নারায়ণ উপাধ্যায় (রিপাবলিকা) নেপালের সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে এক আমূল পরিবর্তনের চিত্র ফুটে উঠেছে। দীর্ঘদিনের পরিচিত ও প্রথাগত দলগুলোকে একপাশে সরিয়ে নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) নাটকীয়ভাবে সামনে চলে এসেছে। আরএসপির এই শক্তিশালী অবস্থান নির্দেশ করছে যে তারা সংসদে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পথে রয়েছে।
নির্বাচনের এই ফলাফল নেপালের প্রথাগত রাজনৈতিক সমীকরণকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষ পুরনো দলগুলোর ওপর আস্থা হারিয়ে পরিবর্তনের পক্ষে জোরালো রায় দিয়েছে।
২০২৬ সালের নির্বাচনে আরএসপি যে বিপুল জনসমর্থন পেয়েছে, তা নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল। নির্বাচনের পরিসংখ্যান থেকে তাদের এই সাফল্যের একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়:
• গণনাকৃত মোট ১ কোটি ৪ লাখ আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) ভোটের মধ্যে আরএসপি একাই ৫০ লাখের বেশি ভোট পেয়েছে। এটি মোট ভোটের প্রায় ৪৮ শতাংশ।
• এবারের সংসদে তরুণ প্রজন্মের জয়জয়কার দেখা গেছে। মোট ৭১ জন আইনপ্রণেতা নির্বাচিত হয়েছেন যাদের বয়স ৪০ বছরের কম।
আরএসপির এই অভাবনীয় উত্থানের পেছনে কাঠমান্ডুর মেয়র বলেন্দ্র শাহ (বালেন শাহ)-এর আরএসপিতে যোগদান এবং জাতীয় রাজনীতিতে তার ব্যক্তিগত ইমেজের বড় প্রভাব রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভঙ্গি এবং সরাসরি কথা বলার ভিডিওগুলো তরুণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। তবে এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রবাসীদের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত লক্ষ লক্ষ নেপালি প্রবাসী সরাসরি ভোট দিতে না পারলেও তারা নিয়মিতভাবে দেশের বাড়িতে থাকা তাদের পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলেছেন। তারা দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং সুশাসনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করে দেশে থাকা ভোটারদের আরএসপির পক্ষে প্রভাবিত করেছেন। এই ‘প্রবাস থেকে ঘরোয়া আলোচনা’ পরিবর্তনের ডাককে আরও শক্তিশালী করেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি প্রত্যাশার চেয়ে কম ছিল, যা ছিল প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশের মধ্যে। এই নিম্ন ভোটার উপস্থিতিকে বিশ্লেষকরা প্রথাগত দলগুলোর জন্য এক ধরনের শাস্তি হিসেবে দেখছেন। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
• প্রবাসী শ্রমিকদের অনুপস্থিতি: লক্ষ লক্ষ নেপালি প্রবাসী শ্রমিক অনলাইনে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখলেও তাদের সশরীরে ভোট দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ফলে তাদের একটি বিশাল অংশের ভোট গণনায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি।
• জনসাধারণের অসন্তোষ ও আস্থার ভঙ্গুরতা: বারবার রাজনৈতিক জোট পরিবর্তন, সীমাহীন দুর্নীতি এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ভোটারদের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করেছে। তরুণদের বিভিন্ন বিক্ষোভ সত্ত্বেও ভোটার উপস্থিতির সাধারণ হার প্রমাণ করে যে, প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার কতটা অবনতি ঘটেছে।
নেপালি কংগ্রেস, সিপিএন-ইউএমএল এবং মাওবাদী দলগুলোর মতো বড় দলগুলো এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এর পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে:
• তৃণমূল পর্যায়ে উদ্দীপনার অভাব: নেপালি কংগ্রেস এবং সিপিএন-ইউএমএল-এর ভেতর নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং প্রার্থী নির্বাচনে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে দলগুলোর নিজস্ব কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে উদ্দীপনার চরম অভাব দেখা যায়। এর ফলে তারা ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে বা সঠিকভাবে উদ্বুদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
• মদেশ-ভিত্তিক দলগুলোর বিপর্যয়: মদেশ অঞ্চলের আঞ্চলিক দলগুলো আগে আঞ্চলিক পরিচয় এবং জাতিগত বিষয় নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে জনসমর্থন পেত। তবে এবার ভোটাররা সেসব পুরনো বিষয় ছেড়ে সুশাসন এবং নতুন নেতৃত্বের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, যার ফলে এসব দলের প্রথাগত রাজনীতি ব্যর্থ হয়েছে।
এই নির্বাচনের ফলাফল নেপালের প্রথাগত দলগুলোর জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা। তারা যদি জনআকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী নিজেদের দ্রুত সংস্কার করতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে তাদের জনসমর্থন আরও হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, আরএসপি বিপুল জনসমর্থন পেলেও তাদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনগণের এই বিশাল প্রত্যাশার চাপ সামলানো। স্বচ্ছ নেতৃত্ব নিশ্চিত করা, সরকারি সেবা উন্নত করা এবং দেশে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করার মতো কঠিন পরীক্ষা এখন তাদের সামনে। নেপালের এই রাজনৈতিক পরিবর্তন দেশটির গণতন্ত্রের জন্য এক নতুন মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা প্রমাণ করে যে ভোটাররা এখন অতীতের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চান।








