বাংলাদেশ

কেরানীগঞ্জ: অন্ধকার থেকে আলোকিত এক জনপদের গল্প

কেরানীগঞ্জ: অন্ধকার থেকে আলোকিত এক জনপদের গল্প

ঢাকার উপকণ্ঠে বুড়িগঙ্গার তীরের জনপদ কেরানীগঞ্জ। মাত্র এক দশক আগেও সন্ধ্যা নামার সাথেই অধিকাংশ ঘরে জ্বলত সাঁঝবাতি। ঢাকার নিকটবর্তী হয়েও অধিকাংশ এলাকা ছিলো বিদ্যুতায়নের বাইরে। কৃষকের জমির মাঝ দিয়ে দেখা যেত বিদ্যুতের খুঁটির পর খুঁটি। রাজধানীর কাছাকাছি থেকেও এ জনপদের অধিবাসীদের ছিল নানা অভিযোগ আর আক্ষেপ। যেই কয়েক জায়গায় বিদ্যুৎ ছিল তাতেও লোডশেডিং যন্ত্রণা ভোগ করতো গ্রাহকেরা।

ঢাকার অদূরে এ জনপদের এখনকার চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন।

সেই জনপদ আজ শতভাগ আলোকিত, এখানকার লোকজন আর জানে না লোডশেডিং কী। শুধু খুঁটি নিয়ে আর তারা দিন কাটায় না। গ্রাম ও ইউনিয়নের সীমাবদ্ধ নেই এ অঞ্চলের সংজ্ঞা। এলাকার অর্ধেক রূপ নিয়েছে নগরে। নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে নানা শ্রেণী পেশার মানুষের আবাসস্থল হয়েছে এই লোকালয়।

এখানকার মোট বিদ্যুৎ গ্রাহক ২ লাখ ৩৯ হাজার। গত দশ বছরে নতুন সংযোগ প্রদান করা হয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭৯ জনকে। একসময় কৃষি এখানকার অধিকাংশ মানুষের প্রাণ শক্তি থাকলেও বর্তমানে এ জনপদ হয়েছে কৃষি-শিল্প-বাণিজ্যের জনপদ। আধুনিক পরিচ্ছন্ন নগর ও পল্লীর অনন্য সংমিশ্রণে কেরানীগঞ্জকে এখন আর কেউ মফস্বল বলতে পারে না। আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় রাজধানীর চেয়ে পিছিয়ে নেই কেরানীগঞ্জ।

বিদ্যুতের আলোয় শুধু একটি জনপদ নয়, পরিবর্তিত হয়েছে এখানকার আর্থ -সামাজিক অবস্থাও। কেরানীগঞ্জ এলাকার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের হাত ধরে এসেছে গার্মেন্টস শিল্পের অগ্রগতি। কর্মসংস্থান হয়েছে হাজারো নারী পুরুষের। স্থানীয় আগানগর-শুভাঢ্যা এলাকায় সুগম হয়েছে গার্মেন্টস শিল্পের পথ। বর্তমানে আগানগর ও শুভাঢ্যা গার্মেন্টস পল্লীতে ১০ হাজারেরও বেশি ক্ষুদ্র তৈরি পোশাক কারখানা দেশের অভ্যন্তরীণ পোশাকের প্রায় ৭০ ভাগ চাহিদা মেটাচ্ছে।

কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও দোকান মালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজি মোহাম্মদ স্বাধীন শেখ বলেন, আমাদের এখানে সব ধরনের পোশাক তৈরি ও বিক্রি হয় পাইকারি দরে। এখানকার পাঞ্জাবী ও জিনস প্যান্টের মান ও বিক্রি সবচেয়ে বেশি। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ পাঞ্জাবী ও জিনস প্যান্টের চাহিদার জোগান দিয়ে থাকে এই গার্মেন্টস মার্কেট। পুরো কেরানীগঞ্জের বর্তমান এ চিত্রের প্রতিফলন এসেছে যে মানুষটার হাত ধরে তার নাম, নসরুল হামিদ বিপু। একজন জনপ্রতিনিধি হয়ে তিনি তার এলাকায় সকল নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করেছেন।

স্থানীয় গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা মনে করেন, শতভাগ বিদ্যুতায়নের ফলে এই এলাকার গার্মেন্টস শিল্প বিকশিত হয়েছে। তারা জানান, পুরো গার্মেন্টস পল্লীতে ৩৭ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার পুরোটাই সরবরাহ করা হচ্ছে। এই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রাপ্তির বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর প্রচেষ্টার বিষয়টি তারা তুলে ধরেন।

কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও দোকান মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুল আজিজ শেখ বলেন, আমরা চাহিদা মতো গ্যাস, বিদ্যুৎ সরবরাহ পাচ্ছি। সময় মতো মাল ডেলিভারি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া বিদ্যুৎ সরবরাহ খুব ভালো থাকায় জেনারেটর ব্যবহার করতে হয় না। এতে ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছে বহু অংশে।

শতভাগ বিদ্যুতায়ন ও শিল্পের যে প্রসার ঘটেছে তা অবশ্য একদিনে আসেনি। যুগপোযোগী পদক্ষেপ এ অঞ্চলের রূপ বদলে দিয়েছে। চাওয়া মাত্রই এক দিনেই এ জনপদে মিলেছে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস টেবিলে ফাইল জমে থাকার কোনো নজির নেই। এ পদক্ষেপের জন্য সংসদ সদস্য ও বিদ্যুৎ ও জ্বালানী প্রতিমন্ত্রীর ভূমিকার প্রশংসা করেছেন ভোক্তারা। বিসিক অঞ্চলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পর্যাপ্ত প্রাপ্তি নিশ্চিত করা গেছে।

শিল্প, অবকাঠামো, ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ার বাড়ছে অবকাঠামো। এসবের সাথে তাল মিলিয়ে খুঁটির বদলে মাটির নিচ দিয়ে চলছে বৈদ্যুতিক লাইন স্থানান্তরের কাজ। শুধুমাত্র কেরানীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠন করা হয়েছে ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ৪। উৎপাদিত বিদ্যুতের ওপর চাপ কমাতে নেয়া হয়েছে বিকল্প ব্যবস্থা। রোহিতপুরে স্থাপন করা হয়েছে ২১ কিলোওয়াট সম্পন্ন সোলার চার্জিং সিস্টেম। নতুন সাবস্টেশন নির্মাণ ছাড়াও কেরানীগঞ্জের মতিয়ারা পাওয়ার প্ল্যান্টকে ৫০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা হয়েছে।

নতুন প্রজন্ম আলোকিত হয়েছে বিদ্যুতের আলোয়। যে প্রজন্ম দেখবে না অন্ধকার। সেই অন্ধকারকে পেছনে ফেলে আলোর পদযাত্রী আধুনিক কেরানীগঞ্জ জনপদ। এই আলোকিত জনপদকে আর পিছিয়ে যেতে দিতে চায় না কেরানীঞ্জবাসী।

বিষয়:কেরানীগঞ্জ নসরুল হামিদ বিপু

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…