শেষ আশ্বিনের কাঠফাটা রোদ। শরতের আকাশে খণ্ড খণ্ড মেঘের আনাগোনা। সকাল আটটা থেকে ঢাকা শহরের কলাবাগান থেকে দক্ষিণ দিকে কোন গাড়ি যেতে পারছে না। সব দাঁড়িয়ে আছে। এর ফলে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী বাবা-মাসহ যানজটের কারণে গাড়ি থেকে নেমে ফুটপাত দিয়ে হাঁটা শুরু করেছে। উদ্দেশ্য, ঢাকা সিটি কলেজ, ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, অগ্রনী স্কুল এন্ড কলেজ। সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক’ ইউনিটে ভর্তির জন্যে যুদ্ধে অংশ নিতে হবে।
একজন পরীক্ষার্থীর সঙ্গে, বিশেষ করে মেয়ের পরীক্ষার জন্য মা-বাবাও এসেছেন, ঢাকার বাইরে থেকে। পাশাপাশি ঢাকায় বসবাস করা পরীক্ষার্থীরাও আছে। ছুটছে সবাই। ভর্তিযুদ্ধের জন্য। একজন পরীক্ষার্থীর সাথে আসা ভদ্রলোক বেশ খানিকটা বিরক্ত হয়েই হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ঢাকায় কেন সবাইকে ভর্তি হতে হবে? ঢাকায় কি মধু আছে নাকি?
কথাটা শুনে কতক্ষণ ধরে শুধু ভাবনায় সেই লোকের চেহারাটাই ভাসছিল। কথাটা কেন জানি মনে ধরল এবং কিছু প্রশ্নের জন্মও দিল। মেয়েকে নিয়ে আমিও বাস থেকে নেমে হাঁটছি। উদ্দেশ্য অগ্রণী স্কুল অ্যান্ড কলেজ। কলাবাগান থেকে আজিমপুর। মেয়ে গরমে ঘেমে একদম কাহিল। তবুও হাঁটছি।
এখন তো বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বিভাগেই বিশ্ববিদ্যালয় আছে। ভাল ভাল মেডিকেল কলেজ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে। তাহলে ঢাকার বাইরের একজন অভিভাবক কেন সন্তানকে নিয়ে সারা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য দৌড়াদৌড়ি করবেন? এরকম একজন অভিভাবকের দেখাও পেলাম, যিনি এই অক্টোবর মাসজুড়ে তার ছেলেকে নিয়ে রাজশাহী, পটুয়াখালী, খুলনা, সিলেট, ঢাকা, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, কুমিল্লাসহ আরও কয়েকটি জেলায় যাবেন। ছেলের ভর্তির জন্য তাঁর দৌড়ঝাঁপ অনেকের মত আমাকেও অবাক করল। তবে ওই যে হাঁটতে হাঁটতে একজন ভদ্রলোক যে বললেন, ‘ঢাকায় কি মধু আছে নাকি?’ ওই কথাটা কিন্তু মাথা আর ভাবনা থেকে কিছুতেই নামাতে পারছি না।
পরীক্ষা শেষেও একই দৃশ্য। হাজার হাজার শিক্ষার্থী আর অভিভাবক রাজপথে। গাড়ি আছে, চলতে পারছে না। কেউ কেউ দৌড়াচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিকেলে পরীক্ষা, সেখানে যেতে হবে। তাই অভিভাবকসহ শিক্ষার্থীদের দৌড়ঝাপ
কেন ঢাকা শহরে যানজট লাগবে? কেন গাড়ি থেকে নেমে ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এক দেড় মাইল পথ রোদের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করতে হবে? কেন অল্প কয়েকটি আসনের বিপরীতে প্রায় লাখ খানেক শিক্ষার্থীকে যুদ্ধ করতে হবে? কেন নোয়াখালী, বরিশাল, রংপুর, খুলনা, সিলেট, দিনাজপুর কিংবা চট্টগ্রামের একজন শিক্ষার্থী ঢাকায় পরীক্ষা দিতে আসবে? কেন ঢাকার একজন শিক্ষার্থীর সাথে প্রতিযোগিতায় অংশ নিবে? কেন বাবা-মাকে কষ্ট দিয়ে ঢাকায় এনে আত্মীয়র বাসায় উঠে বা হোটেলে থেকে পরীক্ষায় অংশ নেবে? ঢাকার যে শিক্ষার্থী তার রেজাল্ট দিয়ে ঢাকায় সুযোগ পেত, তার সুযোগটি নষ্ট করে দিচ্ছে অন্য কোন জেলা থেকে আসা এক শিক্ষার্থী।
একইভাবে ঢাকার এক শিক্ষার্থী হয়ত খুলনা গিয়ে খুলনার প্রকৌশল বিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়ে খুলনার এক শিক্ষার্থীর ভর্তির সুযোগ নষ্ট করে দিচ্ছে। কেন এই প্রতিযোগিতা? কেন এই প্রতিষ্ঠানকে বিশেষায়িত করা? কেন অমুক জায়গায় ভর্তি হতেই হবে, না হলে জীবন ধন্য হওয়া থেকে বঞ্চিত হবে মানসিকতার আবেগ দিয়ে চলছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা?
সব শিক্ষার্থীদের প্রতি সম্মান রেখেই সরকারের প্রতি প্রশ্ন: আগামীতে এমন নিয়ম করা যায় না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু ঢাকা বিভাগের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে পারবে? খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু খুলনা বিভাগের শিক্ষার্থীরা অংশ নেবে। এমনভাবে যে যে বিভাগের শিক্ষার্থী সে সেই বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রকৌশল, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে। এর ফলে অভিভাবকসহ শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপও কিছুটা কমবে। কেন শুধু শুধু এক বিভাগের পরীক্ষার দিনে সারাদেশের শিক্ষার্থীরা এসে ভিড় করে সেই শহরের সাধারন জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করবে?
প্রশ্নটা শুনেই অনেকের মনে আবার প্রশ্ন জাগতে পারে আশ্বিনের কাঠফাটা রোদ্দুরের প্রভাবে মাথা এলোমেলো হয়ে যাওয়া থেকে এই প্রস্তাব সরকারকে দেওয়া হচ্ছে না তো? না, সুস্থ মাথায় প্রশ্নটা থাকল। বিষয়টা একটু ভেবে দেখা যায় কি?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








