জালালের গল্প। অধুনা মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা সিনেমা। আবু শাহেদ ইমনের প্রথম নির্মাণ। পরিচালক সম্পর্কে ব্যক্তিগতভাবে আমার কোন ধারণা ছিলো না। তবে খবরের কাগজ, দুয়েকজন বন্ধুর মুখের কথা আর পুরস্কার প্রাপ্তির কারণে ছবিটা দেখতে আগ্রহী হই। একটা দৈনিকের ইন্টারভিউতে পরিচালক বলেছিলেন, সচেতনভাবেই তিনি ছবিতে গান রাখেননি। গল্পের উপর জোর দিয়েছেন। পরিচালকের এই কথাটা বেশ ভাল লেগেছিল। কারণ, গল্পই একটা সিনেমার প্রাণ।
তার আগে একটা বিষয় বলা দরকার। আমাদের নির্মাতা, প্রযোজক, পরিবেশক, অভিনেতা-অভিনেত্রী থেকে দর্শক সকলেই একটা ভণ্ডামি করেন। অনেকেই সচেতনভাবে। অনেকেই না বোঝে। বলা হয় বাণিজ্যিক ছবি আর আর্টফিল্ম! ভাই রাখেন! ফিল্ম ইটসেলফ অ্যান আর্ট। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিল্প মাধ্যম। সব প্রযোজক-পরিচালকই সিনেমা বানান বাণিজ্যের চিন্তা থেকেই। নাচ-গানওয়ালা বলিউডি ফর্মুলার ছবিতে আর্ট নাই? আর্ট বলতে আপনি কি বোঝেন, তাহলে সেই ব্যাপারটাই আপনার ক্লিয়ার না। বলিউড আর উপমহাদেশ বাদে পৃথিবীর কোন অঞ্চলের সিনেমায় অপ্রয়োজনে গান থাকে না। নাচানাচি থাকে না। এমনকী একটা ঘুষিও থাকে না। ওরা কি বাণিজ্যের জন্য সিনেমা বানায় না? বা ওদের ছবি কি ‘ছবি’ নয়? বিদেশী ভাষার সেসব ছবিকে কিন্তু আপনারাই আর্টফিল্ম বলে আলাদা করছেন না। ওসবকে ফিল্মই বলছেন। তাহলে নিজেদের ছবির ক্ষেত্রে এই বিভাজন কেন? দুর্বলতা ঢাকতে? সিনেমার নিজস্ব ভাষা বা গল্প বলার ধরণটাই তো আসল ব্যাপার।
আরও একটা বিষয় খুব বলি আমরা। গল্প প্রধান ছবিকে আমরা আর্টফিল্ম বলে অনেক সময় চিহ্নিত করি, বলে থাকি ছবি বানাতে গিয়ে ‘নাটক’ বা ‘টেলিফিল্ম’ বানিয়ে ফেলেছে! আচ্ছা, টিভিতে ফিকশন কখনও নাটক হয় কি? নাটক তো মঞ্চের ব্যাপার-স্যাপার। মঞ্চের নাটক যদি ভিডিওধারণ করে টেলিভিশনে প্রচার করা হয়, সেটা টিভি নাটক হতে পারে। কিন্তু বড় পর্দার জন্য হোক বা টেলিভিশন, মোশন পিকচার্স যদি ফিকশন হয়, সেটা মুভি। যখন কোন সিনেমা টিভির জন্য নির্মাণ হয়, সেটা টিভিমুভি। বিশ্বব্যাপি এভাবেই ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়। যদি নির্মাতা হয়ে আপনারা বলেন এটা তো আর্টফিল্ম বা টেলিফিল্ম! সেটা মূর্খতা বা ভণ্ডামি। অথবা প্রতিহিংসা।
আবু শাহেদ ইমন এবং তাঁর ‘জালালের গল্প’ বাণিজ্যিক/আর্টফিল্ম/টেলিফিল্ম/ বখাট্য যুক্তির সমালোচক, বোদ্ধা দর্শক, সাধারণ দর্শক, সৎ সমালোচক সবার মুখ ‘একমুখী’ করে দিয়েছে। হ্যাঁ, একটা সিনেমা দেখলাম বটে! বাংলাদেশের বাংলা সিনেমা! সত্যি সত্যি যে ছবিটা বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে।
এদেশে অপ্রচলিত ঘরানার সিনেমার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিককালে আমরা দেখেছি, ছবির গল্প বলতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেন পরিচালক। অথবা গল্প ভালো হলেও ডায়লগ থাকে দুর্বল, নতুবা চিত্রনাট্যের জগাখিচুড়ির সঙ্গে যা ইচ্ছে তাই সিনেমাটোগ্রাফি। আর সিনেমাটোগ্রাফি দেখা গেলো দুর্দান্ত, চিত্রনাট্যও চলনসই; কিন্তু ছবির কোন গল্প নাই। আর এফডিসির শাকিব খান বা অনন্ত জলিল, নায়িকা আনা প্রযোজক বা প্রযোজককে আনা নায়িকার ছবিগুলোর কথা নাইবা বললাম! জালালের গল্প ছবিটা এসব দিকেও লেটার মার্কস নিয়েই উতরে গেছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বেশ ভালো গল্প ছবিটার। সেইমতো চিত্রনাট্য আর ডায়লগ। কালার গ্রেডিং নিয়ে কোন মন্তব্য করতে চাই না। কেননা, আমাদের সিনেমা হলগুলোর যে অবস্থা, তাতে ফোরকে প্রযুক্তি ব্যবহার হলেও, ওয়ানকের বেশি পাওয়ার কথা না।
জালালের গল্প ছবির তিনটা অধ্যায়। প্রথম দুটি অধ্যায় এক কথায় অসাধারণ। শেষ অধ্যায়টির অনেক দুর্বলতার ভিড়ে বড় শক্তি মোশাররফ করিম। প্রথম গল্পে দেখি, ডেগের (পাতিল) ভেতরে নদীতে ভেসে আসে এক শিশু। সেই শিশুকে নিয়ে পানি পড়ার ব্যবসা ফাঁদেন দত্তক পিতা। স্বার্থের গ্যাড়াকলে সেই ব্যবসা বেশিদিন টেকে না। আবারও সেই শিশুকে ভাসিয়ে দেয়া হয় নদীতে। ডেগে ভরে। এই গল্পটায় দারুনভাবে উঠে এসেছে নদীপাড়ের গ্রামীণ জীবন, গ্রাম-বাঙলার মানুষের কুসংস্কার। হুজুগে কতকিছু হয়ে যায়, কত দ্রুত ভাইরাসের মতো গুজব আর কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয় মানুষ, সেই চিত্র মুন্সীয়ানার সঙ্গে দেখানো হয়েছে; কৌতুক রেখে। এই অংশে শিশু জালালের পালক পিতা-মাতার চরিত্র রূপ দেয়া নূরে আলম নয়ন আর মিতালি দাশের জন্য কোন প্রশংসাই যোগ্য নয়। মনেই হয়নি তারা কেউ অভিনয় করছেন! বাকী চরিত্রগুলোর ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য।
দ্বিতীয় অধ্যায় আরো বেশি ইন্টারেস্টিং। এখানে জলে ভাসা জালাল আট বছর বয়সী শিশু। গ্রামের সবচেয়ে প্রতাপশালী লোকটা আঁটকুড়ে। তারই বাড়িতে ঠাঁই হয়েছে জালালের। লোকটার আগের দুই স্ত্রী সন্তান জন্ম দিতে পারেনি। এবার পিতা না হতে পারলে, তার আর চেয়ারম্যান হওয়া হবে না! তাই তৃতীয় স্ত্রী ঘরে আসে। সে যেন মা হয়, সেজন্য আসে কবিরাজ। হাঁসপড়া দিয়ে যে বাচ্চা হয় না, যৌনতা লাগে, তা দুর্দান্ত সিনেমাটিক ফ্রেমে বেঁধেছে জালালের গল্পের পরিচালক। এই অংশের সিনেমাটোগ্রাফি আর আর্ট ডিরেকশন বিশ্বমানের। সিনেমার এই অংশটুকু আরও হিউমারাস। চেয়ারম্যান যশপ্রার্থী তৌকির আহমেদের তৃতীয় স্ত্রীর চরিত্রে শর্মীমালার অভিনয় আমাদের এটুকু আশ্বাস দেয়, বাঙলা সিনেমা একজন শক্তিশালী অভিনেত্রীকে পেয়েছে। কবিরাজ চরিত্রের অভিনেতা আর শিশু জালাল চরিত্রের ইমন তো অনবদ্য। জানালা দিয়ে জালালের তাকানোর দৃশ্যগুলো পথের পাঁচালীর অপুর কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে অপু আর জালালের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। কবিরাজের প্ররোচনায় চেয়ারম্যান হওয়ার স্বপ্নে বিভোর বিবেকহীন তৌকির যখন বস্তায় ভরে, কলার ভেলায় পাতিলের পাশে জালালকে ভাসিয়ে দেয়, সেই সময়ে জালালের আর্তনাদ বাংলা সিনেমার দর্শকদের আচ্ছন্ন করে রাখবে অনেকদিন। তবে, এই অংশে দুটি দুর্বলতা আছে। মনে হয়েছে, থিয়েটারিক্যাল স্টাইলে তৌকির আহমেদের ডায়লগ থ্রোয়িং ছবির ‘ন্যাচারাল’ গতি-প্রকৃতি নষ্ট করেছে; কিছুটা হলেও। অন্যদের সাবলীলতার কাছে তৌকিরকে ম্লান মনে হয়েছে। তাছাড়া, গ্রামে চেয়ারম্যান নির্বাচনের ছয়/সাত মাস আগে মিছিল হয় না সাধারণত। বেশ কয়েকবার গ্রামবাসীর মিছিল দেখেছি, “দিমু না রে দিমু না, আঁটকুইড়া রে দিমু না”। এখানে না দেয়া মানে ভোট না দেয়ার ব্যাপারটাই নিশ্চয় বুঝিয়েছেন পরিচালক।
তৃতীয় অধ্যায়ে গ্রামীণ জীবন থেকে কিছুটা শহুরে জীবনের গল্প দেখা যায়। এখানে জালাল ১৮/২০ বছর বয়সী তরুণ। ভয়ংকর চরিত্রের মোশাররফ করিম জালালের আশ্রয়দাতা। যাত্রাদল থেকে জালালের তুলে আনা তরুণী শিলাকে ভোগ্যবস্তুতে পরিণত করে মোশাররফ করিমের চরিত্রটি। মেয়েটা অন্ত:সত্তা হলে তার দায়িত্ব নেয় জালাল। মোশাররফ করিমও নির্বাচন করে জিততে চায়। সে নব্য রাজনীতিবিদ। সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মেয়েটা মারা যায়। কিন্তু বাচ্চাটা বেঁচে থাকলে নির্বাচনে অসুবিধা হবে। তাই যে পাতিলে করে জালাল ভেসে এসেছিল, সেই পাতিলেই শিশুটিকে ভাসিয়ে দেয়া হয়। তাকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারায় জালাল। এ এক ট্র্যাজেডি বটে! যে জালাল পানিতে ভেসে এসেছে, সে-ই সাঁতার জানে না।
জালালরা তো এমনই। পৃথিবীব্যাপি তারা শুধু ভেসে থাকে। সাঁতার জানে না। তাদের কোন ঠিকানা থাকে না। জালালরা স্বদেশ বা বিদেশ, সবখানেই শরণার্থী। সর্বশেষ এর বাস্তব উদাহরণ সিরিয়ান শিশু আয়লান। যুগ যুগ ধরেই জালালরা জন্ম নিচ্ছে, পরিচয়হীন বড় হচ্ছে, কুকুর-বিড়ালের জীবন কাটাচ্ছে আর মরে যাচ্ছে। আসলে জালালের গল্প সিনেমার ‘জালাল’ একটি প্রতীক। বাস্তবতা কঠিন। জালালকে মোশাররফ করিমের তা শেখানোর দৃশ্যটা হয়তো কোনদিনই ভুলবে না দর্শক। গল্প বলার এই যে নতুনত্ব, এই জালালদের লাইফ সার্কলিং, তা দারুনভাবে সেলুলয়েডে তুলে এনেছেন আবু শাহেদ ইমন। চিত্রনাট্য আর সম্পাদনাও তার। তিনি যে বাঙলা সিনেমার দর্শকদের মনে রাখার মতো আরও ছবি উপহার দেবেন, এ ব্যাপারে আমি নি:সন্দেহ।
শেষ অধ্যায়ে মোশাররফ করিমের এক্সপ্রেশন দারুন ছিলো। কিন্তু টিভিমুভি ও সিরিজগুলোয় আমরা মোশাররফ করিমকে যে ভঙ্গিমায় ডায়লগ বলতে দেখি, যে ভাষায় কথা বলতে দেখি, তা হুবহু এই সিনেমাতেও ছিলো। যা জালালের গল্পের একটি দুর্বল দিক। বাকীরা দারুন। বিশেষ করে শিলা চরিত্রের মৌসুমি হামিদ ও জালাল চরিত্রের আরাফাত। তৌকির বা মোশাররফ করিমকে যে পরিচালক সিনেমার মার্কেটিংয়ের জন্যই কাস্ট করেছেন, তা পরিস্কার দর্শকের কাছে। কেন না, সিনেমার কলাকুশলী আর শুটিংস্পট মনে হয়েছে পরিচালকের নখের মতো চেনা। সেজন্য টিমওয়ার্কটাও খুব ভালো ছিলো বোধ করি।
বরকত হোসেন পলাশ, জীবনের প্রথম সিনেমাতেই সিনেমাটোগ্রাফার হিসাবে যে কাজ করেছেন, তাকে টুপি খোলা নমস্কার। চিরকুটের করা ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরও চমৎকার। আর এই ছবির অন্যতম বড় সম্পদ ডায়লগ। তবে ছবির পুরনো নাম ‘জালালের পিতাগণ’ মনে হয় বেশি যুক্তিযুক্ত ছিলো। নিশ্চয়ই বাধ্য হয়ে বা যৌক্তিক কোন কারণে ছবির নাম বদল করেছেন পরিচালক।
দর্শকদের বলি, হলে গিয়ে জালালের গল্প দেখুন। ঠকবেন না। ‘নাহ! বহুদিন পর বাংলাদেশের একটা বাংলা সিনেমা দেখলাম!’ সিনেমা হল থেকে এই তৃপ্তি নিয়েই ফিরবেন। বাংলা সিনেমার পাল্টে যাবার যুগসন্ধিক্ষণ বুঝি ঠিক করে দিলো জালালের গল্প।







