ইন্দোনেশিয়ার উপকূলে ভাসমান ট্রলারে বাংলাদেশী এবং রোহিঙ্গা অভিবাসীদের মধ্যে খাবার ও পানি নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন বেঁচে যাওয়া মানুষেরা। বৃহস্পতিবারের ওই সংঘর্ষে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গারা কুড়াল, ছুরি আর শাবল নিয়ে একে অন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। এতে অন্তত একশ অভিবাসন-আকাঙ্খী মানুষ নিহত হয়। কিছু হিসাবে এ সংখ্যা দুইশ।
ট্রলারটিতে কয়েক’শরও বেশি রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশী গাদাগাদি অবস্থায় ছিলেন। দুই মাসের দীর্ঘ ও অমানবিক সমুদ্র-যাত্রায় ট্রলারটিতে খাবার ও পানি তখন প্রায় শেষ। অবস্থা বেগতিক দেখে মাঝি-মাল্লারা যাত্রীসহ ট্রলারটিকে রেখে পালিয়ে যান।
অবশেষে ক্ষুধা-তৃষ্ণার কাছে বৃহস্পতিবার পরাজিত হয় মানবিকতা।
বেঁচে থাকার তাগিদে আদিম কায়দায় খাবার এবং পানির ভাগিদার কমাতে হাতের সামনে থাকা মধ্যযুগীয় অস্ত্রগুলো নিয়ে অস্তিত্বের লড়াইয়ে নেমে পড়ে বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গারা। সংঘর্ষে অনেকে ট্রলারেই মারা গেছেন। আবার কেউ প্রাণ বাঁচাতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন সমুদ্রে।
ভয়ংকর ওই সংঘর্ষ থেকে বেঁচে যাওয়া ‘সৌভাগ্যবান’দের ঠাঁই হয়েছে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের শরণার্থী ক্যাম্পে। সেখানে আগে থেকেই অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন অারো প্রায় তিন হাজারের মতো অবৈধ অভিবাসী।
বৃহস্পতিবারের প্রাণঘাতি ওই সংঘর্ষের পর কপাল জোরে উদ্ধার পাওয়া বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গারা এখন একে-অন্যকে দায়ি করছেন।
সেদিনের ঘটনায় উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশী অভিবাসীরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বার্মিজ ভাষা ছাড়া আর কোনো ভাষা জানতেন না ট্রলারের কথিত কাপ্তান। এজন্য যাত্রার শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের কাছে খাবার ও পানির জন্য জিম্মি ছিলেন বাংলাদেশীরা। খাবার ও পানি চাওয়ায় তাদের ওপর রোহিঙ্গারা হামলা চালায় বলে অভিযোগ তাদের।
আঘাতে জর্জরিত শরীর দেখিয়ে মোহাম্মদ মুরাদ হোসাইন (৩০) নামের এক বাংলাদেশী বলেন, তাদেরকে ট্রলারের ডেকের নিচে রাখা হয়েছিলো। খাবার ও পানির জন্য উঠে আসতে গেলে রোহিঙ্গারা তাদের ওপর শাবল-কুড়াল দিয়ে হামলা চালায়। গরম পানি ও মরিচ দেয়া পানিও তাদের ওপর নিক্ষেপ করা হয় বলে জানান তিনি।
মৃত্যু আসন্ন জেনে আত্মরক্ষার্থে বাংলাদেশীরা ডেকের ওপর চলে আসেন। এরপর সংঘর্ষ শুরু হয় বলে জানান মুরাদ।
তবে পাল্টা অভিযোগ করেন আসিনা (২২) নামে এক রোহিঙ্গা নারী। তার অভিযোগ, বাংলাদেশীদের হামলায় তার ভাই মারা গেছেন।
আসিনা বলেন, হঠাৎই বাংলাদেশীরা ট্রলারের ডেকে উঠে এসে তাদের ওপর হামলা চালায়। তখন প্রাণ বাঁচাতে অনেকেই সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তার ভাই সেটা না করায় বাংলাদেশীরা তাকে হত্যা করে বলে অভিযোগ করেন ওই নারী।
উদ্ধার হওয়া অন্য কয়েকজন জানান, সংঘর্ষের এক পর্যায়ে ট্রলারটিতে পানি উঠতে শুরু করে। কুড়াল-শাবলের আঘাত কিংবা তলিয়ে যাওয়ার আতঙ্কে অনেকেই সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
দুঃস্বপ্ন থেকে ফেরা মোহাম্মদ মেশার আলীর মতো বাংলাদেশীরা চান দেশের মাটিতে স্বজনের কাছে ফিরতে। আক্ষেপভরা কণ্ঠে তিনি বলেন, বাড়িতে খবর দিতে পারছেন না তারা। পরিবার-পরিজন জানেও না তারা বেঁচে আছেন না কি মরে গেছেন। স্বজনদের কাছে আজ তারা হয়তো মৃত। তবে তারা জানেন, তারা মরে বেঁচে আছেন|






