বেহালার মত দেখতে কিন্তু বেহালা নয়। আকারে বিশাল একটি বেহালার মত। কেউ কেউ বড় বেহালা বলে ডাকে। কিন্তু এর নাম চেলো। যন্ত্রটিকে সামনে রেখে ছড় দিয়ে বাজাতে হয়। যার সুরে কণ্ঠ খুব ভালো যেতে পারে বলে মনে হয়। ডাচ চেলোতে বেজে ওঠে রবীন্দ্র সুর। ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে / বহে কিবা মৃদু বায়। এর পরে ওঠে সুর, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলোরে। চেলোর বাদন চলছে, আর চলছে অসংখ্য শ্রোতার তালির সঙ্গত।
নন্দকোষে করুণ রাগিণীর চলন দিয়ে শুরু হয়েছিল ডাচ সঙ্গীতজ্ঞ সাসকিয়া রাও দ্য হাস এর প্রায় এক ঘণ্টার সুরের সন্তরণ । তবলায় পণ্ডিত যোগেশ সামসির অসাধারণ তবলা বাদন। আর তানপুরায় টিংকু শীল ও অভিজিৎ কুণ্ড এর যথাযোগ্য সঙ্গত। গোলাপী শাড়ি আর সবুজ ব্লাউজের সমন্বয়ে ইউরোপ-প্রাচ্য মিলে মিশে একাকার। পোশাক মানুষের ইউরোপ প্রাচ্যের সংমিশ্রণ পূর্ণতা পায় রবীন্দ্র সুরে এসে।
ধীরে ধীরে ভোর ফুঁটে উঠছে। সেতারের ললিত বিস্তার রাগে। গত ছালায়। পন্ডিত বুদ্ধাদিত্য মুখার্জির সেতারের তারে আঙ্গুলের জাদুর ছোঁয়ায় শীতের রাত কেঁটে ভোরের দিগন্ত রেখা ঐ। সেতারের সুর অলংকৃত হয় সৌমিত হালদার এর শ্রবণমধুর তবলা বাদনে।

মণিপুরী, ভরতনাট্যম এবং কত্থক দিয়ে শুরু বেঙ্গল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ২০১৭ এর চতুর্থ সন্ধ্যা। চ্যানেল আই যার সম্প্রচার সহযোগী। সেখান থেকে বেঙ্গল পরম্পরা সঙ্গীতালয়ের শিক্ষার্থীদের বাদন শৈলী, ওস্তাদ রশীদ খানের সন ভেজানো খেয়াল, পণ্ডিত তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুদার আর ড. মাইশুর মঞ্জুনাথ এর সরোদ-বেহালা যুগলবন্দী। তারপর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে মেওয়াতি ঘরাণার গুরু পণ্ডিত যশরাজ এর খেয়ালে সুরবিহার। অতঃপর চেলো ও সেতারের শেষ রাত্তির। প্রকৌশলী, ভ্রমণ লেখক ও নির্মাতা শাকুর মজিদ যথার্থ লেখেন, রাতের শেষের শিশির ফোটা ঘুম ঘুম আধ বোজা চোখে তীক্ষ্ণ ছয় তারের শিহরনীয়া।
দ্রুত হরকতে সেতারে ললিত বিস্তারে ভোর আসতে থাকে। হঠাৎই থামে সুর। যখন মনে হচ্ছিল চলবে বাদন আরো কিছুক্ষণ। আচমকা থেমে যাওয়ায় অতৃপ্তি মনে ঠাঁই নেয় ঠিক, তবে আগমী সময়ের অপেক্ষায়ও প্রস্তুত করে দেয়। সুন্দরের কিংবা শিল্পের স্থায়িত্বের কি কোন মেয়াদ থাকে? অপেক্ষা সুন্দর ও শিল্পকে তৈরী করে।
শনিবার উৎসবের পঞ্চম ও শেষ দিন। ওড়িশি নাচ, মোহন বীণা, পঞ্ডিতের খেয়াল, সেতার আর চৌরাসিয়ার বাঁশিতে থেমে যাবে সব। সামনে পড়ে থাকবে এক বছরের অপেক্ষা।
ছবি: তানভীর আশিক










