চাকরিতে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় আবারও বিক্ষোভ করেছে সাধারণ শিক্ষার্থী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ।
রোববার রাজধানীর শাহবাগে এ বিক্ষোভে অংশ নেয় কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী। বিক্ষোভ হয়েছে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি কলেজ, জেলা ও বিভাগীয় শহরেও।
বিক্ষোভ শেষে নতুন কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ১৪ মার্চ বুধবার সারাদেশের প্রতিটি জেলার ডিসি অফিসের সামনে এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সামনে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে।
পূর্বঘোষণা অনুযায়ী রোববার সকাল ১১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবি সম্বলিত বিভিন্ন ব্যানার, প্ল্যাকার্ড ও হেডবেল্ট নিয়ে শাহবাগে জড়ো হতে থাকে। ঢাবি’র কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি এবং বিভিন্ন হল থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে আসেন।

বেলা ১১টা থেকে শুরু হওয়া এ বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু হয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং জনপ্রিয় লেখক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলার নিন্দা ও বিচার দাবির মধ্য দিয়ে। ঘটনার প্রতিবাদে আন্দোলনকারীরা ১ মিনিট নীরবতাও পালন করেন।
প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলা এ বিক্ষোভ কর্মসূচিতে আন্দোলনকারীরা তাদের পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরার পাশাপাশি কোটা ব্যবস্থার কারণে বিদ্যমান বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে বিভিন্ন বক্তব্য রাখেন।
আন্দোলনের মূল স্লোগান, ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, কোটা বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ স্লোগানে মুখরিত হয় পুরো শাহবাগ চত্ত্বর। ‘কোটা বৈষম্য সংস্কার করো’, ‘ইহা কোটা নয়, বৈষম্য’, ‘কোটা বৈষম্য থেকে মুক্তি চাই’, ‘১০ শতাংশের বেশি কোটা নয়’, ‘বেকার থাকতে কোটার পদগুলো সংরক্ষণ কেন?’ ইত্যাদি লেখা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন আন্দোলনকারীরা।

বিক্ষোভকারীরা কোটা সংস্কারের পক্ষে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হচ্ছে, কোটা ব্যবস্থা সংস্কার করে ৫৬ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে এ নিয়ে আসা, কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে শূন্য থাকা পদগুলো মেধা থেকে নিয়োগ দেওয়া, কোটার কোনো ধরনের বিশেষ নিয়োগ পরীক্ষা না নেওয়া, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সবার জন্য অভিন্ন বয়স সীমা নির্ধারণ এবং নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধার সুযোগ একাধিকবার না দেওয়া।
বিক্ষোভ শেষে মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হন আন্দোলনকারীরা। এখান থেকে আন্দোলনের নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের জন্য গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক হাসান আল মামুন।

শিক্ষার্থী এবং চাকরিপ্রার্থীদের যৌক্তিক এ দাবি সরকার অবশ্যই মেনে নেবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আগের দিনের মত রোববারের কর্মসূচিতে দেখা যায় ছাত্রলীগের অনেক পদধারী নেতাকে। তাদের কাউকে কাউকে বিক্ষোভের অগ্রভাগেও দেখা যায়।

একই দাবিতে গত রোববার বিক্ষোভ হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, মাওলানা ভাষানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল কলেজ, রংপুর, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গুরুদয়াল কলেজ, কিশোরগঞ্জ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ভিক্টোরিয়া কলেজ, কুমিল্লা, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরে।

বিদ্যামান কোটা ব্যবস্থায়, সরকারি চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদগুলোতে জনবল নিয়োগে কোটা থেকে নিয়োগ পাচ্ছেন ৫৫ শতাংশ প্রার্থী। বাকী ৪৫ শতাংশের নিয়োগ মেধার ভিত্তিতে।
ওই ৫৫ শতাংশ কোটার মধ্যে রয়েছে; ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতী-নাতনী, ১০ শতাংশ নারী, ১০ শতাংশ জেলা এবং ৫ শতাংশ প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য কোটা।
তবে কোটাধারী কেউ মেধা তালিকায় ঢুকে পড়লে তার নিয়োগ মেধা কোটাতেই হয়ে থাকে। সেইক্ষেত্রে তার জন্য নির্ধারিত কোটায় নিয়োগ দেওয়া হয় একই কোটায় থাকা অন্যপ্রার্থীকে। আর যোগ্যপ্রার্থী পাওয়া না গেলে, তখন সে পদে কাউকে নিয়োগ না দিয়ে তা সংরক্ষণ করা হয়।

কোটা ব্যবস্থার সংস্কার চেয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবাদ-আন্দোলন করে আসছেন সাধারণ চাকরিপ্রার্থীরা। শুধু তাই-ই নয় এই ব্যবস্থাকে ‘অযৌক্তিক ও সংবিধান পরিপন্থী’ বলে মত দিয়ে লেখালেখি করছেন সাবেক শীর্ষ আমলা এবং বুদ্ধিজীবীরাও। বিষয়টি নিয়ে সরকারিভাবে অনেক কমিটি-কমিশনও হয়েছে। গবেষণা হয়েছে বেসরকারি পর্যায়ে।
সর্বশেষ সরকারি কর্মকমিশন-পিএসসি ২০০৮ সালে ইউএনডিপির আর্থিক সহায়তায় এ বিষয়ে অভিজ্ঞ দু’জন ব্যক্তিকে দিয়ে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে। সেই সমীক্ষায় তারা গোটা ব্যবস্থাটিকে অন্যায্য এবং জনপ্রশাসনের জন্য ক্ষতিকর বলে মত প্রকাশ করে। তাদের দেওয়া সুপারিশে কোটায় পদ্ধতিতে বড় ধরনের হ্রাসের কথা বলা হয়।

চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা তুলে দেওয়া উচিত বলে একাধিক সাক্ষাতকার এবং সভা-সেমিনারে মত দিয়েছেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান। নিয়মীত লেখালেখি করছেন আরেক সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারও।
তাদের মতে, একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিকতা ছিল। কিন্তু সেটা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য চলতে পারে না। প্রশাসনের অচলায়তন ভাঙতে এবং মেধাবীদের নিয়োগ দিতে এই ব্যবস্থা সংস্কারের বিকল্প নেই।







