বাংলাদেশ

ডিজিটাল ভোটিং মেশিন: ত্রুটিমুক্ত নির্বাচন সম্ভব?

ডিজিটাল ভোটিং মেশিন: ত্রুটিমুক্ত নির্বাচন সম্ভব?

এটিএম শামসুল হুদা কমিশনের আমলে (২০১০ সাল) চালু হওয়া ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) দিয়ে ভোটগ্রহন ও গণনায় নানা যান্ত্রিক ত্রুটি চিহ্নিত হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যাওয়া সে যন্ত্রটি উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুনভাবে চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন।

এ লক্ষ্যে নতুন নামে ’ডিজিটাল ভোটিং মেশিন (ডিভিএম)’ যন্ত্রটি তৈরি ও পরিকল্পনা প্রণয়নে কাজ করছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি। ইসির অতিরিক্ত সচিবকে আহ্বায়ক করে গঠিত এ কমিটির উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী। চলতি মাসের মধ্যেই এ সুপারিশসহ এ কমিটির প্রতিবেদন দেয়ার কথা রয়েছে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সব বিধিবিধানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে, মানুষের ভোটাধিকার অধিকতর সুনিশ্চিত করার স্বার্থে আগামী জাতীয় নির্বাচন ই-ভোটিং প্রবর্তন করার পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।

বিএনপি মনে করছে এই ভোট পদ্ধতিতে সরকারের দুরভিসন্ধি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, এটি জনগণের ভোটকে নিজ উদ্দেশ্য সাধনে জালিয়াতি করার প্রচেষ্টামাত্র।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এ যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে সম্পুর্ণ ত্রুটিমুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জাতীয় নির্বাচন পর‌্যবেক্ষক পরিষদের(জানিপপ) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, (নতুন)যন্ত্রটি হাতেকলমে দেখা সম্ভব হয়েছে আমার। তাতে আমার কাছে মনে হয়েছে এটি ব্যবহার করে ভোটগ্রহন করা হলে শতভাগ ত্রুটিমুক্ত নির্বাচন করা সম্ভব।

এ মেশিন নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক প্রসঙ্গে এ নির্বাচন বিশেষজ্ঞ বলেন, নতুন কোন সিস্টেম চালু হলে প্রথম প্রথম সেটা নিয়ে শোরগোল হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সেটার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায়।’

এ ক্ষেত্রে তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উদাহরণ টেনে বলেন, ’’সেখানে(পশ্চিমবঙ্গে) যখন প্রথম ই-ভোটিং চালু হলো তখন অনেকেই এটা নিয়ে শোরগোল করেন। কিন্তু এখন মানুষ অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় এটা নিয়ে কেউ আর কোন কথা বলছে না।

বিএনপির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ’তাদের(বিএনপির) উচিত হবে অনুমান নির্ভর কোন ধারণায় ঘটনার উপসংহার না টেনে, ওই মেশিনের নমুনা সংগ্রহ করে তা যাচাই বাছাই ও পরীক্ষা নিরীক্ষা করা। এক্ষেত্রে তাদের যেসব বিশেষজ্ঞ আছে বা যাদের ওপর তাদের আস্থা আছে তাদের সহায়তা নেওয়া।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবটিক্স্ অ্যান্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং এর চেয়ারপারসন অধ্যাপক লাফিফা জামালও মনে করেন ইলেকট্রনিক ভোটিং পদ্ধতিতে শতভাগ নির্ভুল ভোটগ্রহন ও গণনা সম্ভব। তবে এর যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে চান তিনি।

চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে শতভাগ নির্ভুল ভোট গ্রহণ ও গণনা সম্ভব। তবে এটি নির্ভর করছে কীভাবে এটি ব্যবহার বা প্রয়োগ করা হবে। যদি ভোটারের আইডেন্টিটি সঠিকভাবে শনাক্ত করে ভোট গ্রহন করা যায় তবে এটি দ্বারা ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান অবশ্যই সম্ভব।

ভোটারের আইডেন্টিটি সঠিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব জানিয়ে ইসি সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ এর আগে সাংবাদিকদের বলেন, এ মেশিনে আঙুল ছাপ পদ্ধতিতে ভোটারের আইডেন্টিটি শনাক্ত করা হবে। তাই একজনের ভোট অন্যজনের দেওয়ার কোন সুযোগ থাকবে না। তাই কারচুপির কোন সুযোগ থাকবে না এবং ভোটের নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত করা যাবে।

ইভিএম থেকে ডিভিএম

এটিএম শামসুল হুদা কমিশন প্রথম ই-ভোটিংয়ের উদ্যোগ নেয়। ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের একটি ওয়ার্ডে প্রথম ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করে ভোটগ্রহন অনুষ্ঠিত হয়। কুমিল্লা সিটি নির্বাচনের সবগুলো ওয়ার্ডে এবং নারায়নগঞ্জ সিটির নয়টি ওয়ার্ডেও এ পদ্ধতি ব্যবহার করে হুদা কমিশন।

তবে সদ্যবিদায়ী কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ  কমিশনের আমলে ২০১৩ সালের ১৫ জুন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের একটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহন নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও ইভিএমে যান্ত্রিক সক্ষমতার অভাবে পুনঃগণনা সম্ভব হয়নি। এর পর থেকেই ই-ভোটিং বন্ধ রেখে কাগুজে পদ্ধতিতে ফিরে আসে রকিব কমিশন।

এরপর গত বছরের ২৫ জুলাই নির্বাচন কমিশনের এক বৈঠকে ই ভোটিংয়ের নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়। এই ‍পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের অক্টোবরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ১৯ সদস্যের একটি কমিটি করে কমিশন। যার আহ্বায়ক করা হয় ইসির অতিরিক্ত সচিবকে এবং উপদেষ্টা হিসেবে আছেন অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী। সেই কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় এখন ইসি সচিবালয়।

বিশ্বব্যাপী ই-ভোটিংয়ের বর্তমান চিত্র:

ইন্টারনেটের বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, বিশ্বে বর্তমান ৩১টি দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় ই ভোটিং চালু রয়েছে। এর মধ্যে অনেক দেশ প্র্রথমে ই ভোটিং চালু করলেও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অবশ্য সেখান থেকে সরে এসেছে। কিছু কিছু দেশে এখনও পাইলটিং চলছে।

যেসব দেশ ই-ভোটিংয়ের মাধ্যমে তাদের নির্বাচন পরিচালনা করছে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, কানাডা, এস্তোনিয়া, ইউরোপিয়ন ইউনিয়ন, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, নেদারল্যান্ড, নরওয়ে, পেরু, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, রুমানিয়া, ভেনিজুয়েলা প্রভৃতি।

তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিন আমেরিকা এবং এশিয়ার দেশগুলো ই ভোটিংয়ের ক্ষেত্রে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে যেখানে উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপিয়ান দেশগুলো এ ব্যবস্থা থেকে সরে আসার প্রবণতা দেখাচ্ছে।

বিষয়:জাতীয় নির্বাচননতুন নির্বাচন কমিশন
প্রতিবেদক

সাখাওয়াত আল আমিন

সাখাওয়াত আল আমিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।

আরও →

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…