রামপুরা পলাশবাগের ৩৪৯ নম্বর বাড়িটির একদিকে ছাদকৃষির আয়োজন। অন্যদিকে পরিপূর্ণ নার্সারি ও কৃষি উপকরণের এক ক্ষেত্র। তিনতলা ভবনের সাড়ে ১২শ স্কয়ার ফিটের ছাদটিতে উৎপাদন করা হচ্ছে আম, আনারস, আনার, সফেদা, পেয়ারা, আমড়াসহ ৩০ থেকে ৩৫ জাতের ফলফলাদির চারা। এছাড়াও বিলুপ্ত জাতের লুকলুকি, ডেওয়া, জাম, লিচু, টমেটো, মাল্টা, পিচ ফল, আলু বোখারার চারাও মিলছে এখানে। উদ্যোক্তা গোলাম হায়দার গত পনের বছর ধরে সফলভাবে সাজিয়ে চলেছেন এই আয়োজন।
ছাদ কৃষি উদ্যোক্তাদের কাছে ভালো মানের চারা পৌঁছে দিতেই গোলাম হায়দার শুরু করেছিলেন ছাদের এই নার্সারি। আর বলাই বাহুল্য তিনি একজন আদর্শ ছাদকৃষি উদ্যোক্তা। তার কাছ থেকে উপকরণ আর বুদ্ধি পরামর্শ নিয়ে অনেকেই গড়ে তুলেছেন সফল ছাদকৃষি। তাই নিজেকে শতভাগ যুক্ত করেছেন এই কাজের সাথে।
গোলাম হায়দার বলেন, আমি এখন পুরোপুরি আমার ছাদবাগানের কাজে সম্পৃক্ত। বসুন্ধরাতে আমার নার্সারি সেল সেন্টার আছে, আশুলিয়াতে নার্সারি প্রটেকশন সেন্টার আছে। আমি ফুল চাষও করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে মাস্টার্স করেছি আর আইবিএতে ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং করেছি। কৃষিই এখন আমার পেশা ও নেশা। আর্থিকভাবেও বেশ ভালো আছি।
নগরকে দূষণমুক্ত করার এই মন্ত্রটি ছড়িয়ে দিতে গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশ ‘গ্রীন রুফ মুভমেন্ট’ নামের একটি সংগঠনও। এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন প্রায় দেড়শ ছাদ কৃষি উদ্যোক্তাকে। যার মাধ্যমে কৃষির নতুন নতুন তথ্য ও কলা কৌশল সম্পর্কে ধারণা দিয়ে যাচ্ছেন। বলেন, আমরা যখন গ্রীন রুফ মুভমেন্টের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করি তখন চারার খোঁজে তারা বিভিন্ন নার্সারিতে যায়। কিন্তু তারা যখন নার্সারি থেকে গাছ আনে তখন ভালো ফল পায়না। তাই সেসব আমি নিজেই সংগ্রহ করার চেষ্টা করি। ঢাকা শহরের প্রায় সাড়ে চার লাখ দালান কোঠার মাত্র ৫ শতাংশের ছাদে কৃষি কাজ হয়।
গোলাম হায়দারের নার্সারিতে রয়েছে প্রায় ১৫ জাতের অর্কিড। এছাড়াও মুল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য জাতের ক্যাকটাসও তৈরি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, টিস্যু কালচারের মাধ্যমেই অনেক কিছুর কলম করছি আমরা। টিস্যু কালচার আমাদের দেশে খুব কঠিন ব্যাপার, এখানে সেভাবে অর্কিডের চারা করার চেষ্টা করেছিলো কয়েকজন অনেক আগে। এখন আবার ডিমান্ড তৈরি হয়েছে বলেই সেসব করা হচ্ছে। সদস্যরাও ছাড়া অনেকেই অর্কিড এখান থেকে সংগ্রহ করতে পারে।
প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জাতের আমের গাছ আছে। যার মধ্যে রয়েছে হাড়িভাঙ্গা আমের গাছও। রয়েছে দেশী বিদেশী বিভিন্ন জাতের টমেটো।

সাম্প্রতিক সময়ে নগরের বহু ছাদ কৃষি ও নার্সারিতে আনারের গাছ দেখা যায়। এই ছাদে এসেও বেশ কয়েক রকমের আনার গাছের দেখা পেলাম। রয়েছে আপেলের গাছও। গরম আবহাওয়াতেও আপেল ফলানো সম্ভব কিনা তা পরীক্ষা করছেন গোলাম হায়দার। শোনা যায় ১০ ডিগ্রির নিচে তাপমাত্রা না নামলে নাকি আপেল চাষ করা সম্ভব হয়না। তবুও চেষ্টা করে দেখছেন গোলাম হায়দার। এছাড়াও স্ট্রবেরির এ্যাকুয়াফনিক্স ডেমোনেস্ট্রশন করা হয়েছে ছাদে। এই সিস্টেমে মাছ থাকবে নিচে আর মাছের পানিটা গাছে চলে আসবে। মাছকে যে খাবার দেওয়া হবে সেখান থেকেই পুষ্টি পাবে গাছ। মাছের বিষ্ঠাসহ অন্যান্য উপাদান গাছের গোড়ায় আসবে। তাকে আলাদা কিছু দিতে হবে না। এই পদ্ধতিতে সবজির চাষ ভালো হয় বলেই জানান এই কৃষি উদ্যোক্তা।
বৈষ্ণিক উষ্ণতা বৃদ্ধি মোকাবিলা ও জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে নগর জীবন খাপ খাইয়ে নিতে ছাদ কৃষি উদ্যোগ এখন সময়ের অন্যতম দাবি। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি সংগঠনগুলোর আরো আন্তরিকতার সাথে কাজ করা দরকার বলে মনে করেন গোলাম হায়দার। বলেন, আমরা বলছি দেশে ছাদকৃষি ম্যান্ডাটরি করার জন্য। টোকিওতে ২৫ শতাংশ ছাদকৃষি করতে হয়। রাজউক বা রিহ্যাব এটা করতে পারে। সিটি কর্পোরেশনও এই কাজ করতে পারে। সিটি কর্পোরেশনের সুরম্য ভবনে আগে একটা ছাদকৃষি করার আহবান জানাচ্ছি আমরা। তারা গাছ লাগালে অন্যরা উৎসাহিত হবে। গ্রীন ব্যাংকিংয়েও রুফটপ গার্ডেনিংকে ইন্সপায়ার করছে। কেউ আয়ের উৎস দেখাতে পারলে তাকে লোনও দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বিশ্বাস করেন, এই ছাদ কৃষি কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হতে পারে বহু মানুষের কর্মসংস্থানও। অনেকে এটাকে মোবাইল প্রফেশন হিসেবেও নিতে পারেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ছাদ কৃষির কিছু সমস্যা নিয়ে উদ্যোক্তা গোলাম হায়দারের পাশে দাঁড়ান গাছের ডাক্তারখ্যাত উদ্যান বিশেষজ্ঞ কৃষিবিদ কামরুজ্জামান। সমাধান দেন সেসব সমস্যার।
এই বর্ষায় পাঠকরাও তাদের ছাদকৃষি সাজাতে পারেন মনের মতো করে। যুক্ত করতে পারেন নতুন নতুন ফল ফসলের গাছ ও চারা। গোলাম হায়দারের ব্যতিক্রমী এই ছাদকৃষি উদ্যোগ উৎসাহ যোগাতে পারে বাণিজ্যিক উদ্যোক্তাদের। বিশেষ করে যারা ছাদে বাণিজ্যিক নার্সারি গড়ে তুলতে চান তাদের জন্য এটি হতে পারে অনুকরণীয় ও আদর্শ এক ক্ষেত্র। আমরা বিশ্বাস করি, গোলাম হায়দারের মতো উদ্যোক্তাদের সহযোগিতায় রাজধানীতে দ্রুত সম্প্রসারিত হবে ছাদ-কৃষি। আর আপনার ছাদকৃষির সাফল্য তুলে ধরতে আমরা তো আছিই।








