বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘ এক অস্থিরতার ইতিহাস। এই বাজারে যেমন রাতারাতি উত্থানের গল্প আছে, তেমনি আছে হাজারো মানুষের নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার কাহিনি। গত তিন দশকে দেশের অর্থনীতি বড় হয়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, শিল্পায়ন বিস্তৃত হয়েছে, অবকাঠামো উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে; কিন্তু সেই তুলনায় পুঁজিবাজার কখনোই শক্তিশালী ও স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি। বরং বাজারকে ঘিরে বেশি আলোচিত হয়েছে কারসাজি, সিন্ডিকেট, অস্বচ্ছতা, নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা।
বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ এখনো বাজারকে নিরাপদ বিনিয়োগের জায়গা হিসেবে দেখতে পারেন না। ঠিক এই বাস্তবতার মধ্যেই বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন করপোরেট অঙ্গনের পরিচিত মুখ মাসুদ খান। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান এবং ক্রাউন সিমেন্ট পিএলসির গ্রুপ সিইও হিসেবে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা এই ব্যক্তিত্ব এখন এমন এক খাতের নেতৃত্বে, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে লাখো মানুষের জীবনে।
এই নিয়োগকে কেবল প্রশাসনিক রদবদল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ এটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি একই সঙ্গে কয়েকটি বড় চাপের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট, বিনিয়োগ স্থবিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে এখন দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
অর্থনীতিবিদেরা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন, ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। শিল্পায়ন, বড় অবকাঠামো প্রকল্প এবং উদ্যোক্তা তৈরির জন্য একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় পুঁজিবাজার এখনো সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি, যেখানে এটি অর্থনীতির প্রকৃত চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
মাসুদ খানের নিয়োগের মধ্য দিয়ে সরকারের একটি সুস্পষ্ট বার্তাও ফুটে উঠেছে। সেই বার্তা হলো—পুঁজিবাজার পরিচালনায় এখন বাস্তব করপোরেট অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল, নীতিনির্ধারণ এবং বাজারের বাস্তব অর্থনীতির মধ্যে একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে। যারা উৎপাদন, বিনিয়োগ, শেয়ারহোল্ডারদের প্রত্যাশা, করপোরেট ঝুঁকি এবং বাজারের মনস্তত্ত্ব বোঝেন, তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ন্ত্রক সংস্থায় যথেষ্ট প্রতিফলিত হয়নি। সেই জায়গা থেকেই হয়তো সরকার এবার এমন একজনকে বেছে নিয়েছে, যিনি বহু বছর ধরে করপোরেট বাস্তবতার মধ্য দিয়ে গেছেন।
করপোরেট অঙ্গনে মাসুদ খানকে একজন দক্ষ ও কৌশলী ব্যবস্থাপক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ক্রাউন সিমেন্টের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠী পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাকে ব্যবসার ঝুঁকি, বিনিয়োগকারীদের আচরণ এবং আর্থিক ব্যবস্থার বাস্তবতা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা দিয়েছে। অন্যদিকে ইউনিলিভারের মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তাকে আন্তর্জাতিক মানের করপোরেট গভর্ন্যান্স, কমপ্লায়েন্স সংস্কৃতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভিজ্ঞতা দিয়েছে। ফলে অনেকেই মনে করছেন, এই অভিজ্ঞতা বিএসইসিতে নতুন ধরনের পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গি আনতে পারে।
তবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সংকট এত গভীর যে শুধু করপোরেট অভিজ্ঞতা দিয়েই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কারণ এখানে সংকট কেবল নীতিমালার নয়, প্রয়োগেরও। বহুবার নতুন আইন হয়েছে, নতুন বিধিমালা এসেছে, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন খুব কমই দৃশ্যমান হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ এখন ঘোষণার চেয়ে বাস্তব ফল দেখতে চান। তাদের অভিজ্ঞতা বলছে, কাগজে কঠোর আইন থাকলেও প্রয়োগ দুর্বল হলে বাজারে শৃঙ্খলা ফেরানো যায় না।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে ১৯৯৬ সালের ধস এবং ২০১০-১১ সালের ভয়াবহ বিপর্যয় এখনো সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি। সেই সময় হাজার হাজার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী তাদের সঞ্চয় হারিয়েছেন। কেউ জমি বিক্রি করেছেন, কেউ অবসরভাতা বিনিয়োগ করেছেন, কেউ ঋণ নিয়ে বাজারে নেমেছিলেন। বাজার ধসে যাওয়ার পর অসংখ্য পরিবার অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আজও সেই স্মৃতি বাজারের ভেতর জীবন্ত। ফলে নতুন চেয়ারম্যানের জন্য এটি শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি আস্থা পুনর্গঠনের লড়াই।
২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিএসইসির চেয়ারম্যান ছিলেন এম খাইরুল হোসেন। তার সময় আইপিও বাজার নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠে, নিম্নমানের বহু কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে এবং অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব প্রক্রিয়াকে দুর্বল করা হয়েছে। এরপর শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের সময় বাজারে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি, সিন্ডিকেট এবং নির্দিষ্ট শেয়ারে অস্বাভাবিক ওঠানামার অভিযোগ সামনে আসে। বাজারের একটি অংশের মতে, ওই সময় সেকেন্ডারি মার্কেটে কারসাজিকারীদের প্রভাব আরও বেড়ে যায় এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পরবর্তী সময়ে দায়িত্বে আসেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। তার সময় বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ না থাকলেও নেতৃত্বে দৃঢ়তা ও কার্যকরতা নিয়ে হতাশা ছিল বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে। কমিশনের ভেতরেও কাজের ধীরগতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার অভিযোগ ওঠে। এমনকি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চেয়ারম্যানসহ কমিশনের সদস্যরা নিজেদের কর্মীদের হাতে নাজেহালের শিকার হন। এই ঘটনা শুধু প্রশাসনিক সংকট ছিল না; বরং এটি নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
এই বাস্তবতায় দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই মাসুদ খান কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বাজারে অযাচিত নিয়ন্ত্রণ কমানো হবে, তবে যেখানে প্রয়োজন সেখানে “স্মার্ট রেগুলেশন” বা আধুনিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। তিনি কমিশনকে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর ও ডিজিটাল কাঠামোয় রূপান্তরের কথাও বলেছেন। তার ভাষায়, এমন একটি কমিশন গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কাজ দ্রুত হবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে এবং নজরদারি কার্যকর হবে।
এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আধুনিক পুঁজিবাজার এখন সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর। বিশ্বের বড় বড় বাজারে রিয়েল-টাইম নজরদারি, অ্যালগরিদমিক পর্যবেক্ষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে কারসাজি শনাক্ত করা হয়। অথচ বাংলাদেশের বাজারে এখনো অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে। দ্রুত তদন্ত, ডিজিটাল ডেটা বিশ্লেষণ এবং তথ্যপ্রবাহের ঘাটতি বাজারকে দুর্বল করে রেখেছে। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কার্যকর করতে পারলে সেটি বাজারে বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
মাসুদ খান কারসাজি দমনের প্রশ্নেও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে রিয়েল-টাইম ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই বাজারে অভিযোগ রয়েছে, কারসাজির ঘটনা ঘটলেও তদন্ত শেষ হতে অনেক সময় লেগে যায়। ফলে অনিয়মকারীরা সহজেই দায় এড়িয়ে যেতে পারে। নতুন চেয়ারম্যান যদি এই জায়গায় বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারেন, তাহলে সেটি বাজারে বড় বার্তা হবে।
তবে মাসুদ খানের করপোরেট পটভূমি যেমন সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি কিছু প্রশ্নও তুলছে। কারণ দীর্ঘদিন করপোরেট জগতে থাকা একজন ব্যক্তিকে এখন সেই করপোরেট খাতকেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ফলে স্বার্থের সংঘাত এড়ানো, নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনে বড় করপোরেট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া তার জন্য বড় পরীক্ষা হবে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, তার সফলতার অন্যতম বড় মাপকাঠি হবে—তিনি কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের আরেকটি বড় সংকট হলো বিনিয়োগ সংস্কৃতির দুর্বলতা। উন্নত বাজারগুলোতে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি, কোম্পানির মৌলভিত্তি এবং ভবিষ্যৎ আয়ক্ষমতা বিবেচনায় বিনিয়োগ করেন। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই দ্রুত মুনাফার মানসিকতা প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে গুজব, ফেসবুকভিত্তিক তথাকথিত পরামর্শ, কৃত্রিম চাহিদা তৈরি এবং সিন্ডিকেটের প্রভাব সহজেই বাজারকে অস্থির করে তোলে। এতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি বাজারের স্বাভাবিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি আকারে বড় হলেও পুঁজিবাজার সেই অনুপাতে গভীর হয়নি। বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর অনেকেই এখনো বাজারে আসতে আগ্রহী নয়। কারণ বাজারে অস্থিরতা, মূল্য কারসাজি এবং আস্থাহীনতা ভালো কোম্পানিগুলোকেও নিরুৎসাহিত করে। ফলে তালিকাভুক্ত কোম্পানির গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন থাকে। নতুন চেয়ারম্যানের অন্যতম বড় কাজ হবে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে স্বচ্ছ ও শক্তিশালী কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে আগ্রহী হবে।
মাসুদ খান ইতিমধ্যে সরাসরি তালিকাভুক্তির নতুন কাঠামো তৈরির কথা বলেছেন। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে যে প্রচলিত আইপিও প্রক্রিয়া জটিল, সময়সাপেক্ষ এবং অনেক ক্ষেত্রে অস্বচ্ছ। অনেক উদ্যোক্তা মনে করেন, বাজারে আসার চেয়ে ব্যাংকঋণ নেওয়া তুলনামূলক সহজ। অথচ একটি সুস্থ অর্থনীতিতে পুঁজিবাজারই হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের প্রধান উৎস। ফলে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়াকে আধুনিক, দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্য করতে না পারলে বাজারের কাঙ্ক্ষিত বিস্তার ঘটবে না।
বিদেশি বিনিয়োগও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত স্বচ্ছতা, নীতির ধারাবাহিকতা, করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে প্রায়ই নীতির আকস্মিক পরিবর্তন, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা দেখা গেছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অনেক সময় সতর্ক অবস্থানে থাকেন। নতুন কমিশন যদি স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক আস্থাও বাড়তে পারে।
মিউচুয়াল ফান্ড খাতের দুর্বলতাও দীর্ঘদিনের সমস্যা। একসময় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের তুলনামূলক নিরাপদ অংশগ্রহণের মাধ্যম হিসেবে যে খাতকে দেখা হতো, সেটি ধীরে ধীরে আস্থাহীনতায় ভুগতে শুরু করে। অনেক ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপনা, লভ্যাংশ নীতি এবং স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ফলে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ এই খাত থেকেও দূরে সরে যায়। অথচ উন্নত বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শক্তিশালী উপস্থিতি বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
নতুন চেয়ারম্যানের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো বিএসইসির অভ্যন্তরীণ সংস্কার। একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা কার্যকর হতে হলে তার নিজস্ব জনবলকেও দক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং পেশাদার হতে হয়। অতীতে কমিশনের ভেতরে নানা ধরনের অসন্তোষ, ধীরগতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার অভিযোগ ছিল। ফলে শুধু বাইরের বাজার নয়, সংস্থাটির ভেতরের কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা জরুরি।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এখন পুঁজিবাজারের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরেই খেলাপি ঋণ এবং তারল্যচাপের সমস্যায় ভুগছে। ফলে বড় শিল্প ও অবকাঠামো খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস প্রয়োজন। সেই জায়গায় শক্তিশালী পুঁজিবাজার বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সেই সক্ষমতা অর্জনের জন্য বাজারকে স্বচ্ছ, স্থিতিশীল এবং বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে।
মাসুদ খানের প্রথম দিনের বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—কৃত্রিমভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ না করার ঘোষণা। অতীতে বিভিন্ন সময় সূচক ধরে রাখা বা দরপতন ঠেকাতে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। এতে সাময়িক স্থিতিশীলতা এলেও দীর্ঘমেয়াদে বাজারের স্বাভাবিক আচরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। কারণ একটি বাজারের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে তার স্বচ্ছতা এবং মৌলভিত্তিক আস্থার ওপর, কৃত্রিম সমর্থনের ওপর নয়।
তবে পুঁজিবাজার সংস্কারের পথ কখনোই সহজ নয়। এখানে অর্থনৈতিক স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রভাব, করপোরেট শক্তি এবং লাখো বিনিয়োগকারীর আবেগ একসঙ্গে জড়িত থাকে। ফলে যেকোনো সিদ্ধান্তের প্রভাবও বহুমাত্রিক হয়। একটি ভুল সিদ্ধান্ত বাজারে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে, আবার একটি সাহসী সংস্কার দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সংস্কৃতির পরিবর্তন। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, দ্রুত বিচার এবং নীতির ধারাবাহিকতা ছাড়া এই বাজারকে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে নেওয়া সম্ভব নয়। সেই বাস্তবতায় মাসুদ খানের নেতৃত্বকে ঘিরে যেমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তেমনি সংশয়ও রয়েছে। কারণ এই বাজার অতীতে বহু প্রতিশ্রুতি শুনেছে, বহু সংস্কারের ঘোষণা দেখেছে, কিন্তু প্রত্যাশিত ফল পায়নি।
এখন দেখার বিষয়, করপোরেট বোর্ডরুম থেকে উঠে আসা এই নতুন অভিভাবক সত্যিই কি পুঁজিবাজারকে নতুন আস্থার পথে নিতে পারেন, নাকি তিনিও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক-প্রশাসনিক বাস্তবতার ভেতর আটকে পড়বেন। তার সফলতা বা ব্যর্থতা শুধু একজন চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত অর্জন হবে না; সেটি প্রভাব ফেলবে দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, বিনিয়োগ সংস্কৃতি এবং লাখো সাধারণ বিনিয়োগকারীর বিশ্বাসের ওপর।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







