৎকার দিতে পারেনি। যেহেতু সাক্ষাৎকারে, রেজাল্টের পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয় তাই, নিয়োগ বোর্ড উপাচার্য চাওয়ার পরও ঐ প্রার্থীকে সুপারিশ করেনি। যেহেতু নিয়োগ বোর্ড সুপারিশ করেনি তাই উপাচার্যের একান্ত ইচ্ছা থাকার পরও ঐ প্রার্থীকে তিনি নিয়োগ দিতে পারেননি।
শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবেই যদি সকল কিছুর দায়-ভার উপাচার্যের উপর আসে একমাত্র তাহলেই উপাচার্য দায়ী, তাছাড়া নয়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)










