শমসের মোবিন চৌধুরীর পদত্যাগ নিয়ে অনেক কথাবার্তা হচ্ছিল। সে কথাবার্তা চ্যাৎ করে বন্ধ করে দেয়া হলো! এখন বাংলাদেশ আরও কিছুদিন প্রকাশক দীপন হত্যা, টুটুল-তারেক-রণদীপমদের হত্যা প্রচেষ্টার আলোচনা-গবেষনা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি নির্লজ্জের মতো আবার, ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা, আইন শৃংখলা পরিস্থিতি ঠিক আছে, তদন্ত চলছে, দোষী্দের সাজা হবে’ জাতীয় কিছু মুখস্ত বয়ান দেবেন! অথবা অনেকে বলার চেষ্টা করবেন ‘এই লোকগুলা এখনও দেশের বাইরে যায়না কেন? দেশে থাকলেতো তারা এভাবে মরবেই!’
বাংলাদেশ যেন এখন এমন একটি নৈরাজ্যের জঙ্গল দেশ হয়ে দাঁড়িয়েছে! এদেশে ব্যাংক ডাকাতি, লুটপাট, টেন্ডার সন্ত্রাস, ধর্ষন-রাহাজানির জন্য কোন ধর্ম ব্যবসায়ী কখনো কারো গলা কেটেছে শুনেছেন? সব দোষ লেখক-প্রকাশকদের? আর হিসাব কষে দেখুন শিকারদের সবাই কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রিয় প্রজন্ম। একটা রাজাকারের বাচ্চাও কোথাও মরছেনা!
একজন একটা কিছু লিখলে-প্রকাশ করলে তা পছন্দ না হলে লিখে এর জবাব দেবার মুরোদ একদলের নেই! গলাকাটার মুরোদ আছে! এটাই কী আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের বাংলাদেশ?
শনিবার সারাদিন নজর ছিল অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহরে। বাংলাদেশের নিরাপত্তাহীন ব্লগার জীবন নিয়ে একটি আলোচনা বৈঠক শনিবার হয়েছে মেলবোর্নে। বাংলাদেশের ধর্ম ব্যবসায়ী জঙ্গীদের তালিকাভূক্ত অন্যতম ব্লগার শুভজিত ভৌমিক সেখানে বক্তব্য রাখেন। শুভজিত অবশ্য পড়াশুনার জন্য সিডনি এসেছেন প্রায় দু’মাস। এসেছেন মানে বেঁচে গেছেন! এখানে আর দশজন ছাত্রের মতোই কঠিন তার জীবন। কাজ করে পড়তে হয়। কিন্তু কষ্ট হোক, কল্লাটাতো তার বাঁচল!
মেলবোর্নের অনুষ্ঠানের আরেক কাহিনী শুনে অস্ট্রেলিয়ার ওপর ক্ষোভ হয়েছে। এই অনুষ্ঠানে অংশ নেবার জন্য বাংলাদেশের কিছু ব্লগারকে দাওযাত করা হয়েছিল। কিন্তু ঢাকার অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশন তাদের ভিসা দেয়নি! ভিসাটা পেলেতো তারা কিছুদিন নিরাপদ দেশটায় অন্তত বেঁচে থাকতে পারতেন!
শনিবার ঢাকায় এক প্রকাশক হত্যা, আরেক প্রকাশক সহ দুই ব্লগারকে হত্যা চেষ্টার নিন্দা করে নিশ্চয় ঢাকার কূটনৈতিক পন্ডিতের সঙ্গে ঢাকার অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনারও বিবৃতি দেবেন! কিন্তু একদল নিরাপত্তাহীন ব্লগার তার দেশে গেলে থেকে যেতে পারে এই ভয়ে যারা ভিসাই দেয়নি, তাদেরও কী এ ধরনের উদ্বেগ দেখানো ভন্ডামী নয়?
নিহত ব্লগার অভিজিত রায়ের বই প্রকাশের অপরাধে শনিবার প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা, আহমেদুর রশীদ টুটুল, তারেক রহিম, রণদীপম বসুকে হত্যার উদ্দেশে কোপানো হয়। দু’টো ঘটনার পরিকল্পনা এক! ঘটনা ঘটিয়ে দরজা বন্ধ করে চলে যায় ধর্ম ব্যবসায়ী আততায়ীর দল!
দীপন যে সব সময় ভয়ের মধ্যে থাকতেন তা তার খুন হবার বর্ণনাতেই আছে। অফিসের মধ্যে দরজা বন্ধ করে তিনি বসেছিলেন। বই নেবার নাম করে সেখানে আততায়ীরা ঢোকে। কুপিয়ে খুন করে দরজা বন্ধ করে চলে যায়! যাতে কেউ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে না পারে। টুটুলদের খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে দরজা ভেঙ্গে তাদের হাসপাতালে নিয়ে গেছে বলে তারা এখনো বেঁচে আছেন।
শনিবারের ঘটনা দুটো ঢাকার প্রকাশনা জগতে নতুন উদ্বেগ ছড়াবে। মুক্ত চিন্তা, মুক্তিযুদ্ধের বই যারা এতদিন বের করেছেন তারা কেউ আর দেশে নিরাপদ না। যুদ্ধাপরাধী গো আযমের জীবনীগ্রন্থ বের করতে হবে! তাদের গায়ে ফুলের টোকাটিও কেউ দেবেনা!
ব্লগার অভিজিত হত্যার পর তার বাবা অজয় রায় এর বিচার চাইতে গিয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণদের কাছ থেকে অনেক অপমান শুনেছেন। এর প্রতিবাদ করাতে সরকারি দলের এমপি রাজাকার পুত্র মাহমুদুস সামাদ চৌধুরীর নেতৃ্ত্বে শহীদের সন্তান অধ্যাপক জাফর ইকবালকে অপমান করা হয়েছে!
সেই অভিজ্ঞতায় বুঝি দীপনের বাবা অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক আগে থেকেই বলে দিয়েছেন, তিনি এই হত্যার বিচার চান না! প্রশ্ন রেখে বলেছেন, বিচার কার কাছে চাইবেন। এ ঘটনাতো রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক। এমন কী ভীতিকর বিচারহীন অবস্থা দেশের যে কোন পিতা তার সন্তান হত্যার বিচার চান না?
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি তার পিতা-মাতা-ভাই-ভাবীদের হত্যার বিচার চাননি-করেননি? দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক কেন তার সন্তান হত্যার বিচার চান না? এর অর্থ বোঝার ক্ষমতা নিশ্চয় শেখ হাসিনার আছে বলেই তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী।
দেশে যে এভাবে একের পর এক লেখক তথা ব্লগার হত্যার ঘটনা ঘটছে আমি এর দায় প্রথমে খালেদা জিয়াকে, এরপর জামায়াতকে দেই। মূলত খালেদা জিয়া এর উদ্বোধন করে দিয়েছেন! ঘটনাক্রম বিশ্লেষন করলেই এর উত্তর মিলবে।
বাংলাদেশে-দুনিয়ায় ব্লগ লেখা কোন নতুন ঘটনা নয়। অস্ট্রেলিয়ায় সাংবাদিকতার ক্লাসে শেখানো হয় কিভাবে ব্লগ লিখতে-আপলোড-ডাউনলোড করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে ব্লগ-ব্লগার বিষয়টি হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চ সৃষ্টির পর! গণজাগরণ মঞ্চের সেই উত্তাল সতের দিন বিএনপি নেতারা এর কাছে ঘেষতে কম চেষ্টা করেননি! মানুষের উত্তাল অবস্থা দেখে বিব্রত খালেদা জিয়া তার নানা কর্মসূচিও স্থগিত করতে বাধ্য হন। অতঃপর যখন বুঝতে পারেন গণজাগরণ মঞ্চে তার কোন আশা নেই তখন বলা শুরু করলেন শাহবাগে কিসের গণজাগরণ হয়েছে, ওখানে জাগরণ হয়েছে নাস্তিকদের! তারা আল্লা-খোদা মানেনা, শাহবাগে সবাই গাজা খায় ইত্যাদি!
কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষজনের গণবিপ্লব ঘটলো শাহবাগে আর সেখানে কোন ফ্লোর না পেয়ে খালেদা জিয়া সেটিকে নাম দিলেন নাস্তিক সমাবেশ? এরপর এর বিরুদ্ধে নামানো হলো হেফাজতগংকে! রাজিব হত্যা দিয়ে শুরু হলো ব্লগার হত্যা! সেটি এখনো চলছে! এই খুন সমগ্রকে ধর্মীয় লেবাস দিতে বিএনপি-জামায়াত-হেফাজতের বদলে খোলা হয়েছে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, আইএস নামীয় ওয়েবসাইট!
সরকার একেকটি ঘটনার পর ভীরু ভীরু ধর্মীয় মন নিয়ে তাদের পিছনে ছুটে! আর রেলের জমি সহ নানাকিছু দিয়ে হেফাজতিদের তমিজ করে সরকার! কাজেই ব্লগার খুনের সঙ্গে এখানে বেহেস্ত-দোজকের হিসাব না, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের রাজনীতি জড়িত।
অমি রহমান পিয়ালের কী ধর্ম বিষয়ক বিদ্বেষমূলক ব্লগ অথবা পোষ্ট আছে? তারতো আছে জন্মযুদ্ধ’৭১ নামের কাজ-গবেষনা। কিন্তু তাকে কেন পাহারায় থাকতে হয় সারাক্ষন? বাড়িওয়ালারা কেন তাকে বাসাভাড়া দিতে চায় না? অজয় রায়, আবুল কাশেম ফজলুল হকের ছেলেরা কেন শুধু মরে? এমাজউদ্দিন কী তাহলে পয়গম্বর?
খালেদা জিয়াকে একদিন এসবের জন্যে জবাবদিহি করতেই হবে। কারন শুধু তার স্বার্থ না মিলাতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ছেলেমেয়েকে নাস্তিক নাম দিয়ে একদল উগ্রবাদীদের তাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছেন। শেখ হাসিনা যতদিন না এসব খুনের রাজনীতি এড়িয়ে তদন্ত খেলা বন্ধ না করবেন ততদিন থামবেনা ব্লগার খুনের বীভৎস খেলা।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







