জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে চতুর্থ দিনের বক্তব্য দিতে এসে, জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সখ্যতা ও তাদের নিয়ে দেশে আওয়ামী লীগের সহিংস আচরণের বর্ণনা দিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
বৃহস্পতিবার বেলা ১২টার পর খালেদা জিয়া তার বক্তব্য শুরু করেন। বক্তব্যের শুরুতে বিচারকের উদ্দেশ্য খালেদা বলেন, আপনিও নিশ্চয় আমার সঙ্গে একমত হবেন যে মতবৈচিত্রের ঐক্য ও সমন্বয় হচ্ছে গণতান্ত্রিক সমাজে সৌন্দর্য। ভিন্ন মত দলন ও দমন নয়, প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসা নয়, বরং ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহ অবস্থানকে উৎসাহিত না করলে গণতন্ত্র টিকানো যায় না। আমরা সে কথা জানি, বুঝি এবং মানি।
তিনি বলেন, আপনি জানেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি পক্ষগুলোর মধ্যে ভিন্ন মতের দাবি আদায়ের পথে বারবার কতোটা সহিংস হয়ে উঠেছে।
খালেদা বলেন, আমি বেশি পিছনে ফিরে যাব না। সাম্প্রতিক অতীত থেকে কিছু উদাহরণ দিব। আজ যারা ক্ষমতায় আছে, তাদের একসময়কার সহযোগী জামায়াতে ইসলামী ও এরশাদ মিলে দেশে কি ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল তা আপনি জানেন। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্তাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে দেশে কি ধরনের হানাহানি ও নৈরাজ্যকর অবস্থা সৃষ্টি করেছিলো তা আপনারা সবাই জানেন।
দিনের পর দিন হরতাল অবরোধ দিয়ে তারা জনজীবনকে অচল করেছিলো। আমাদের জাতীয় অর্থনীতির পাইপলাইন ‘সমুদ্রবন্দরকে দীর্ঘদিন বন্ধ করে রেখেছিল। রেল স্টেশন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। সাধারণ মানুষের বাহনে বোমা মেরে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিল। গানপাউডার দিয়ে আগুন দিয়ে তারা মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে। বিভিন্নভাবে আরো বহু মানুষকে হত্যা করেছিল। কর্তব্যরত পুলিশের মাথা ইট দিয়ে থেতলে দিয়েছিল।
অফিসগামী মানুষকে ধরে দিগম্বর করে দিয়েছিলো। সচিবালয়ের ভেতরে মানুষকে হামলা করেছিলো। জানবাহন বন্ধ করে রেখেছিল। সিভিল প্রশাসনে বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা উস্কে দিয়েছিল। সর্বপরি সশস্ত্র বাহিনীকে ক্ষমতা দখলের জন্য প্রকাশ্যে উস্কে দিয়েছিলো।
তিনি আরও বলেন, ২০০১ সালে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আমরা ক্ষমতায় আসি। আবারও শুরু হলো রাজপথে আন্দোলনের নামে হানাহানি। যা আমাদের পুরো মেয়াদজুড়ে ছিল। সে সহিংসতা থেকে পুলিশ, সুপ্রিম কোর্ট, প্রধান বিচারপতির এজলাস পর্যন্ত রেহায় পায়নি। সে ধারাবাহিক সন্ত্রাসের পরিসমাপ্তি ঘটে প্রকাশ্যে রাজপথে বৈঠা দিয়ে পিঠিয়ে অনেক মানুষকে হত্যার মধ্য দিয়ে। এসব কর্মকাণ্ডের পরিণামও শুভ হয়নি। হানাহানির অজুহাতে জাতীয় নির্বাচন প্রক্রিয়াকে স্থগিত করে তখনকার সেনাপ্রধান অবৈধ ক্ষমতা দখলে নিয়ে তার অনুগত একটা গোষ্ঠিকে দিয়ে তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে। তাদেরকে সামনে রেখে সেনাপ্রধান সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। নির্বাচন দিতে সে অবৈধ শাসনকে দু বছর পর্যন্ত প্রলম্বিত করা হয়।
আপনি জানেন, আমি এ অবৈধ প্রক্রিয়াকে সমর্থন করিনি। বরং এখন যারা জনগণের ভোট ছাড়াই ক্ষমতায় তারাই উল্লাস করে সেই অবৈধদের সমর্থন করেছিলেন। তারা বলেছিলেন, এটি তাদেরই আন্দোলনের ফসল। কিন্ত অল্প সময়ের মধ্যে অবৈধ শাসকদের আসল চেহারা ও উদ্দেশ্য পরিস্কার হয়ে যায়। আমি এবং শেখ হাসিনা; দুজনকে মাইনাস করার উদ্দেশ্যে তারা সব ধরনের তৎপরতা শুরু করে। আমাকে গৃহবন্দী করা হয়। বিদেশে সফরত শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তিনি দেশে ফিরে এলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালত প্রাঙ্গনে তিনি অশোভন আচরণের শিকার হন। আমি তখন চুপ করে থাকতে পারতাম। কিন্তু অন্যায়কে আমি মেনে নিইনি। গৃহবন্দি অবস্থা থেকে শেখ হাসিনার প্রতি সে অন্যায় আচরণের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। আমি তার মুক্তি দাবি করেছিলাম।
মঈনউদ্দীন ফকরুদ্দীনের সরকার বৈধ ছিলো না। সংবিধান অনুযায়ী ছিলো না। তাই তাদের আমি সমর্থন জানাতে পারিনি। তারা আমাকে সপরিবারে দেশত্যাগ করতে বলেছিল। আমি তাদের কথা মানিনি। আমার ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভাবিনি। তাদেরকে স্পষ্ট ভাষায় বলেছি, বাংলাদেশের বাইরে আমার কোন ঠিকানা নেই। জীবনে মরণে আমি বাংলাদেশেই থাকতে চাই। অথচ শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ সেই অবৈধ সরকারকেই সমর্থন করেছিল। তারা তাদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানেও যোগ দিয়েছিলেন। তাদের পরামর্শে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছিলেন।
খালেদা জিয়া বলেন, সন্তান হারানোর ব্যাথা বুকে চেপে আমি এখনো দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করছি।
এদিকে খালেদা জিয়ার পক্ষে ব্যারিস্টার মওদুদের করা স্থায়ী জামিন আবেদন নাকচ করে দিয়ে ১৬ নভেম্বর পরবর্তী দিন ধার্য করেছে আদালত।







