বিশ্ব ফুটবলের মাঠের যুদ্ধটা শুরু হবে ‘মহান’ রাশিয়ার শহরে শহরে। তার আগেই বিশ্বজুড়ে, দেশে দেশে, শহরে শহরে, ঘরে ঘরে, পথে পথে, চায়ের কাপে, অফিসে কাজের টেবিলে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
আর, মাঠের বাইরে মাঠের খেলা ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশের যুদ্ধটা সত্যি সত্যি ‘ক্লাসিক’! মূল যুদ্ধটা শুরু হবে ১৪ জুন। আর আমাদের চায়ের কাপে ঝড় বইতে শুরু করেছে অনেক আগে থেকেই। এখানে লিখে রাখা কী বাহুল্য হবে যে ফুটবলের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ছিলো না কোনোকালে; নিকট ভবিষ্যতে জায়গা হবে; এমন বিজলি সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না ! তাহলে ফুটবলের এই আসর নিয়ে এতো মাতামাতি কেনো আমাদের?
১. ফুটবল ভালোবাসি বলে?
২. স্কুলবেলায় আমাদের মহান ব্রাজিলিয়ান কালো মানিক বা পেলের জীবনী পড়ানো হয়েছিলো বলে? বাংলা অনুবাদে জেনেছি পেলে বলেছেন, ‘পড়াশোনা আর ফুটবল-এই দুইয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। একই সঙ্গে দুটো চালিয়ে নেয়া যায়।’
৩.আমরা মহান বিপ্লবী চে’ গুয়েভারাকে ভালোবাসি বলে ভালোবাসি আর্জেন্টিনাকে, সেই দেশের ফুটবল আর ‘ম্যাজিকম্যান’ ম্যারাডোনাকে। ১৯৮৬ সালে প্রায় একাই বিশ্বকাপ জিতে ম্যারাডোনা সে বিজয়কে বিশ্ব তারুণ্যকে উৎসর্গ করেছিলেন।
৪. আরো হয়তো অনেক অনেক কারণ আছে ফুটবলের বিশ্বকাপের আসর নিয়ে আমাদের মাতামাতির। তবে, এখন পর্যন্ত মোটা দাগে যতোটুকু দেখি তাতে মনে হয় আমরা আটকে আছি ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনায়। প্রাক বর্ষার সকালে ঘুম ভাঙতেই যতদূরে দৃষ্টি যায় মানুষের ছাদে, জানালায় দোল খায় আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের পতাকা। এটা আইনী বিবেচনায় ‘সঠিক’ নয়। আমাদের সর্বোচ্চ আদালতও এরকম মত দিয়েছে। কিন্তু এই দেশে কে শোনে কার কথা! আদালত আদেশ দিয়েছে, রায় দিয়েছে, পর্যবেক্ষণ দিয়েছে কিন্তু তার বাস্তবায়ন করবে কে? কেবল শুরু, কদিন পরে কোন দেশের পতাকা কে কত বড় করে বানাতে পারবে তার প্রতিযোগিতা হবে। খবরের পাতায় পাতায় তর্কযুদ্ধ অনেক সময় হাতাহাতিতে রূপান্তর ঘটার খবরও পাওয়া গেছে। কদিন আগে ফেসবুকে খবর আসে কোথায় যেন ব্রাজিলিয়ান সমর্থকরা আর্জেন্টাইন সাপোর্টার বাপ-ছেলেক পিটিয়ে জখম করেছে!
খবরটা বিশ্বাস করিনি। মেনে নিচ্ছি না এখনি। এই জখমের পেছনে হয়তো অন্য কোনো কারণ আছে! আমার দেশের ব্রাজিল সমর্থকরা অনেক ফুটবল সমঝদার হন। তারা এমন আচরণ করবেন কেনো? করতে পারেন না।
আর আর্জেনাইন সমর্থকরা ম্যারাডোনাভক্ত! তাতে দোষের কী? ১৯৮২ সালে বিশ্বমাঠে একঝলক দেখা গেছে এই ল্যাটিন ফুটবল জাদুকরকে। তারপর তার জাদু দিয়ে ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপটা জয় করে নিলেন। ইয়েস, সেবার ইংল্যান্ডের সঙ্গে খেলার সময় একটা গোলে ম্যারাডোনার হাতের জাদু ছিলো। তিনি স্বীকারও করেছেন ওই গোলে ‘ঈশ্বরের হাত ছিলো’। এই গোল নিয়ে ম্যারডোনাকে এখনো একহাত নেন ব্রাজিল সমর্থকরা।
ম্যারাডোনার নীতি-নৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা। আমার নিরীহ প্রশ্ন হলো-ফিফা এতো বড় একটা সংগঠন। তারা সব জেনে-বুঝেও ম্যারাডোনার সেই গোল বাতিল করলো না কেনো? কেনো শাস্তি দিলো না বিশ্বফুটবলের এই গতিময় মানবকে?
ব্রাজিল ছান্দসিক, নান্দনিক ফুটবল খেলে। পেলে, সক্রেটিস, জিকো, রোমারিও, রোনালডো, রবার্তো কার্লোস আর হালের নেইমারের মতো দুনিয়া মাতানো খেলোয়াড় উপহার দিয়েছে দেশটি। পাঁচবার বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস কেবল তারেদরই। অতএব, দেশে দেশে ব্রাজিল নিয়ে মাতামাতি হবে এটাই স্বাভাবিক; যদিও গেলো বিশ্বকাপে জার্মানির সঙ্গে সাত গোল খাওয়ার বিষয়টি-‘সেভেন আপ’ টক হয়ে ভাইরাল হয়ে গেছে। আর এই খোটাটা ব্রাজিল সমর্থকদের সইতেই হবে।
তো, এতো কিছুর পরও আমরা যে কথাটা জোর দিয়ে বলতে চাই, দুনিয়ার যেখানেই চার বছর পর পর ফুটবলের বিশ্বকাপ আসর বসুক সেখানে যেন আর্জেন্টিনার সঙ্গে ব্রাজিলও থাকে। আর আমরাতো এটাও চাই, ‘অতো গ্রুপ-ট্রুপ বুঝিনা; এতো হিসেব কষতে চাই না- ফাইনালটাও খেলুক আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল’।
আমরাতো এটা বরাবরই চাই বিশ্বকাপটা যাক ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল বা আর্জেন্টিার ঘরে। আমরাতো এটা চাইই বিশ্বকাপজুড়ে লেগে থাক ‘সাম্বা’ নৃত্যের ক্লাসিক দোলা; আর আর্জেন্টিনার ‘স্বপ্নবাজ বিপ্লবী’দের গল্প।
অবশ্য কবুল করছি, এই দেশে ইউরোপের গতিময় ফুটবলের ভক্ত সমর্থকও আছেন অনেক। তবে তারা ব্রাজিল-আর্জেন্টাইন সমর্থকদের যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার মধ্যে নিতান্তই কোনঠাসা।
১৯৯০ সালে ম্যারাডোনাকে হারিয়ে জার্মানি যখন চ্যাম্পিয়ন হলো তখন ট্রাকমিছিল করে এদেশের জার্মাান সমর্থকদের গুলশানে জার্মান দূতাবাসের দিকে যেতে দেখেছি। ব্যাজিওর রূপ আর খেলা দেখে এদেশের অনেক রমনী ইতালির সমর্থক হয়েছিলেন।
সেই ১৯৮২ সাল থেকে যেহেতু বিশ্বকাপ ফুটবল দেখার চেষ্টা করি; বাঙালি হিসেবে মাঠে দু-একবার লাথি দিয়েছি ফুটবলে, তাই বলছি ভালোবাসি ফুটবল। বিশেষ করে ল্যাটিন ফুটবল। আর খুব করে চাইছি মাঠের বাইরেও আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল সমর্থকদের যুদ্ধটা চলতে থাকুক। আর এটাকে আমি রক্তপাতহীন এক ক্লাসিক যুদ্ধই বলি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








