পূর্ব ঘোষণা অনুসারে বুয়েট ক্যাম্পাসে সব ধরণের রাজনৈতিক সংগঠন এবং তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্বদ্যালয় (বুয়েট) কর্তৃপক্ষ। সেই সঙ্গে পৃথক আরেকটি বিজ্ঞপ্তিতে অবৈধ শিক্ষার্থীদের অবিলম্বে হল ছাড়ার নির্দেশ দেবার পাশাপাশি বুয়েটে থাকা ছাত্র সংগঠনগুলোর অফিসরুম বন্ধ করে তা সিলগালা করার জন্য ছাত্রকল্যাণ পরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বহুল আলোচিত বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পরে এ ধরণের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা এসেছে।
আবরার ফাহাদ বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের (১৭তম ব্যাচ) ছাত্র ছিলেন। তিনি থাকতেন বুয়েটের শেরেবাংলা হলের নিচতলায় ১০১১ নম্বর কক্ষে। গত ৬ অক্টোবর রাত আটটার দিকে তাকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় একই হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে। ওই কক্ষে তাকে নির্যাতন করে বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। রাত ৩টার দিকে হল থেকেই তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
এরপর থেকে শিক্ষার্থীরা ১০ দফা দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু করে। যার মধ্যে একটি দাবি ছিল বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ওই দাবির প্রতি পরোক্ষ সমর্থন জানিয়ে বুয়েট প্রশাসনকে ওই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার পূর্ণ স্বাধীনতার কথা মনে করিয়ে দেন। এরপরে বুয়েট প্রশাসন ওই ঘোষণা দেন। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ওই দাবিকে সমর্থন জানালেও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।
ঐতিহাসিকভাবে দেশের রাজনীতিতে ছাত্ররা বড় ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু বর্তমানে ছাত্র রাজনীতি বিশেষ করে হল-সিটসহ নানা বিষয়ে নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের আচরণে নিয়ে বেশ ক্ষুব্ধ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বুয়েটে আবরার হত্যার পরে এবং এরসঙ্গে জড়িত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সরাসরি জড়িত থাকার বিষয়গুলো প্রকাশ পেতে শুরু করলে সেই ক্ষোভ আর আশঙ্কা দাবিতে রূপ নেয়। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি কি ছাত্রদের স্বার্থে কাজ করছে, নাকি বিভিন্ন দলের পেশীশক্তি হিসেবে কাজ করছে? এই প্রশ্নকে সামনে রেখে বিতর্ক-যুক্তি প্রদর্শন চলছে। ঐতিহ্যময় রাজনীতি পুরোপুরি বন্ধ নাকি সংস্কার? এই আলোচনাও চলছে। বুয়েটে সংগঠন ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধের যে সিদ্ধান্ত তা কতোটুকু যৌক্তিক বা সময়োপযোগী তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। তবে ছাত্র রাজনীতি বুয়েটে যে পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, বন্ধ করাতে তা সাময়িকভাবে হলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতিবাচক হয়েছে বলে আমাদের মনে হয়েছে।
ছাত্র রাজনীতি বন্ধের বিপক্ষে অনেকে সরাসরি দ্বিমত জানাতেও শুরু করেছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, এমন সিদ্ধান্তের ফলে দেশবিরোধী, অপশক্তি ও স্বাধীনতা বিরোধীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। তাদের শঙ্কার যথেষ্ট কারণ ও যুক্তি আছে বলে আমাদের মনে হয়েছে। ইতিহাস বলে, রাজনীতির সামনের খোলা পথ যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন চিপাগলি ও পেছনের পথ দিয়ে চলাচল বেড়ে যায়। আর সেপথে কে আসে, কে যায়, তা দেখা আসলে মুশকিল।
ছাত্র রাজনীতি বন্ধের এই সুযোগকে কোনো অপশক্তি যেনো ব্যবহার করতে না পারে, সে দিকে কড়া নজর রাখা দরকার বলে আমরা মনে করি। এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-প্রশাসনের মধ্যে সম্পর্ক কীভাবে ছাত্র ও প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে কাজে লাগতে পারে, তা নিয়েও কাজ শুরু করা উচিত। আমাদের আশাবাদ, ছাত্র-শিক্ষক-সরকার সবাই মিলে সে বিষয়ে চিন্তা করে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন।








