বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভীষণ রকম আলোচিত এবং সমালোচিত রাজনৈতিক দল জাসদ। সেই জন্ম থেকে আজ অব্দি আলোচনা ও সমালোচনা পিছু ছাড়েনি এই দলটির। এখনও রাজনীতি আর গণমাধ্যমের আলোচনার ময়দান হঠাৎ হঠাৎ জাসদকে ঘিরে বড় বেশি উতপ্ত হয়ে উঠে। বিশেষ করে জাসদের অতীত এবং বর্তমান রাজনৈতিক কর্মকান্ডের পোস্টমর্টেম করতে গিয়ে সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, রাজনীতিবীদ, সমালোচকরা জাসদের তীব্র বিষোদাগার করতে ভুল করেন না। কখনও কখনও আওয়ামী লীগ-বিএনপির নেতৃবৃন্দের অনেকেও একই সাথে জাসদের অতীত রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আর ড্রয়িং রুমের বিপ্লবী থেকে শুরু করে কূলিন কমিউনিস্টদেরতো জাসদ রাজনীতির সমালোচনা করা অনেকটাই রুটিন ওয়ার্কের মতো।
১৫ আগস্ট, ৩১ অক্টোবর, ৭ নভেম্বর এলে জাসদকেই সবার আগে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। জাসদ রাজনীতির আত্মপ্রকাশ ছিল ১৯৭২ সালের ৩১ আক্টোবর, অর্থাৎ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ১০ মাসের মাথায়। জন্মের পরেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সিক্ত জাসদের দীপ্তিময় তারুণ্য রাজনীতির ময়দানে তীব্র ঝাঁকুনি তৈরি করেছিল। প্রতিবাদ প্রতিরোধের মধ্যে দিয়ে সমাজের তরুণদের বড় অংশের মন জয় করেছিল জাসদ। কিন্তু পরবর্তীতে নানা রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহ, ষড়যন্ত্র, নেতৃত্বের কোন্দলে একাধিকবার দ্বিধাবিভক্ত হওয়া কারণে জাসদ দ্রুতই তার তেজদীপ্ত রাজনৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলতে শুরু করে। তবে গত বছরের মার্চ মাসে সর্বশেষ জাসদের আরেক দফা ভাঙ্গন ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। কোনো তাত্ত্বিক বা আদর্শিক মতপার্থক্য বা রাজনৈতিক কৌশলকে কেন্দ্র করে নয়, ১১-১২ মার্চ অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদকের পদের লড়াইকে ঘিরে জাসদে আকস্মিক ভাঙ্গন ঘটে। সেই ভাঙ্গন নিঃসন্দেহে রাজনীতির মাঠে জাসদের শক্তিকে যেমন সংকুচিত করেছে তেমনি সমালোচনার দুয়ারও উন্মুক্ত করেছে। বর্তমান সময়ে দ্বিধাবিভক্ত দুই অংশের জাসদই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের অন্যতম সারথী।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজনৈতিক দল জাসদ গঠিত হয়েছিল মূলত যুদ্ধের ময়দানে নেতৃত্ব দেওয়া এবং যুদ্ধের ময়দান থেকে ফিরে আসা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়েই। বিশেষ করে বিএলএফ-এর একটি বড় অংশই ছিল জাসদের পতাকাতলে। আওয়ামী লীগের গর্ভ থেকে গঠিত হওয়ার পরপরই এই দলটি ক্ষমতায় থাকা খোদ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেই রাজপথে সবচেয়ে সোচ্চার ও সাহসী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। ৭৩ সালের ১৪ জানুয়ারি জাসদ যে দলীয় ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে সেখানে মুখবন্ধের প্রথম প্যারার শেষ অংশে নতুন দলের অাত্মপ্রকাশ সম্পর্কে লেখা হয়েছিল-সংগ্রামী জনতার বিক্ষুব্ধ মনের বহিঃপ্রকাশকে বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে এ দেশের আপামর কৃষক শ্রমিক ও মেহনতি মানুষ ও প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের আর্শীবাদপুষ্ট হয়ে আত্মপ্রকাশ করলো জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল।
তবে এখনও অনেকেই মনে করেন জাসদের আত্মপ্রকাশের ঘটনাই রহস্যাবৃত। সেই রহস্য আজো উন্মোচিত হয়নি বলেই প্রতীয়মান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এর সঠিক উত্তর জানেন একমাত্র জাসদ তৈরির নেপথ্য নায়ক সিরাজুল আলম খান। এর বাইরে আরো কারো পক্ষেই সঠিক উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। অনেকেই মনে করেন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা নেপথ্যে থেকেই জাসদকে রাজনীতির মাঠে নামিয়ে দিয়েছিল। অবশ্য জাসদ প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িতরা বরাবরই বিষয়টি নাকচ করে জাসদ কী লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা বলেছেন। জাসদ নেতৃবৃন্দ বারবারই বলতে চেয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে যে জাতীয় সরকারের স্বপ্ন লুকিয়েছিল সেই স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রত্যাখাত হওয়ার কারণেই নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদ রাজনীতির ময়দানে আবির্ভূত হয়। একথা সবারই জানা যে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অন্যতম নেতা তাত্ত্বিকখ্যাত সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বের অংশই মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে দেশ পরিচালনার জন্যে ‘জাতীয় বিপ্লবী সরকার’ গঠনের প্রস্তাবনা হাজির করেন। বিষয়টি নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগের সাথে মতদ্বৈততা শুরু হলে ছাত্রলীগ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে।
জাসদ জন্মের পর থেকেই রাজপথে থেকেছে। লড়াই সংগ্রাম করেছে। গোপন সংগঠন তৈরি করে আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকেও লড়াই করেছে। শাসক এবং শোষকের রক্ষচক্ষুকে উপেক্ষা করে জাসদের নেতা-কর্মীরা আন্দোলন-লড়াই-সংগ্রামে জীবন দিতে কৃপা করেনি। কর্ণেল আবু তাহের, সিদ্দিক মাস্টার, মোশাররফ হোসেন, জাফর-জয়নাল, তপন, মুনীর, জুয়েল, শাজাহান সিরাজ, মুন্না, ডা. মিলনসহ আরও অজস্র সমাজ বদলের স্বাপ্নিক মানুষ ও টগবগে তরুণের রক্তেই সিক্ত হয়েছে এই দলটি। হাজার হাজার নেতাকর্মী আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং এরশাদের আমলে চরমভাবে নির্যাতিত হয়েছে। কর্নেল আবু তাহেরের সাহসী জীবন দান জাসদ রাজনীতির সাহস এবং স্পর্ধাকেই সৌন্দর্যমন্ডিত করে গেছে।
জাসদ রাজনীতির ইতিহাসে এসবই সত্য, একটুও মিথ্যা নয়। প্রতিরোধে-প্রতিশোধ-এই গগণবিদারী শ্লোগানে সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাসদ প্রতিবাদ করেছে, সজাগ ও সতর্ক থেকেছে। কিন্তু রাজপথে জাসদের প্রতিবাদ প্রতিরোধকে ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে ভিন্ন ভিন্নভাবে মূল্যায়িত হয়েছে। জাসদের প্রতিবাদ প্রতিরোধ অনেকের চোখেই হঠকারিতার অপবাদেই কেবল বিদ্ধ হয়েছে। আবার জাসদ যখন জাতীয় প্রয়োজনে আওয়ামী লীগের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব গ্রহণ করেছে তখন সেটাকে কেবলই সুবিধাবাদ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
জাসদ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা আর বিতর্কের শেষ নেই। তবে উদ্দেশ্য প্রণোদিত একতরফা আলোচনা বরাবরই সত্যকে আড়ালে ঢেকে ফেলে। জাসদকে নিয়ে সেই ধারাবাহিকতা চলমান বললে ভুল হবে না। বিশেষ করে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর জাসদ আওয়ামী লীগের সাথে ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার পরপরই জাসদকে নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করা হয়। জাতীয় সংসদে জাসদকে নিয়ে একাধিকবার উত্তপ্ত আলোচনা হয়েছে। জাসদের প্রকাশ্যে সমালোচনা করে বিচারও দাবি করেছেন কেউ কেউ। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী এখনও মনে করেন বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল জাসদ, আওয়ামী লীগ নয়।
তাইতো রাজনীতিতে জাসদকে নিয়ে অনেক প্রশ্নের মীমাংসা এখনও হয়নি। আর তাই জাসদ বিরোধীরা প্রায়শই সমালোচনার ঝড় তুলতে ভুল করেন না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন অতীতে জাসদ রাজনীতির যে সব বড় ধরনের ভুল ছিল এর মধ্যে অন্যতম মুক্তিযুদ্ধের পর শেখ মুজিব সরকার উৎখাতে গোপন সশস্ত্র সংগঠন গণবাহিনী গঠন এবং আওয়ামী লীগের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া, ৭৫-এর রক্তাক্ত ১৫ আগস্টের পর ৭ নভেম্বর সিপাহী জনতার অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা, বীর উত্তম তাহেরকে মুক্ত করতে ইন্ডিয়ার হাই কমিশনে হামলা ইত্যাদি। কিন্তু এও সত্য রাজনীতির ময়দানে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত নিপীড়িত হয়েছে জাসদের নেতা কর্মীরা। ৭২ থেকে ৭৫ পর্যন্ত আওয়ামী শাসনামলের পর ফের জিয়ার আমলে জাসদের নেতাকর্মীরা যেভাবে নির্যাতিত হয়েছে তা আর কোনো দলের নেতাকর্মীরা হয়নি।
রাজনীতির ময়দানে জাসদকে নিয়ে যতো বিতর্ক আছে তার চুলচেরা বিস্তর বিশ্লেষণ এবং নির্মোহ আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সত্যকে অস্বীকার বা আড়াল করে বা প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে নয়। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে জাসদ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ক্ষমতার সহযোগী ও অংশীদার না হলে জাসদকে নিয়ে বোধ হয় কেউ বিতর্ক তুলতেন না। জনতার জাসদ আর ক্ষমতার জাসদ- কোনোটিই বোধ হয় জাসদ সমালোচকদের পছন্দ নয়। তবে এর সঠিক উত্তরটি রয়েছে জাসদ নেতৃবৃন্দের হাতেই। জাসদকে ঐক্যবদ্ধ না করতে পারলে আগামীতে আরও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হবে জাসদকে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








