ব্যাংকের আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) ৪ শতাংশের নিচে রাখার নির্দেশনা থাকলেও অর্ধেকের বেশি ব্যাংক তা মানছে না। ৩১টি ব্যাংক এখনো ১০ শতাংশের ওপরে ঋণের সুদ আদায় করছে গ্রাহকের কাছ থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্ট মাস শেষে দেখা গেছে ৩১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক ঋণের সুদহার ১০ শতাংশের বেশি নিচ্ছে। ৩৪টি ব্যাংকের স্প্রেড ৪ শতাংশীয় পয়েন্টের ওপরে রয়েছে। এ সময় ব্যাংকগুলোর গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ২৭ শতাংশ। তবে অনেক ব্যাংকে এখনো স্প্রেড ৮ শতাংশের ওপরে।
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী বিনিয়োগ বাড়াতে এখনই ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদ এক অংকে নামিয়ে আনা উচিত।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শফিউল ইসলাম (মহিউদ্দিন) চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, কয়েকটি ব্যাংক সীমিত কয়েকটি খাতে এক অংকে সুদে ঋণ দিচ্ছে। এটা সব খাতে বাস্তবায়ন করা দরকার। কারণ ডাবল ডিজিটের সুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়। তবে অধিকাংশ ব্যাংক এখনো ১০ শতাংশের বেশি সুদ নিচ্ছে।
তিনি বলেন, বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে সুদ হার কমানোর বিকল্প নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে এই বিষয়ে জোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তবে ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকের আমানতে ৬ ও ঋণে সুদ ৯ শতাংশ বাস্তবায়ন করা কঠিন। কারণ আমানতে সুদ কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছে। এতে ব্যাংকে আমানত কমে যাচ্ছে। তাই তারল্যে টান পড়ছে।
এছাড়া গ্রাহক থেকে আগে বেশি সুদে আমানত নেয়া হয়েছে। কিন্তু এখন কম সুদে সেই অর্থ ঋণ দিতে গেলে ব্যাংকের ক্ষতি হবে বলে জানান তারা।
এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, অনেক ব্যাংকই এক অংক সুদে ঋণ দিচ্ছে। তবে ৬ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়া কষ্টকর। এটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ব্যাংক খাত কিছুটা সমস্যায় পড়েছে। পুরোপুরি বাস্তবায়নে আরো সময় লাগবে।
এর আগে এক অংক সুদে ঋণ বিতরণের শর্তে সরকারের কাছ থেকে নানা সুযোগ-সুবিধা নিয়েছিল ব্যাংকগুলো। কিন্তু প্রতিশ্রুতি রাখেনি বলে অভিযোগ উদ্যোক্তাদের। এখনো ১০ শতাংশের ওপরে ঋণের সুদ আদায় করছে বেশিরভাগ ব্যাংক।
তারল্য ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপকে কেন্দ্র করে সুদহার বাড়তে থাকায় তা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত ৩০ মে এক নির্দেশনায় বলা হয়, ব্যাংকগুলো বিভিন্ন প্রকার ঋণের সুদহার ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি করছে; যা উদ্বেগজনক। তাই সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করতে ভোক্তা ঋণ ও ক্রেডিট কার্ড ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে স্প্রেড ৪ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। আগে যা ৫ শতাংশ ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গড়ে ১০ শতাংশের বেশি সুদ নিচ্ছে ৩১ ব্যাংক। এর মধ্যে বিদেশি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সুদহার ১০.২১%, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন ১০.২৬%, বেসরকারি এবি ব্যাংক ১১.৪৭%, সিটি ব্যাংক ১০.৮৩%, আইএফআইসি ১০.০৪%, উত্তরা ব্যাংক ১০.২৮%, সীমান্ত ব্যাংক ১০.০৮% , ইস্টার্ন ব্যাংক ১০.৬৬%, এনসিসি ব্যাংক ১০.৫০%, ঢাকা ব্যাংক ১০.৬৬%, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ১১. ১৫%, ডাচ-বাংলা ব্যাংক ১০.২৫%, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ১০.৫৭%, ওয়ান ব্যাংক ১১.২৬%, এক্সিম ব্যাংক ১০.২৬%, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ১০.৬৩%, প্রিমিয়ার ব্যাংক ১১.৪৪%, ফাস্ট সিকিউরিটিজ ইসলামী ব্যাংক ১১.৩৭%, ব্যাংক এশিয়া ১০.৩৫%।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্প্রেড হার সবচেয়ে বেশি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের। ব্যাংকটিতে আমানতে গড়ে সুদ ১.৭১% হলেও ঋণের ক্ষেত্রে ১০.২১% নিচ্ছে। এতে স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৮.৫০%। ব্র্যাক ব্যাংক আমানতে সুদ ৪.৮৭%। আর ঋণের ক্ষেত্রে সুদহার ১২.৫৫%। ব্যাংকটির স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৭.৬৮%। ডাচ বাংলা ব্যাংক সুদ দিয়েছে ২.৬১% আর নিয়েছে ১০.২৫%। এতে স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৭.৬৪%।
গত আগস্ট শেষে ব্যাংকগুলো গড়ে ৫.৩৬% সুদে আমানত নিয়েছে। আর ঋণ বিতরণ করেছে ৯.৬৩% সুদে। এতে স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৪.২৭ পয়েন্ট। স্প্রেড ৪ শতাংশের নিচে না নামানোর তালিকায় রয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার একটি ব্যাংক, বিদেশি মালিকানার ৭টি এবং বেসরকারি খাতের ২৬টি ব্যাংক।
আগস্টে রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকগুলোর গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ২.৬৯%, বিশেষায়িত ব্যাংকের ৩.২৪%, বিদেশি ব্যাংকগুলোর ৬.৮৫% এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ৪.৩৬%।







