কেমন অাছেন?
আর বলেন না, ভালো আর থাকি কেমন করে? বাসা থেকে বের হলে বাসায় ফিরে আসার কোন গ্যারান্টি নেই। পাঁচ/ছয় ঘন্টা রাস্তায় কাটে ট্র্যাফিক জ্যামে। বাসায় ফিরে গরমে হাঁ ক্লান্ত হয়ে ফিরে শান্তিতে গোসল করবো তারও উপায় নাই।
কেন?
কারণ পানি নেই। টিপ টিপ করে পানি আসে, তা জমিয়ে ঘরের কাজকর্ম চলে, রান্না-খাওয়া চলে। একটু ফ্যান ছেড়ে গায়ের ঘাম শুকাবো উপায় নাই?
কেন?
বিদ্যুৎ বিভ্রাট, একবার গেলে আর আসে না। আসে তো আবার চলে যায়। আইপিএস লাগায়ে ইমারজেন্সি লাইট-ফ্যানে ব্যবহার করি। তারপর মাস শেষে বিরাট সাইজের বিল।
খাবো আরাম করে তারও উপায় নাই।
কেন?
গ্যাস থাকে না, মাঝরাতে একটু আসে তখন রান্না করে রাখতে হয়। তাছাড়া নুন আনতে পান্তা ফুরাই টাইপের অবস্থা।
কেন?
ভাতডাল, আলু ভর্তা দিয়ে চালায় মাসের ২২ দিন, বাচ্চাদের পাতে একটু মাছ ডিম মাংস দিতে পারি না। ১৫ দিনও রোজ ডিম খাওয়াতে পারিনা। ৪০ হাজার টাকা বেতন পেয়ে কি লাভ বলেন। বাড়ি ভাড়া ও পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল দিতেই বের হয়ে যায় ১৮ হাজার টাকা, মোবাইল বিল, ক্যাবল লাইনের বিল ছুটা বুয়ার বেতন দিতে লাগে ৪ হাজার। বাচ্চাদের স্কুল খরচ ও যাতায়াতে লাগে ৪ হাজার। দেশে পাঠাই ৫ হাজার। বাসায় মেহমান আসে, ওষুধ-পত্র লাগে। কাউকে সাহায্য করতে হয়। নিজের অফিসের যাতায়াতের জন্য টাকা লাগে। তাহলে বাজারের জন্য মাসে কত টাকা বাকি থাকে বলেন? টানাটানি করে চলছি। বিয়ে ফিয়ের দাওয়াতে তো যাই না ভয় লাগে। প্রায় প্রতিমাসে দুই/চার হাজার টাকা ধার করতে হয়। বউও চাকরির জন্যে জোড় চেস্টা করছে। কিন্তু মামা-কাকা ও মোটা টাকা ঘুষ দেবার কোন অবস্থা আমাদের নেই। তাই চাকরি হবে হবে করেও হচ্ছে না। বউ ইউটিউব দেখে দেখে কেক-কুকি বানানো শিখেছে, চেস্টা করেছে সাথে কিছু নতুন ধরনের রান্না শিখে ঘর থেকে ক্যাটারিং করার, হলে তো ভালো, সংসারে একটু স্বচ্ছলতা আসবে।
তারপর তো শান্তি নাকি?
শান্তি কি বলেন, শুক্রবার সক্কাল থেকে শুরু হয় মাইকে ওয়াজ মেহফিল, রাতভোর চলতেই থাকে। সেই সাথে দুই দিন পর পর বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে গান বাজনা, ভাষণ। প্রায় শুক্রবার চলে পাড়ায় চলে বিয়ে, জন্মদিন ও খাৎনা বা কোন আনন্দ উদযাপন, সেখানে চলে উচ্চস্বরে গান বাজানা। কেউ দেখার নেই শোনার নেই। যেখানে সেখানে স্কুল, হাসপাতাল, উইনিভারসিটি। রেস্টুরেন্ট, মার্কেট হাইরাইজ বিল্ডিং, কোন পরিকল্পনা নেই। দেখার কেউ নেই। রাস্তায় হাটার উপায় নেই ভাঙ্গাচোরা রাস্তা, খানাখন্দে ভর্তি। একটু বৃস্টিতে রাস্তা কোমর পানি। রাস্তা নিরাপত্তা নেই, দিন দুপুরে, শতশত লোকের সামনে ছিনতাই হচ্ছে, খুন হচ্ছে, গাড়ী চাপা পরছে, কিডন্যাপ হচ্ছে। মুক্তিপন নিচ্ছে। চাঁদাবাজি হচ্ছে।
পুলিশ কমপ্লেইন দেন না?
পুলিশের কাছে যাবো তো আরও বিপদে পরবো। ভাইরে টাকা ও ক্ষ্মমতাবানদের জন্য এক আইন, আমাদের মত সাধারন জনগণের জন্য অন্য আইন। আপনি কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই মরেছে। অন্যায়কারীকে সহায়তা করার জন্য মানুষের অভাব হবে না। কিন্তু প্রতিবাদকারীর খবর করে ছাড়বে। পুলিশ অন্যায়কারীর হয়ে আপনাকে এমন ভোগাবে যে আপনাকে শহর ছেড়ে পালাতে হবে। আমরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে জেলের ভাত খাই, আর অন্যায়কারী মানুষ খুন করলেও তাকে বাঁচাতে তৎপর থাকে সবাই।
টাকা ও ক্ষমতায় দেশ চলছে। ভাইরে আমরা কোনমতে দুইমুঠো খেয়ে পরে বেঁচে আছি। জানিনা এভাবে বাঁচাকে বাঁচা বলে কিনা? কষ্ট লাগে বাচ্চা গুলার জন্য, চেষ্টা করবো দেশের বাইরে পাঠাইতে যাতে একটা স্বস্তির জীবন পায়। আনন্দ নিয়ে বাঁচতে পারে। চাকরির বাকরি করে, দুটো ভালো খেয়ে পরে, রাতে নিশ্চিত ঘুম দিতে পারৎ। আমার মত প্রতিদিন ভাববে না, আগামীকাল কি করে চলবে। মাঝে মধ্যে ভাবি, ৪০ হাজারেও আমি চলতে পারছি না বাহুল্যহীন জীবনযাপন করে। আর যারা আরো কম রোজগার করে, তারা কি করে টিকে আছে এই শহরে? সরকার নাকি জনগণের জন্য। কিন্তু সরকারী মানুষজনই যদি নিজেদের সম্পদ বাড়াতে মশগুল থাকে তাহলে অন্যায় অপরাধ হবেই, আমাদেরকে চলতে হবে অনিশ্চিত জীবনপথে।
আমাদের কষ্টের রোজগার থেকে ট্যাক্স দিয়ে কি সেবা পাচ্ছি? আমাদের ট্যাক্সের কাটা লুটপাট হয়ে যাচ্ছে। আমাদের টাকায় চলা পুলিশ, বিডিআর, সেনাবাহিনী, সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী, মন্ত্রী-এমপির বেশিরভাগ ব্যস্ত টাকা রোজগারে। আমাদের জন্য সব কিছু কঠিন করে তারা আয়েশি জীবন পার করছে। তারা প্রাসাদে বসবাস করে তো সাধারন মানুষের কষ্ট বুঝবে না। তাদের সব অনুভূতি শেষ হয়ে যায় পাওয়ার আর টাকার কাছে। দেশে শুনি অনেক উন্নতি হ্যাঁ হচ্ছে আমার পাশের বাসার আকরাম সাহেব সরকারী ব্যাংকে কাজ করেন, প্রমোশন পেয়ে এজিএম হওয়াতে অফিস তাকে গাড়ী কিনতে ঋণমুক্ত লোন দিলো, সাথে গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতিমাসে ৫০ হাজার টাকাও বরাদ্দ পেল। উনার ব্যাংক চলছে সরকারী ভর্তুকিতে। এই ভর্তুকির টাকা সরকার দিচ্ছে আমাদের ট্যাক্সের টাকা থেকে। আমরা অল্প আয় করেও ট্যাক্স দিচ্ছি, উন্নতি তো বটেই।
বিশ্বকাপ ফুটবল দেখছেন?
নাহ, সকালে কাজ অফিস যেতে হয় তাই দেখি না। উইকিন্ডে দেখতে পারি যদি বাচ্চার পরীক্ষা না থাকে। আমার মধ্যে এতো উন্মাদনা নেই খেলা নিয়ে কারণ আমার দেশ নেই। যাক গে। সামনে কি দিন আসছে কে জানে! যায় ভাই বাসায় রওনাদি, দোয়া করেন যাতে দেড় ঘন্টার মধ্যে পৌছাতে পারি, রোজ লাগে আড়াই তিন ঘন্টা।
( ঈদের আগে কয়েকজনের সাথে কথোপকথনের অংশ বিশেষ)
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








