ক্রিকেটাররা দেশের বাইরে কীভাবে ঈদ করেছেন সেটা জানতে যখন উৎসুক বাংলাদেশের জনগণ, তখন ১৬ কোটি মানুষের অধিকাংশই হয়তো জানতেন না যে নীরবে-নিভৃতে বিদেশের মাটিতে স্বজনদের ছাড়া ঈদ করতে হয়েছে বাংলাদেশেরই আরেকটি জাতীয় দলকে। বিশ্বকাপে টানা দুই ম্যাচ হারায় ক্রিকেটারদের সমালোচনায় যখন ব্যস্ত সবাই, তখন অনেকেই প্রশংসা করতে ভুলে গেলেন লাওসকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের মূলপর্বের আশা অনেকটাই উজ্জ্বল করা টাইগার ফুটবল দলকে!
ক্রিকেট বিশ্বকাপের ডামাডোলে অনেকটা নীরবেই র্যাঙ্কিংয়ে চার ধাপ এগিয়ে থাকা লাওসকে হারিয়ে দেশে ফিরেছে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের মূল বাছাইপর্ব নিশ্চিত করতে ১১ জুন ফিরতি লেগকে পাখির চোখ করে শুরু করে দিয়েছে অনুশীলনও। সেই ম্যাচ জিতলেও ক্রিকেটে বুদ হয়ে থাকা সব বাংলাদেশির সমর্থন ফুটবলে পাওয়া যাবে তেমনও বলা যাচ্ছে না।
জেমি ডে বাস্তবতা ভেবে সেটা চাচ্ছেনও না। খাদ থেকে টেনে তুলে বাংলাদেশের ফুটবলকে একটু একটু করে এগিয়ে নিচ্ছেন যে ইংলিশ কোচ, তিনি বিশ্বাস করেন ক্রিকেটের চেয়ে বরং বাংলাদেশে ফুটবলই বেশি জনপ্রিয়। গার্ডিয়ানকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বাংলাদেশে ফুটবলে পুরনো জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন শুধু সাফল্য।
‘বাংলাদেশে ক্রিকেটটাই বেশি জনপ্রিয়। তবে আমাকে ভুল বুঝবেন না, আমি মনে করি দেশটিতে এখনো ফুটবল ক্রিকেটের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়। সেখানকার জনগণ ফুটবল ভালোবাসে, তবে সাফল্য কম পাওয়ায় দর্শক একটু কম হয়। বাংলাদেশে আমি একবার টি-টুয়েন্টি খেলা দেখতে গিয়েছিলাম। সেখান দর্শক ছিল ২০-৩০ হাজার। যদি আমরা ক্রিকেটের মতো ভালো খেলতে পারি, ফুটবলেও দর্শক ৩০-৪০ হাজার হবে।’
‘যেকোনো খেলায় যদি আপনি জিততে থাকেন তাহলে জনগণ আপনাকে অনুসরণ করবেই। আমি মনে করি বাংলাদেশে ক্রিকেটের চেয়ে ফুটবলের জনপ্রিয়তাই বেশি। তবে ক্রিকেট এগিয়ে, কারণ তারা বেশি সমর্থন পায়। তাদের জন্য বরাদ্দ বেশি ও পৃষ্ঠপোষকতাও প্রচুর।’
বাংলাদেশে এসে সাফল্য পেলেও কম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়নি জেমি ডেকে। এদেশের গরমে প্রথমে কষ্ট হলেও সেটা মানিয়ে নিয়েছেন ইংলিশ কোচ, ‘গরম থেকে বাঁচার জন্য আমরা সকাল ৬-৭টা ও বিকেল ৫টায় অনুশীলন করি। এটা বেশ ব্যস্ত এক শহর। এখানকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা খুব একটা উন্নত নয়। বৃষ্টি হলেই রাস্তায় পানি উঠে যায়। রাস্তায় প্রচুর যানজট। কখনো কখনো দুই মাইল যেতেই অনেক সময় লেগে যায়।’
‘রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বেরোলেই দেখবেন ৩-৪টা গাড়ি হুট করে আপনার বিপরীত স্থান থেকে এসে আপনাকে ভয় পাইয়ে দেবে। খুবই ব্যস্ত, কোলাহলপূর্ণ এক শহর। রাস্তায় হাঁটাও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। ইংল্যান্ডে কেউ আমাকে চেনে না। কিন্তু বাংলাদেশের টিভি-পত্রিকার কারণে আমাকে সবাই জানে। লোকজন দেখলেই ছবি নিতে চায়। আমার খুব হাসি পায়, তবে খুব উপভোগও করি।’
সবকিছু পরিকল্পনামাফিক না হওয়া, বিভিন্ন হতাশা সত্ত্বেও বাংলাদেশের ফুটবল অবকাঠামো বদলে দেয়ার ব্যাপারে আশাবাদী জেমি, ‘আমরা এমন হোটেলেও থেকেছি, যেখানে খেলোয়াড়দের জন্য পর্যাপ্ত কক্ষ ছিল না। কখনো কখনো মাঠে লম্বা ঘাসের জন্য অনুশীলনও করতে পারিনি। অনেক সময় অনেক কিছুই হিসেব মতো হয়নি। আমাদের বাস থেকে নেমে যেতে হয়েছে কারণ ড্রাইভারের লাইসেন্স ছিল না। পরে খেলোয়াড়দের নিজ ব্যবস্থায় উবারে করে এয়ারপোর্টে যেতে হয়েছে। আমি জানি এখানে বাফুফের কোনো দোষ নেই। কারণ তাদের জানানো হয়েছিল সব ঠিক আছে। কিন্তু আসলে কিছুই ঠিক ছিল না। বিষয়গুলো খুব হতাশার। কিন্তু সেগুলো মনে পড়লে খুবই হাসি পায়।’
ইংল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে এসে সবচেয়ে বেশি কি কষ্টে পড়তে হয়েছে জেমিকে? ইংলিশ কোচ জানালেন তার চার ছেলে ও স্ত্রীকে ছেড়ে থাকা, ‘আমি চার থেকে ছয় সপ্তাহ পরপরই বাচ্চাদের দেখতে যাই। জানি এটা ঠিক নয়। কিন্তু ফুটবলে কখনো কখনো আপনাকে ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে। আমরা মেনেই নিয়েছি ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করতে হলে আমাদের এই কষ্টটুকু করতেই হবে। খুব ভালো হয় যদি ওরা এসে কয়েকটা ম্যাচ দেখে। আমার কী কাজ সেটা যদি এসে ওরা দেখে, তাহলে খুবই ভালো হয়।’








