আমি ঈশ্বরের বাড়ির পাশ দিয়েই ঘুরি,
এবং জ্ঞান বৃক্ষের ফল খাই নিয়মিত
চার হাত পায়ে ভিন্ন রঙের জাল,
মৌরলা মাছ খেলে নদীর জলে –
তৃনলতা-আঙুরের রস – বুকের মধ্যেই ;
ছিল দরজা হাট, ফুলের চাঁদ-বাড়ি
আমি ঈশ্বরের বাড়ির পাশ দিয়েই ঘুরি ।
সত্যিই ঈশ্বরের কাছেই পারি জমালেন বাংলা সাহিত্যে হাংরি আন্দোলন এর একজন খ্যাতনামা কবি উৎপল কুমার বসু। কলকতার দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা জানিয়েছে কয়েক দিনের অসুস্থতার পর আজ শনিবার দুপুরে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান পঞ্চাশ দশকের কলকাতার অন্যতম শক্তিমান কবি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।
কবির পরিবার সূত্রে জানা যায়, কয়েক দিন আগে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন কবি। দক্ষিণ কলকাতার একটি ক্লিনিকে ভর্তি ছিলেন তিনি। সেখানেই আজ দুপুরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পরোলোক গমন করেন কবি।
১৯৩৭ সালে কলকাতার ভবানীপুরে জন্ম উৎপল কুমার বসুর। ৫০’র দশকে যাত্রা শুরু কবি উৎপল কুমার বসুর। ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত হয় বুৎপল কুমার বসুর প্রথম কাব্যগ্রন্থ চৈত্রে রচিত কবিতা। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এরপর পুরী সিরিজ, আবার পুরী সিরিজ, লোচনদাস কারিগর, খণ্ডবৈচিত্রের দিন, শ্রেষ্ঠ কবিতা, সলমাজরির কাজ, পদ্যসংগ্রহ, কবিতাসংগ্রহ, কহবতীর নাচ, নাইট স্কুল, টুসু আমার চিন্তামণি, বক্সিগঞ্জে পদ্মাপাড়ে, সলমা জরির কাজ প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ।
কাব্যশৈলী, অভিব্যক্তি এবং কবিতার কাঠামো দিয়েই অচিরেই পাঠক মনে জায়গা করে নেন তিনি। ২০০৬ সালে তাঁর কাব্যগ্রন্থ সুখ-দুঃখের সাথীর জন্য জেতেন আনন্দ পুরস্কার। ২০১৪ সালে পান সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার।
বাংলা সাহিত্যে স্হিতাবস্হা ভাঙার আওয়াজ তুলে, ইশতেহার প্রকাশের মাধ্যমে, শিল্প ও সাহিত্যের যে একমাত্র আন্দোলন হয়েছে, তার নাম হাংরি আন্দোলন, যাকে অনেকে বলেন হাংরিয়ালিস্ট, ক্ষুধিত, ক্ষুৎকাতর, ক্ষুধার্ত আন্দোলন। সেই আন্দোলনের অন্যতম ছিলেন উৎপল কুমার বসু। ১৯৬০ পর্যন্ত তিনি কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর কবি হিসাবে পরিচিত ছিলেন ।
১৯৬১ সালে হাংরি আন্দোলন এর সূত্রপাত ঘটতেই তাতে যোগ দেন, এবং তাঁর কবিতা রচনার ধারায় বাঁকবদল ঘটে । হাংরি আন্দোলন এর কারণে ১৯৬৪ সালে তাঁর বিরুদ্ধেও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল । সেকারণে তিনি যোগমায়া দেবী কলেজের অধ্যাপনা থেকে বরখাস্ত হন ।
১৯৬৫ সালে অভিমানাহত উৎপল লন্ডনে গিয়ে বসবাস আরম্ভ করেন । সেখানে তিনি শিক্ষকতা করতেন । লন্ডনে বসবাসকালে তিনি বিবাহ করেন এবং কবিতা লেখা থেকে সাময়িক বিরতি নেন ।
দুই দশক পর কলকাতায় ফিরে উৎপলকুমার বসু পুনরায় কবিতা লেখা আরম্ভ করেন । তাঁর সমসাময়িক, এমনকি তরুণতর কবিদের তুলনায় তাঁর কবিতা ছিল সম্পূর্ণ নূতন । নিরাসক্ত ও নির্লিপ্তভাবে বস্তুস্বভাবের যথাযথ বর্ণনা তাঁর কবিতার মুখ্য বৈশিষ্ট্য । বস্তুর অভ্যন্তর সত্যের অভিমুখে কবিতাকে চালনা করেছেন উৎপল । তাঁর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা জীবন প্রকৃতি কোনো রহস্যভূমি রচনা না করেই তাঁর কবিতে মেলে ধরে বর্তমান সমাজবাস্তবতা । উৎপলকুমার বসু বহুলব্যবহৃত শব্দগুলোকে কবিতার শরীরে এমনভাবে স্হাপন করেছেন যে তার ফলে তৈরি হয়েছে বাক্যের নূতন মাত্রা । অনেকে অবশ্য বলেন তাঁর কবিতা ‘আকারসর্বস্ব’।
বাংলাদেশের কবিদের মধ্যেও তিনি ছিলেন ব্যাপক জনপ্রিয়। তাঁর মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অনেকেই শোক প্রকাশ করছেন।






