খেলার দুনিয়ায় প্রশিক্ষক বা কোচদের নিয়ে চালু এক জোকস কমবেশী সবার জানা। কোচ নাকি দুই প্রজাতির: একদল বরখাস্ত হয়েছেন, আরেক দল বরখাস্ত হতে যাচ্ছেন। কোচিং যে প্রশংসাহীন পেশা তা এই রসিকতাই বলে দেয়। সাফল্যের ভাগ জোটে কদাচিৎ, ব্যর্থতার দায়ভাগ পুরোটাই। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, সেটা এই বাংলাদেশেই।
ক্লাব কোচিং কিংবা স্থানীয় কোচদের অবস্থা যতই করুণ হোক, বাংলাদেশে চাকরি করতে আসা বিদেশী কোচদের ক্ষেত্রে এই জোকস কোনোভাবেই প্রযোজ্য নয়, বরং তাদের অবাধ স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে নতুন জোকস বাজারে প্রকাশের অপেক্ষায়। একসময় জাতীয় ফুটবল দল, অ্যাথেলেটিক্স সহ অন্যান্য খেলার বিদেশী কোচ নিয়োগ হতো বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কোনো বন্ধুরাষ্ট্রের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের চুক্তির আওতায়। আর্থিকভাবে সেই দু:সময়ে বাংলাদেশ প্রায় বিনা খরচে জার্মানি থেকে ওয়ার্নার বেকেলহপ্ট, অটো ফিস্টারের মতো অসাধারণ দক্ষ ফুটবল কোচ পেয়েছে। হকি সহ অন্যান্য খেলা উপকৃত হয়েছে বন্ধুরাষ্ট্রের সহোযোগিতায়।
সময় পাল্টেছে। আমরা এখন মধ্যম আয়ের দেশ। খয়রাতি সাহায্য কিংবা বন্ধুর উপহার নয়, বাংলাদেশের ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো এখন নিজেদের টাকায় বেশুমার বিদেশী কোচ নিয়োগ করতে পারে। ক্রীড়া, সংস্কৃতি কিংবা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুতিয়ালিতে বন্ধু রাষ্ট্র জার্মানি, ইতালি এমনকি ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া থেকেও প্রায় বিনা খরচে পাওয়া যেতে পারে উচ্চ ডিগ্রিধারী যোগ্য বিদেশী কোচ।
কিন্তু সেই রাস্তায় হাঁটতে রাজি নয় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন কিংবা ক্রিকেট বোর্ড। তারা বরং ডলার পাউন্ড খরচ করে বিদেশী কোচ নিয়োগ দিতেই বেশী আগ্রহী। আর্থিক দৈন্যদশায় পড়া বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন প্রায় প্রতি তিন/ছয় মাস পরপরই বিদেশী কোচ, টেকনিক্যাল ডিরেক্টর নিয়োগ দিচ্ছে। নিয়োগ পাওয়াদের বছরের অধিকাংশ সময় কি নিয়ে ব্যস্ততা, কাজের জবাবদিহিতা কিংবা পারিশ্রমিক প্রাপ্তির যৌক্তিকতা নিয়ে রয়েছে অপার রহস্য।
ডাচ কোচ লোডভিক ডি ক্রুইফ বাংলাদেশে তার আড়াই বছরের চাকরি জীবনে দুই বছরই স্বদেশে ছুটি কাটিয়ে বেতন পেয়েছেন পুরো সময়ের। তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে, আবার মাস তিনেক যেতে না যেতেই পূর্ননিয়োগ পেয়েছেন। কেন পূর্ননিয়োগ, তাতে তার নিজের ছাড়া লাভ হয়েছে কার, সেই প্রশ্নের উত্তর কখোনোই মেলেনি।
আর্থিকভাবে যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাফুফে বা দেশের ফুটবল তা দেখা-বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হতে হয়না। আট বছর আগে ফিফা র্যাংকিং’র ১৫৮ থেকে এ সময়ে ১৯০তম অবস্থানই প্রমাণ করে ফিফা’র অনুদান কিংবা দেশের কষ্টার্জিত বৈদেশকি মুদ্রা খরচ করে আমরা কি পেয়েছি!
টেকনিক্যাল ডিরক্টর পল স্মলি এসময়ে বাফুফে’রই এমন এক শ্বেতহস্তি যিনি নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে স্বদেশীদের জন্য বাংলাদেশে চাকরির ব্যবস্থা করেই যাচ্ছেন। পাশপাশি দেশের মেয়েদের ফুটবলের উত্থানের দুই নায়ক কোচ গোলাম রাব্বানি ছোটন ও লিটু’র কাজের খবরদারি করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। সহজ পথে বাহবা কুড়ানোর জন্য প্রায় তৈরী করা মহিলা দলের কোচের পদ থেকে স্থানীয় দুই কোচকে বিদায় করে নিজের কর্তৃত্ব কায়েমের কাজটা ভালোই এগিয়ে নিচ্ছেন স্মলি।
অথচ তার নিজের কর্তব্যকর্ম বাংলাদেশের ফুটবল ডেভেলপমেন্টের রোডম্যাপ তৈরী করার কাজ কতটা এগোলো তার জবাব দেয়া বা চাওয়ার কেউ নেই। তিনি ভিডিও স্ল্যাইড আর গ্রাফিক্স শো’র মাধ্যমে কুমিরের এক বাচ্চা বারবার দেখিয়ে যাচ্ছেন।
রিকেট বা বিসিবি’র ব্যাপারটি একেবারেই ভিন্ন। বছর পিছু শতকোটি টাকার নিজস্ব উপার্জন, আন্তর্জাতিক পরিসরে একের পর এক সাফল্যে উদ্ভাসিত বিসিবি ও তার ক্রিকেটাররা পুরো দেশের চোখর মনি। তাদের কর্মের সমালোচনা করার সামর্থ্য বা ইচ্ছা এতদিন কারোরই ছিলোনা। নিউজিল্যান্ডে ব্যর্থ সিরিজ ও ভবিষ্যতের অ্যাওয়ে সিরিজে একই ব্যর্থতার আশংকা নতুন করে চিন্তায় ফেলেছে ভক্তদের। 
খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলাভঙ্গের একের পর এক অনাকাংখিত ঘটনার চাইতেও বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তরা শংকিত ক্রিকেট দলের শ্রীলংকান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে’কে দেয়া বিসিবি’র দেয়া অবাধ স্বাধীনতা, যা শেষ পর্যন্ত অবাধ স্বেচ্ছাচারিতায় পরিণত হওয়ারও শংকা রয়েছে।
২০১৪’র মে মাসে বিসিবি’তে চন্ডিকা হাথুরুসিংহের নিয়োগ হেড কোচ হিসাবে। গত আড়াই বছরের চাকরি জীবনে এই শ্রীলংকান আন্তর্জাতিক সিরিজে বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব ছাড়া হেড কোচ হিসাবে আর কোনো দায়িত্ব পালন করেছেন এমন নজীর নেই। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সূচী নিয়ে ব্যস্ততা না থাকলে তিনি বয়সভিত্তিক দল নিয়ে কাজ কিংবা হেড কোচের ভূমিকা পালন না করে সিডনিতে তার পরিবারের কাছে ছুটি কাটাতে যান।
বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে নিয়োগ দেয়া একজন হাই প্রোফাইল কোচ শুধু জাতীয় দলের ২০/২৫ জন ক্রিকেটারকে নিয়ে আন্তর্জাতিক সিরিজের আগেই কেবল কাজ করবেন এমন শর্তে যদি তাকে নিয়োগও দেয়া হয় সেটা বিসিবি’র দর কষাকষির ব্যর্থতা। জাতীয় দল নির্বাচনের জন্য অভিজ্ঞদের নিয়ে আছে বিসিবি’র নির্বাচকমন্ডলী। সেই প্যানেলেরই অংশ দলের অধিনায়ক,সহ-অধিনায়ক সহ কোচ। এই প্রথাই মানে সারা ক্রিকেট দুনিয়া।

ইদানীং দল নির্বাচন নিয়ে কোচ হাথুরুসিংহের কিছু মন্তব্যে সন্দেহ জেগেছে তিনি নির্বাচকমন্ডলীর অন্যতম নাকি মূল অংশ! জাতীয় লিগ ও আন্তর্জাতিক ম্যাচে একের পর এক দূর্দান্ত পারফরম্যান্সের পরও অলরাউন্ডার নাসির হোসেন সম্পর্কে যখন হাথুরুসিংহে বলেন,‘নাসিরকে আরো অনেককিছু প্রমাণ করতে হবে, তখন বুঝতে বাকি থাকেনা যে নাসিরকে বাদ দেয়ার দায়টা কে নিলেন! নির্বাচকদের যা বলা উচিত সেটা যখন কোচ বলে বসেন তখন পরিস্কার হয়ে যায়, দল নির্বাচনে কার ভূমিকা মূখ্য।
নিউজিল্যান্ড সিরিজের জন্য নিউজিল্যান্ডে কন্ডিশনিং ক্যাম্পে আয়োজন না করে কেন সিডনির ভিন্ন আবহাওয়া ও কন্ডিশনে কন্ডিশনিং ক্যাম্প, কেন পূর্নাঙ্গ ক্রিকেট সিরিজের প্রস্তুতির জন্য দুটি টি-টুয়েন্টি আর একটি ওয়ানডে ওয়ার্ম-আপ ম্যাচ সে প্রশ্ন উঠবেই। নিউজিল্যান্ডে চ্যালেঞ্জিং সিরিজের আগে দেশের মাটিতে চারদিনের ফাস্ট ক্লাস ম্যাচের টুর্নামেন্ট স্থগিত রেখে কেন বিপিএল’র মতো ধুমধাড়াক্কা ক্রিকেটের আয়োজন সেই প্রশ্নের উত্তর কোচ হাথুরুসিংহের কাছে নয় খোদ বিসিবি’র কাছেই চাওয়া উচিত।
নিউজিল্যান্ড সফরে যদি দু’একটা জয় কিংবা টাইগারদের পারফরম্যান্স যদি আরেকটু ভালো হতো তাহলে এসব প্রশ্ন উঠতোনা। দল ব্যর্থ হয়েছে বলেই যেনতেন ভাবে নির্দয় সমালোচনা হচ্ছে ব্যাপারটি তেমনও নয়। প্রিয় দলের খারাপ সময়ে সহানুভূতি নিয়ে পাশে দাঁড়ানোর পাশপাশি ভুলত্রুটি নিয়ে আলেচনা হতেই পারে। দল ব্যর্থ হলে কোচিং স্টাফদের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে দাঁড়ায়।
ব্যাটিং পরামর্শক হিসাবে শ্রীলংকার সাবেক টেস্ট ক্রিকেটার থিলান সামারাবীরা’র গত চার মাসের পারফরম্যান্স পর্যলোচনার দাবী রাখে। তার অর্ন্তভুক্তি বাংলাদেশের ব্যাটিং’র দূর্বলতা কতটা ঢাকতে পেরেছে ? আদৌ উন্নতির লক্ষণ কি দৃশ্যমান ?
যদি উন্নতির সম্ভাবনা না থাকে তাহলে কেন তার পরিবর্তে কোচ হিসাবে আইসিসি’র মতো সংগঠনে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করা আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে অন্তত: একবার সুযোগ দেয়া হবেনা? একই কথা বাংলাদেশের বোলিং কোচ ক্যারিবীয় লিজেন্ড কোর্টনি ওয়ালশসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কালজয়ী খেলোয়াড় যে সেরা কোচ হবেনই এমন নিয়ম সবক্ষেত্রে কি খাটে?







